Home » প্রচ্ছদ কথা » ভোটের রাজনীতি : হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ

ভোটের রাজনীতি : হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ

হায়দার আকবর খান রনো ::

২০১৩ সালে শাহবাগ চত্বরে যখন গণজাগরণ মঞ্চে হাজার হাজার এমনকি লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হচ্ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটাকে ভালো চোখে দেখেননি। তিনি বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গী বিএনপি প্রথম থেকেই এর বিরুদ্ধে ছিল। খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকে ‘নাস্তিকদের’ সমাবেশ পর্যন্ত বলেছিলেন।

গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা সমাবেশের আয়োজন করে হেফাজতে ইসলাম। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় তারা লক্ষাধিক মাদ্রাসার ছাত্র ও অন্যান্যদের জমায়েত করেছিলেন সারাদেশ থেকে। সেদিন তারা মতিঝিল, পল্টন এলাকায় তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল। অনেকে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া হেফাজতে ইসলামের এই সকল কাজে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, হয়তো বা সরকার পরিবর্তন হবে। কিন্তু তা হয়নি। গভীর রাতে শেখ হাসিনার সরকার পুলিশি এ্যাকশন চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় হেফাজতের সমাবেশকে। একই সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গ ঘটলো ইসলামী বিপ্লবের।

এরপর পাশার দান পাল্টে গেল। হেফাজতের সঙ্গে গোপন সমঝোতা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সঙ্গী করলো দুটি ধর্মান্ধ মৌলবাদী সংগঠনকে। খালেদা জিয়ার জোট সঙ্গী জামায়াত। অন্যদিকে অবিশ্বাস্য মনে হলেও হেফাজত হয়ে উঠলো শেখ হাসিনার সরকারের সহযোগী।

এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইতোপূর্বেও দেখেছি, দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বের কাছে আদর্শ বলে কোন বস্তু নেই। ভোটের রাজনীতির সুবিধার্থে তারা যেকোনো স্তরে নামতে পারেন।

খালেদা জিয়া জামায়াতকে জোট সঙ্গী করেছেন স্রেফ ভোটের রাজনীতির হিসেব থেকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামায়াত নেতাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করেছেন, অপরদিকে হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ করে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ২০০৬ সালে একই রকম ভোটের হিসেব-নিকেশ থেকে আওয়ামী লীগ ‘খেলাফত’-এর সঙ্গে পাচ দফা চুক্তি করেছিল, যা ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল।

প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। মাদ্রাসা ছাত্র ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের ভোট পাবেন এই আশায় শেখ হাসিনা হেফাজতের ঘোর সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল দাবিগুলো মেনে নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। হেফাজতের দাবি অনুসারে ইতোপূর্বেই পাঠপুস্তক থেকে হিন্দু লেখকদের রচনা বাদ দেয়া হয়েছে। নাস্তিক অভিযোগে কোনো কোনো মুসলমান কবির উৎকৃষ্ট রচনাও বাদ দেয়া হয়েছিল। হেফাজতকে তুষ্ট করার এটা গেল প্রথম ধাপ।

পরবর্তী ধাপে আমরা দেখছি, প্রধানমন্ত্রী শর্তহীনভাবে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে এম,এ’র সমমর্যাদা দান করার (যেখানে পঞ্চম শ্রেণীর ঊর্ধ্বে বাংলা, ইংরেজী পর্যন্ত পড়ানো হয় না) এবং সুপ্রীম কোর্টের সামনের স্থাপত্যকে সরিয়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন। এ বড় ভয়ংকর ইঙ্গিত। পহেলা বৈশাখ নিয়ে হেফাজত প্রমুখ এখনো বিতর্ক তৈরি করে চলেছে। চট্টগ্রামে দেওয়ালের আলপনা মবিল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগ বাংলা নববর্ষ পালনকে ইসলাম সম্মত নয় বলে ঘোষণা করেছে। এক কথায়, বাঙালী কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব কিছুকেই বাতিল করতে হবে ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও নারী বিদ্বেষী হেফাজতের সন্তুষ্টির জন্য। সুস্থ সংস্কৃতিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক চেতনাও আজ হুমকির সম্মুখীন। ভোটের রাজনীতির জন্য কি এতোটা নিচে নামতে হবে?