Home » বিশেষ নিবন্ধ » মাশরাফি : কর্তৃত্ববাদের বলি?

মাশরাফি : কর্তৃত্ববাদের বলি?

ফুয়াদ ফয়সাল ::

বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি মহোদয় বলে দিলেন, সেঞ্চুরি টেস্টে খেলবে না মাহমুদুল্লাহ। বিনা মেঘে বজ্রপাত বললেও কম বলা হয়। দলের সবচেয়ে ভদ্র, অমায়িক ছেলেটি স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি, এমন কিছু হতে পারেনি। শোনার পর দেরি করেনি, সোজা শ্রীলঙ্কা থেকে দেশের পথ ধরে ফেলে। আভাস দেওয়া হলো, তাকে আর নেওয়া হবে না; কিন্তু না।

ঘটনাটার সমাপ্তি এখানেই নয়, আরেকজন ছিলেন। তিনি বললেন, এমনটা চলবে না। টেস্টে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন ওয়ানডে আর টি-২০ আছে। মাহমুদুল্লাহ যদি না খেলে, তবে আমিও খেলব না। ওয়ান ডে আর টি-২০ দুটিতেই তাকে রাখতে হবে। স্পষ্ট বিদ্রোহ। তবে বিসিবিকে তা হজম করতে হলো।

তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। নতুন চাল চালা হলো। বুঝতে পেরে হাল ছাড়লেন না তিনি। একধাপ এগিয়ে তিনিই ঘোষণা দিলেন, তিনিই ছেড়ে যাচ্ছেন। এই তিনি হলেন মাশরাফি মতুর্জা। নেতৃত্বের বলিষ্ঠতার কারণেই তিনি মাহমুদুল্লাহ নিয়েই শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলেন। বীরের মতো খেলে মাথা উঁচু করে দেশে ফিরেছেন। তবে গুটি চালাচালির পরিণামে বাংলাদেশ বড় অসময়ে হারালো এক অতিপ্রয়োজনীয় নেতাকে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে দিন দিন যে কর্তৃত্ববাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠছে, তারই বলি হতে হলো মাশরাফিকে। আল-আমিনের মতো প্রতিভারা ঝরে পড়েছে, খোদ মোস্তাফিজ পর্যন্ত চাপে আছেন।

দল নির্বাচনে বোর্ডের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুপারিশ আকারে কিছু চাপ সবদেশেই থাকে। কিন্তু এমন ন্যাক্কারজনকভাবে কোনো দেশেই দেখা যায় না। এখানে বোর্ড সভাপতি হঠাৎ করে বলে দেন মিরাজকে নিতে হবে। ব্যাস, উড়িয়ে আনা হলো তাকে। তিনি বললেন, ওমুককে বাদ দিতে হবে, সাথে সাথে বাদ পড়লো একজন। কেন? শ্রীলঙ্কার উইকেট, সার্বিক পরিস্থিতি তো সবারই জানা। মিরাজকে দরকার হলে তাকে আগেই দলে নেওয়া যেত। মিরাজের প্রতিভা তো কারো অজানা নয়। কিন্তু তাকে এভাবে দলে নিতে হবে কেন?  মাহমুদুল্লাহ’র ফর্ম যদি না থাকে, তবে তাকে শ্রীলঙ্কা দলে নেওয়া হলো কেন? তাকে তো আগেই বাদ দেওয়া যেত। অপদস্থ করার তো কোনো মানে হয় না।

তবে বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো, খেলোয়াড়রা মাঠে সেরাটা দিয়েই বিদ্রোহটার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন; খারাপ খেলে নয়। আর মাশরাফি যা করেছেন, সেটাকে যদি ওস্তাদি মার বলা হয়, তবে কি খুব কম বলা হবে?

আগে-পরে কিছুই বললেন না, যদিও সেদিন সকাল থেকেই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে চাউর হয়ে গিয়েছিল, আজ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, টসের সময় বলে দিলেন তিনি টি-২০ থেকে অবসর নিচ্ছেন।

নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পাতায় মাশরাফি বলেছেন, তরুণদের সুযোগ দিতেই এই অবসর। অথচ শ্রীলঙ্কা যাওয়ার ঠিক আগে বাংলাদেশের বহুল প্রচলিত একটি নিউজ পোর্টালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে টি-টোয়েন্টি নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলে গিয়েছিলেন। বলেছেন, ওয়ানডের মত টি-টোয়েন্টি দলটিকেও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে চান অবসরের আগে।

তাহলে হঠাৎ কেন এই অবসর? কেন এত দ্রুত বদলে গেল ভাবনা? ২০০৯ সালের পর আর টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পারেননি শরীরের কারণে। কিন্তু ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সংস্করণ থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নেননি এখনো। টি-টোয়েন্টি থেকে কেন?

বিসিবির বেশ কয়েকটি সূত্র ও মাশরাফির ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্দার আড়ালের অনেক কিছুই।

সম্ভবত বিসিবি প্রধানের ইঙ্গিতে জাতীয় দলের প্রধান কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহে বেশ কিছুদিন আগেই বিসিবি কর্তাদের জানিয়েছেন, মাশরাফি, তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিমকে তিনি টি-টোয়েন্টি দলে জরুরি মনে করেন না। আপাতত কোচের ভাবনার বাস্তবায়ন শুরু মাশরাফিকে দিয়েই।

টি-টোয়েন্টি দলকে দাঁড় করানোর মাশরাফির স্বপ্ন ধাক্কা খায় এবার শ্রীলঙ্কা যাওয়ার পরই। বিসিবির শীর্ষ কর্তারা তাকে টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে বলেন। ‘ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবা’ মানে যে আসলে অবসর নিয়ে ভাবা, সেটি তো আর ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না! ওয়ানডে সিরিজ জুড়ে চাপটা ছিল প্রবাহমান। সেই চাপ নিয়েই ওয়ানডে সিরিজ খেলেছেন মাশরাফি, নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, লড়াইটা চালিয়ে যাবেন। খেলে যাবেন টি-টোয়েন্টি।

কিন্তু ওয়ানডে সিরিজ শেষে কোচ আবারো বিসিবি কর্তাদের বলেন, টি-টোয়েন্টি নিয়ে মাশরাফির সঙ্গে কথা বলতে। বিসিবির একাধিক সূত্র তা নিশ্চিত করেছে, গত সোমবার রাতে বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান দলের সিনিয়র চার ক্রিকেটারকে ডেকে কথা বলেন। জানিয়ে দেন, তিন সংস্করণে তিন অধিনায়ক চায় বিসিবি। এরপরই ভবিষ্যতের ছবিটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে মাশরাফির সামনে। ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটাও তখনই মরে যায়। কোচের ভাবনার সঙ্গে লড়াই করা যায়, কিন্তু নিজেদের অভিভাবক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তো লড়াই চলে না! গত মঙ্গলবার ম্যাচের আগে দুপুরেই পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন মাশরাফি। এই সিরিজের পর আর খেলবেন না আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি।

গত নিউজিল্যান্ড সফরেও খবরের শিরোনাম হয়েছিল মাশরাফির অবসর। দল নিউজিল্যান্ডে, কিন্তু বিসিবি প্রধান দেশে বসে সংবাদ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছিলেন আর টি-টোয়েন্টি খেলবে না মাশরাফি। সেটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল বিস্তর। অবাক হয়েছিলেন স্বয়ং মাশরাফিও। পরে ঘোষণা বদলে দিয়েছিলেন বোর্ড প্রধান। বিদায় বেলায় মাশরাফি অন্তত এই সান্ত¡না পাবেন, নিজের অবসরের ঘোষণা নিজেই দিতে পেরেছেন!

এখন আবার বিসিবি প্রধান বলছেন, মাশরাফি অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন; টি-২০ থেকে নয়। তাকে ফেরানোর জন্য সারা দেশে যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীকেও হস্তক্ষেপ করতে হবে। হয়তো তাতে ফিরে আসবেন মাশরাফি। তবে অনেকে মাশরাফিকে বলছেন, সেটা না করতে। না ফিরেই তিনি হয়তো দেশের জন্য বড় কিছু করতে পারবেন, কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা আরো সমুন্নত রাখতে পারবেন।

মাশরাফি কিন্তু সাধারণ কেউ নন। দুই পায়ে মোট আটবার অস্ত্রোপচার। পা বাঁচাতে যখন মাশরাফিকে না খেলার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘পায়ে গুলি খেয়ে যদি মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করতে পারে, তাহলে আমি কেন সামান্য সার্জারি নিয়ে মাঠে খেলতে পারবো না?’

দৃঢ়চেতা মনোভাব, ব্যক্তিত্ব আর সহজাত ক্রিকেটীয় মেধার সঙ্গে দারুণ নেতৃত্বগুণ অন্য আর ১০ জন ক্রিকেটার থেকে আলাদা করে চিনিয়েছে বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন মাশরাফি বিন মুর্তজাকে। তিনিই দেখিয়েছেন কেবল তীব্র ইচ্ছাশক্তি আর দেশের প্রতি প্রচুর ভালোবাসা থাকলে- অনেক কিছুই সম্ভব।

ম্যাচ জিতিয়ে গোটা দেশ যখন আনন্দে মাতে, মাশরাফি তখন হাঁটুর ব্যাথায় কাতরান ড্রেসিংরুমে। ক্রিকেটে তার মতো ইনজুরি জয় করা খেলোয়াড় আর একজন আছেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তিনিই তাই ধ্রুবতারা!