Home » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্প : শিশুদেরও যিনি ভয় পান
Students at a Brooklyn middle school have a 'duck and cover' practice drill in preparation for a nuclear attack; silver print, 1962. From the New York World-Telegram archive. (Photo by GraphicaArtis/Getty Images)

ট্রাম্প : শিশুদেরও যিনি ভয় পান

ডেভিড রথকফ, ফরেইন পলিসি

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হৃদপিন্ডের পুরোটাই ভয়ে ভরা। আবার বিশ্ব তাকে ভয় পায়। এটা কেবলই সন্ত্রাসী হুমকি নিয়ে তার ভয়ের বাড়াবাড়ি কিংবা তথ্য, বিজ্ঞান বা গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তার প্রকাশ্য আতঙ্ক নয়।

না, ট্রাম্প দৃশ্যত মিষ্টি রোদে স্নাত আমেরিকান উপশহরগুলোতে যুদ্ধের ক্ষত ছাড়া আর সবই ফেলে আসা অভিবাসী ও উদ্বাস্তু স্কুলশিশুদেরও ভয় পান। তিনি এটা জানেন; কারণ তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারের শক্তিকে এসব নিরীহদের বিরুদ্ধে ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত রুশ সরকারের সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলা করা কিংবা উদীয়মান চীন-বিষয়ক তার কঠোর আলোচনা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার বদলে, নতুন প্রেসিডেন্ট এমন সব কর্মসূচি ও প্রটোকল প্রবর্তন করছেন, যার ফলে সারা দেশের শিশুদের ভয়ঙ্কর মূল্য দিতে হবে।

এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প সবচেয়ে বড় যে কাজটি করেছেন তা হলো – উদ্বাস্তুসহ মুসলিমদের জন্য আমেরিকান সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া এবং বৈধতাবিহীন নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করার ব্যবস্থা দ্রুতকরণ। এই দ্বিতীয় কাজটি প্রধানত মেক্সিকানদের টার্গেট করে করা। তিনি এমন সব নির্দেশনা জারি করছেন, যার ফলে বৈধতার কাগজপত্র না থাকা অর্থাৎ বলতে গেলে যে কাউকে সহজেই বহিষ্কার করা যাবে। তিনি নতুন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) অফিসার নিয়োগ, নতুন নতুন আটক কেন্দ্র এবং তার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আদালতের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট নিজে একবার অসাবধানী মুহূর্তে (তিনি এমন অবস্থায় প্রায়ই থাকেন) এই উদ্যোগকে ‘সামরিক অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে হোয়াইট হাউজ ওই ভাষাটি ফিরিয়ে নেয় সম্ভবত এই কারণে যে, তার টিম তাকে ‘পস কমিটাটাস অ্যাক্টের’ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। ওই ফেডারেল অ্যাক্টে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা অবৈধ করা হয়েছে। তবে তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট : তিনি অভিবাসী এবং তাদের পরিবার সদস্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চান। এখন পর্যন্ত এসব নীতি কেবল অবৈধ অভিবাসীদের ওপরই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টিকারী নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এবং বিদেশে প্রবল সমালোচনার জবাবে হোয়াইট হাউজ যুক্তি দিচ্ছে , এগুলো কেবল বিপজ্জনক অপরাধীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটা ভিত্তিহীন এবং তার নিজের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের সমর্থন ছাড়াই করা।  কিন্তু আমরাই অনেক ভালো জানি।

ট্রাম্পের অনেক সমর্থক সাফাই হিসেবে বলেছেন, বারাক ওবামাও তো তার আমলে অনেককে বহিষ্কার করেছেন। উল্লেখ্য, জর্জ ডব্লিউ বুশ তার আট বছর মেয়াদে যতজনকে বহিষ্কার করেছিলেন, ওবামা তার প্রথম মেয়াদেই তার চেয়ে বেশি করেছিলেন। তবে সেটা নিশ্চিতভাবেই তার ভালো কাজ ছিল না।

অভিবাসীদের প্রতি আমেরিকার নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে প্রবলভাবে পড়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর পর্যটন বিষয়ক প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বুকিং ২০১৭ সালে ৬.৫ ভাগ কমে গেছে। মুসলিম দেশগুলো থেকে পর্যটক কমে গেছে ৮০ ভাগ। নিউইয়র্ক, লাসভেগাস, ওরল্যান্ডো, ফ্লোরিডার মতো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের জন্য ফ্লাইট অনুসন্ধান কমেছে ৩০ থেকে ৬০ ভাগ।

বিদেশী পর্যটকদের বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ২২১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার হিসাব এবং মার্কিন পর্যটন শিল্পে ২০১৫ সালে ৭৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান করার বিষয় দুটি আমলে নিলে বোঝা যাবে- এর ফলে বিপুলসংখ্যক চাকরি সৃষ্টির ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিতেই তা গভীর গর্তের সৃষ্টি করবে। সীমান্ত এবং বিমানবন্দরগুলোতে হয়রানির খবর প্রকাশিত হতে থাকায় এই খাতের অবস্থা আরো অবনতি ঘটতে পারে। মেক্সিকো থেকে বিপুলসংখ্যক লোক আসার বিষয়টিই বিবেচনা করুন। ২০১৫ সালেই দুই কোটি লোক মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল।

তবে এসব ক্ষীণ-দৃষ্টি সংশ্লিষ্টনীতির আরো বড় মূল্য রয়েছে। গত কয়েক মাসে মেক্সিকো সীমান্তের কাছাকাছি থানা মার্কিন নগরীর বিভিন্ন স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টর পরিদর্শন করেছি। এসব নগরীতে অভিবাসী জনসংখ্যা সমাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে।

অনেকভাবেই এসব এলাকার শিশুরা বিশেষ ধরনের। অবশ্য শিশুরা তো এমনই হয়। তারা নির্দোষ, খেলাপাগল, তাদের হাতে আসা কাজ করতে কঠোর পরিশ্রম করতে চায়। মেক্সিকো, স্যালভাডোর, নিকারাগুয়া, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, ইরান- অনেক দেশ থেকে এসেছে তারা।

ট্রাম্পের অভিবাসননীতি তাদের ওপর ছায়া ফেলেছে। তাদের প্রিয়জনকে যদি বহিষ্কার করা হয়, তবে তারা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে। কোনো কোনো হিসাবে দেখা গেছে, ৮০ থেকে ৯০ ভাগ পরিবার সদস্যই এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

আরো অনেক দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও এখন সামনে আসা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জগুলো পাশে সরিয়ে রেখে জাতিগত জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া উড়ছে। প্রেসিডেন্ট এবং তার সঙ্গীরা যেভাবে পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছেন, তাতে করে আমেরিকা আগের চেয়ে নিরাপদ হবে না, এটা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আবার মহান’ও বানাবে না।

তবে এখানকার শ্রেণীকক্ষগুলোতে আমি যা দেখেছি, তাতে আমি আত্মবিশ্বাসী, আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব ও সমন্বয় সাধনের ক্ষমতা অটুট থাকবে এবং এই প্রেসিডেন্ট যেসব শিশুদের টার্গেট করছেন তারাই, যে দেশ থেকেই তারা এসে থাকুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বোত্তমভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে, ভবিষ্যতকে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল করে তুলবে।