Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৯ : ল্যাটিন আমেরিকায় চীনের পদচিহ্ন

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৯ : ল্যাটিন আমেরিকায় চীনের পদচিহ্ন

আনু মুহাম্মদ ::

৬০ ও ৭০ দশকে চীন থেকে ল্যাটিন আমেরিকার বিপ্লবী আন্দোলন শক্তিশালী নৈতিক সমর্থন পেয়েছে। কিউবা বিপ্লব ও পরবর্তী অন্যান্য দেশে বিপ্লবী আন্দোলনে চীনা বিপ্লবের প্রভাব ছিলো উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। কিন্তু এই অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিস্তার তখন খুব সম্ভব ছিলো না এই কারণে যে, তখন সেসব রাষ্ট্র মার্কিনী আধিপত্যের মধ্যে প্রধানত সামরিক শাসনাধীন ছিলো। দেং পরবর্তী চীন যে পথ নেয় তাতে বাণিজ্যের বিষয়টি প্রধান হয়ে উঠলেও প্রথম দিকে ল্যাটিন আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ছিলো ক্ষীণ। ২০০০ সালের পর থেকে এর দ্রুত বিকাশ দেখা যায়। এ অঞ্চলে চীনের বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধির সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হয় যখন ২০০৪  সালে চীন স্থায়ী পর্যবেক্ষক হিসেবে অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস-এ যোগদান করে। ২০০৮ সালে ইন্টার আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেয় ‘দাতা’ হিসেবে। ২০০০ সালে চীন ও লাটিন আমেরিকার বাণিজ্যের পরিমাণ ছিলো ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০০৯ সালের মধ্যে তা ১২ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়।

২০০৯ সালে ল্যাটিন আমেরিকার রপ্তানির শতকরা মাত্র ৭ ভাগ ছিলো চীনমুখি। রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে প্রধান ছিলো কপার, লোহা, তেল ও সয়াবিন। শতকরা ৯০ ভাগ রপ্তানি হতো মাত্র চারটি দেশ থেকে। এর মধ্যে ব্রাজিলই ছিলো সবার ওপরে, শতকরা প্রায় ৪১ ভাগ, এরপর চিলি (২৩.১%), আর্জেন্টিনা (১৫.৯%) এবং পেরু (৯.৩%)।  চীনের শতকরা ৫ ভাগ তখন রপ্তানি হতো এই এলাকায়। চীনের রপ্তানি পণ্য ছিলো প্রধানত শিল্প ভোগ্য পণ্য ও যন্ত্রপাতি। ২০১১ সালে এই বাণিজ্য পৌঁছায় ২৪১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। তখন বাণিজ্য অংশীদারদের প্রথম পাঁচটি দেশ ছিলো ব্রাজিল, মেক্সিকো, চিলি, ভেনেজুয়েলা এবং আর্জেন্টিনা।

বস্তুত গত ৫ বছরে চীনা ঋণ ও পুঁজি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য এবং ২৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। ব্রিকস গঠন ও তাতে চীন ও ব্রাজিলের অবস্থান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য আরও অনুকূল শর্ত তৈরি করেছে। গত দুদশকে ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশই মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে চীনকে সহযোগী করতে চেয়েছে। অনেকগুলো দেশে মার্কিন বিরোধী সরকারের ক্ষমতায় আসা, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে বের হবার আকাঙ্খায় বিকল্প পথ অনুসন্ধান চীনের জন্য বাড়তি ক্ষেত্র তৈরি করে।

২০১২ সাল থেকে নাগাদ ল্যাটিন আমেরিকায় চীনা বিনিয়োগ যে অনেক বেড়ে যায় তার শতকরা প্রায় ৯০ ভাগই ছিলো খনিজসম্পদকেন্দ্রিক। বন উজাড়, দূষণবৃদ্ধি ও পরিবেশ বিপর্যয়, ইত্যাদির অনেক অভিযোগও তখন থেকে উঠতে থাকে। ‘আমরা চীনের দ্বিতীয় আফ্রিকা হতে চাই না’- এরকম কথাবার্তা ল্যাটিন আমেরিকার মিডিয়াতেও দেখা যায়। তবে এই পরিপ্রেক্ষিতে চীনের বক্তব্যও শোনা যায়। এই প্রসঙ্গে মেক্সিকোতে সফরকালে চীনা ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘চীন বিপ্লব রপ্তানি করছে না, দারিদ্র বা ক্ষুধাও নয়। আমরা কোনো সমস্যা তৈরি করছি না। আমাদের বিরুদ্ধে তাহলে কী বলার আছে?’

২০১৫ সালে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বিশ্বব্যাংক ও ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে তার চাইতে বেশি ঋণ দিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো, প্রায় ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। নিকারাগুয়া খাল উন্মুক্ত করা হলে ল্যাটিন আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্কের বিকাশে মার্কিনী প্রতিবন্ধকতার সুযোগ আরও কমে যাবে।[1]

দুই অঞ্চলের মধ্যে গত এক দশকে সামরিক যোগাযোগও বেড়েছে। ভেনেজুয়েলা, চিলি, বলিভিয়া এবং কিউবার সঙ্গে সামরিক বিষয়ে কথাবার্তা, পারস্পরিক সফর, অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি ক্রয় এগুলো ঘটেছে।  চীন ও বলিভিয়া সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে। আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যেই চীনের সাথে ১ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ক্রয় চুক্তি করেছে।

ইকনমিস্ট পত্রিকার হিসাবে ২০১০-১৩ সময়কালের পর থেকে চীনা বিনিয়োগ বহুমুখি হয়েছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রাজিলের জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের ২৩ শতাংশ চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়েছে ১.৮ বিলিয়ন ডলারে।  ব্রাজিলের মারানহো-তে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য সেদেশের প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়েছে চীনা নির্মাণ কোম্পানি। এছাড়া আর্থিক খাতেও চীনের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য চীন চেষ্টা বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে পেরু, চিলি এবং কোস্টারিকার সাথে এধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কলম্বিয়াতেও একইধরনের চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ব্রাজিল নেতৃত্বাধীন চারদেশীয় জোট সমষ্টিগতভাবেই এধরনের চুক্তির কথা চলছে।[11]

 

[1]http://www.globalresearch.ca/chinas-economic-relations-with-latin-america/5554243

[11]The Economist, 17.11.2016