Home » প্রচ্ছদ কথা » ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি কী আসলেই প্রয়োজনীয়?

ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি কী আসলেই প্রয়োজনীয়?

আবদুল হান্নান ::

দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে অভিন্ন হুমকির উপলব্ধি থেকেই সবসময় সামরিক সন্ধি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়ে থাকে। পঞ্চাশের দশকের স্নায়ুযুদ্ধের সময় পাকিস্তান যোগ দিয়েছিল সেন্টো ও সিয়াটো সামরিক জোটে। চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান কমিউনিস্ট প্রভাব প্রতিহত ও সংযত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ডের মতো পাশ্চাত্যের এবং থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইরান ও তুরস্কের মতো এশিয়ান দেশ সেন্টো ও সিয়াটোতে একত্রিত হয়েছিল। এর বিপরীতে রাশিয়ার ছিল ওয়ারশ সামরিক চুক্তি। ন্যাটো নামে পরিচিত পাশ্চাত্যের সামরিক জোটকে সংযত রাখার লক্ষ্যে রাশিয়ার কাছাকাছি থাকা নির্ভরশীল পূর্ব ইউরোপিয়ান দেশগুলো ছিল ওয়ারশ-র সদস্য। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে সামরিক চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ন ভারত মহাসাগরে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব সংযত ও হটানোর লক্ষ্যে ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আমেরিকান সামরিক বিমান ও রণতরীগুলোর জ্বালানি সংগ্রহ এবং মেরামতি সুবিধা দেওয়াই এই চুক্তির লক্ষ্য। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে সম্ভাব্য চীন-আমেরিকান হস্তক্ষেপ বন্ধ করার লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ২৫ বছর মেয়াদি শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তিতেও সই করেছিল ভারত। পরে একই ধরনের চুক্তি ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োগ করা হয়। সন্ত্রাসবাদ, বিশেষ করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) মোকাবিলার জন্য ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৩৯টি ইসলামি দেশকে নিয়ে গঠিত হয় ইসলামি সামরিক জোট।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশ কোনো মহল থেকে তেমন হুমকির মুখে আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের সত্যিকারের বা কল্পিত কোনো শত্রু নেই। ফলে ফলে যৌক্তিকভাবেই বলা যায়, কোনো দেশের সাথে কোনো সামরিক চুক্তিরও দরকার নেই আমাদের। জাতির পিতার বিবৃত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ হলো ‘কারো সাথে শত্রু তা নয়, সবার সাথে মিত্রতা’। আমরা জোট নিরপেক্ষ দেশ। ছোট দেশ হিসেবে বড় শক্তিগুলোর তাদের প্রভাব বলয় বিস্তার করার ধারণায় সামরিক জোট গঠেেন আমরা উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশের জনগণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বতিা  থেকে দূরে থাকতে চায়। এ কারণেই চীন, রাশিয়া, ভারত এবং এমনকি মিয়ানমারের সাথেও রয়েছে কৌশলগত অংশীদারিত্ব।

নাগরিক সমাজের সংবাদপত্রের আলোচনায়, বিশেষ করে সাবেক বাংলাদেশী কূটনীতিকরা সামরিক সহযোগিতা, বিক্রি এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং পারস্পরিক সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করার জন্য ভারতের সাথে ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে ভারতের সাথে পর্যাপ্ত সামরিক সহযোগিতা তো রয়েছেই। ফলে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হবে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক।

ভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার কারণে এ ধরনের সমঝোতার ব্যাপারে অধীর হয়ে ওঠেছে ভারত। ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছে, গত দশকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের ৮০ ভাগ আমদানি হয়েছে চীনের কাছ থেকে। তারা উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের কাছে চীনের দুটি সাবমেরিন সরবরাহ করাটা ইঙ্গিত দিচ্ছে ‘ভারতের আঙিনায় চীনের পদচিহ্ন গভীর হয়ে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জটিল করে ফেলেছে।’ এ কারণে ভারতীয় পদক্ষেপটি জোরদার হয়েছে। তারা আরো জানিয়েছেন, সাবমেরিন বিক্রির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে চমকে দিয়েছে, তারা আক্রমণকাজে ব্যবহারযোগ্য বলে বিবেচিত দুটি চীনা সাবমেরিন বাংলাদেশের কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা সাবমেরিন বিক্রিকে ‘ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনা কৌশল’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রবাল ঘোষ ভারতীয় আউটলুক পত্রিকাতে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘বিক্রিটির কৌশলগত গুরুত্ব কোনোভাবেই বোঝা যাচ্ছে না।’ তিনি ‘বাংলাদেশের চীন কার্ড খেলা থেকে বিরত রাখার’ পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছেন।

তারা আরো উল্লেখ করেছেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিঙের বাংলাদেশ সফরেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ওই সফরে চীন ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ওই সময় দুই দেশের সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে কৌশলগত অংশীদারিত্বেও উন্নীত করা হয়। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের চীনা ‘ওয়ান বেল্ট- ওয়ান রোড’ উদ্যোগে যোগদানও ভারতের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টির কারণ। এই সতর্ক ঘণ্টাই ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা সমঝোতা করতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব সুব্রামেনিয়াম জয়শঙ্করের ঢাকায় ছুটে আসতে উদ্দীপ্ত করেছে।

সব অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্যের আলোকেই প্রস্তাবিত চুক্তিটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারতীয় উদ্যোগ ও এ্যজেন্ডা। যে চুক্তি আমাদের স্বাধীন সামরিক বিকল্পগুলো ব্যাপকভাবে সীমিত ও বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলবে, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণ করার মাধ্যমে ভারত-চীন দ্বন্দ্বের অংশে পরিণত হওয়ার কোনো প্রয়োজন বাংলাদেশের নেই। প্রস্তাবিত চুক্তিটিতে গভীর অনিশ্চয়তা পরিপূর্ণ, সেইসাথে ভারতের সম্ভাব্য সংঘাতে আমাদের দেশকে বোকার মতো টেনে নেওয়ার ঝুঁকিও আছে এতে। বাংলাদেশকে না টেনেই নিজের শত্রু দের মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি আছে ভারতের। অধিকন্তু, ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্যের মান প্রশ্নাতীত নয় বলেই- ভারত হলো বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটি প্রশ্নে ভারতের অনেক ধরনের উদ্বেগের সুরাহা করেছে। গোলযোগপূর্ণ উত্তর পূর্বাংশের রাজ্যগুলোর ভারতীয় বিদ্রোহীদের জন্য বাংলাদেশের ভূমিতে স্থান হচ্ছে না; সড়ক, রেলওয়ে, নদীর মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য ও যাত্রীদের ট্রানজিট ও পরিবহন সুবিধা দিচ্ছে; এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরগুলোকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে সংযোগ সাধন করেছে। ভারত যা কিছু চেয়েছে, বাংলাদেশ থালা ভরে সবই দিয়েছে। আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশকে আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে ব্যবহার করতে দিয়েছি পালাটানা বিদ্যুৎ কোম্পানিতে ত্রিপুরায় ভারী সরঞ্জাম পরিবহন করার জন্য; আমাদের ভূখন্ড ব্যবহার করার মাধ্যমে ত্রিপুরায় ১০ হাজার টন চালও পরিবহন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কিন্তু তার পরও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি করতে নানা টালবাহানা দেখা যাচ্ছে।

ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতির বিপুল দান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমরা পাচ্ছি, কিন্তু কী আমরা দিচ্ছি।’ ভারতেরও উচিত নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করা, ‘আমরা বাংলাদেশের কাছ থেকে পেয়েছি, কিন্তু আমরা তাদেরকে কী দিয়েছি?’ কিছু দিতে না দিতে পারার ব্যর্থতা ভারতের এত বেশি যে, তাদের জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা চুক্তির আশা করাটা মাত্রাতিরিক্ত।

সরকারের শক্তি নির্ভর করে জনগণের সমর্থনের ওপর, বাইরের সহায়তার ওপর নয়। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের জন্য অত্যন্ত কৃতিত্বের বিষয় হলো, সে সফলভাবে সমান দূরে থাকা চারটি টান টান দড়ির ওপর দিয়ে সফলভাবে হাঁটছে; কোনো একটির দিকে না ঝুঁকেই আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ও ভারতের সাথে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্র্রনীতি অনুসরণ করছে। প্রতিরক্ষা চুক্তিটি করা হলে আমাদের স্বাধীন অবস্থানের সাথে ঘোরতরভাবে আপস করা হবে।

বিষয়টির ওপর বাংলাদেশের বর্তমান জনসাধারণের যে ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তা হলো- এটা চরমভাবে অজনপ্রিয় পদক্ষেপ। এটা করা হলে মারাত্মক রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং ক্ষতিকারক পরিণাম সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের বিকাশমান অর্থনীতি এবং তাৎপর্যপূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্বৃত্তের কৃতিত্বের অধিকারী সরকার দৃঢ়ভাবে চালকের আসনে রয়েছে। জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক যে কোনো বহিরাগত চাপ এই সরকার রুখে দিতে পারবে। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের উন্নয়নের গতিতে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এ ধরনের একটি অসম ও অদ্ভূত চুক্তি প্রতিরোধ করতে পারবেন। বাংলাদেশ এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তি জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এশিয়ায় ভারত ও চীন উভয়েই খুবই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শক্তি। আমরা এমন কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারি না- যা ভারত-চীনের সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বতিাকে বাড়িয়ে দেবে।

লেখক : সাবেক কূটনীতিক -(সৌজন্য-ডেইলী স্টার)