Home » আন্তর্জাতিক » বাংলা-ভারত সম্পর্ক : নতুন সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর চীন

বাংলা-ভারত সম্পর্ক : নতুন সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর চীন

গর্গা চ্যাটার্জি, ফার্স্টপোস্ট ডটকম, ভারত

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার চার দিনের সফরে ভারত সফর শুরু করতে নয়াদিল্লিতে অবতরণ করেন। বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যকার গভীর হতে থাকা সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই সফরটি হলো।

এসব সম্পর্ক বহু খাত-সম্পর্কিত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ক্রয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত। দুটি সার্বভৌম সরকারের মধ্যকার সব সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কও ভিন্ন নয়; আর এমনটাই হওয়া উচিত। ভারতের অন্তরাল শক্তির (ডিপ স্টেট) কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ হলো তার ভূ-কৌশলগত প্রভাব-মন্ডলের অংশবিশেষ। ভারত চাইলে যেকোনো মতবাদ গ্রহণ করতে পারে, তবে বাস্তবে এর অর্থ কী, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু লবি যা-ই তুলে ধরতে চাক না কেন, বাংলাদেশ কিন্তু সিকিম বা এমনকি ভুটানও নয়। অবশ্য বিশাল কোনো প্রতিবেশীর সাথে কাজ করার সময় হুঁশিয়ার থাকা ভালো, যখন ওই দেশটির সাথে বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

এই সময়ে এবং পরিস্থিতিতে যেটা বিবেচ্য বিষয়, তা কিন্তু ১৯ শতকের ইউরোপিয়ান জাতিরাষ্ট্রের মডেলের নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একীভূত হওয়ার এই সময়টাতে কোনো সত্তাই নিরঙ্কুশ সার্বভৌম নয়। যেটা বিবেচ্য বিষয় তা হলো- পুঁজি, পণ্য ও মানব-প্রবাহ ওই ভূখন্ড দিয়ে আসা-যাওয়ার ওপর তার কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে এবং সেইসাথে যে দেশটির কাছে অর্থনৈতিকভাবে ঋণগ্রস্ত, সে তার নীতি প্রণয়নে কতটা প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব একটি ধারণা, যা দাঁড়িপাল্লার বিপরীত অংশ দুটির মতো উঠা-নামা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কোনো কোনো রাজ্য পানামার মতো জাতিসংঘের কোনো কোনো সদস্যভুক্ত দেশের চেয়ে অনেক ব্যাপারে অনেক বেশি সার্বভৌম।

অর্থাৎ সার্বভৌমত্বের মৌলিক পরিমাপ নির্ভর করে কোনো সত্তা তার প্রয়োজন পূরণ করার জন্য বাহিরের ওপর কতটা নির্ভরশীল তার ওপর। বিষয়টা একটি ইস্যু দিয়ে বোঝানো যায় : কোনো দেশ তার চাহিদা পূরণের জন্য বাইরের পুঁজির ওপর কতটা নির্ভরশীল? ঋণকৃত পুঁজির বিচক্ষণ প্রয়োগের মাধ্যমে সামর্থ্য-সৃষ্টি তার ঋণ গ্রহণের ফলে ত্যাগ করা সার্বভৌমত্ব কতটা পুষিয়ে দিচ্ছে? এটা একটা প্রচ্ছন্ন খেলা। ঋণদাতার ইচ্ছায় ঋণ গ্রহণ করা হোক, কিংবা নিজের ইচ্ছায় ঋণ নেওয়া হোক, যেটাই ঘটুক না কেন, ঋণবিষয়ক যেকোনো পরিস্থিতিতে সবসময়ই এটা মূল্যায়ন করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে উইন-উইন পরিস্থিতিতে পৌঁছানো জটিল একটি কাজ। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিঙের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরকালে অনুকূল বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের সময় চীনা উদ্যোগটি এর একটি ভালো উদাহরণ।

অনেক লম্বা চীনা পকেটের সাথে ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে। বেইজিং যে জিনিসটি ঢাকাকে দিতে পারে না, সেটা পর্যন্ত ঢাকাকে দিতে পারেনি দিল্লিও। সেটা হলো ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে প্রবাহিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে একটি ব্যাপকভিত্তিক চুক্তি। এই বিষয়টি নিয়ে কলকাতার সাথে কাজ করতে হয়েছে দিল্লির। ঢাকার সাথে চুক্তি করার আগে দিল্লিকে প্রথমে কলকাতার সাথে চুক্তি করতে হবে। তিস্তা চুক্তির ফলে ক্ষতির মুখে পড়া পশ্চিমবঙ্গকে পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে এটা। এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গকে এ ধরনের কোনো ক্ষতিপূরণ করার কোনো প্রতিশ্রুতি দিল্লি দেয়নি। ফলে কিছু সময়ের জন্য হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। এতে করে ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের’ মতো গৎবাঁধা অবস্থানে ফিরে গেছে দিল্লি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বাস্তবে কঠোর মানসিকতার কোনোই স্থান নেই।

‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের’ এ ধরনের উল্লেখ যখন ভারত  বর্তমানে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার করে, তখন তা এমনটি আরো বেশি সংশয়পূর্ণ হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন দলটি বারবার জোরালোভাবে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ পরিভাষা ব্যবহার করে যখন নিজের অনুকূলে কাজে লাগানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের ভোট ব্যাংক সৃষ্টি করে, যেমনটা ভারতের অন্য কোনো সর্বভারতীয় দল কখনো করেনি; আর তখন সংশয়ে না পড়ে থাকা যায় না। যখন কেউ সংকীর্ণ অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্যে কারো কাছে দানব হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য ওই একই ব্যক্তির প্রতি বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করে, তখন এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এই ধারণায় যে, কারো মন থেকে লজ্জার অনুভূতিটি নির্মূল হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য বেইজিং থেকে দুটি সাবমেরিন কেনায় দিল্লি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিনও এ দুটি। দিল্লি এতে তার ‘আঙিনায়’ বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু ‘আঙিনা’ কল্পনা করা যায় বটে, কিন্ত্তু এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যে একটি সার্বভৌম দেশ সেই সত্যটি বাতিল করা যায় না। দেশটির মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধমুক্ত সমুদ্রসীমা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবয়বে বাংলার স্ব-সার্বভৌমত্বের অনেক বড় বিষয় হলো- বঙ্গোপসাগরের ব্যাপারে তার ন্যায়সঙ্গত অংশ বুঝে নেওয়া।

নিজের ন্যায়সঙ্গত অংশ দাবি করার মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। কেউ কারো ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে যখন অস্বীকার করে, তখন সে সেটা করতে পারে তার পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য। ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক গভীরতর হওয়ার অর্থ হলো, এই শক্তি প্রদর্শন ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। একটা পর্যায় পর্যন্ত বর্তমান গভীরতার ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক ছাড়াই তা হতে পারে। ফলে দিল্লির পক্ষে যেভাবে পারা সম্ভব সেভাবেই ঢাকার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বেইজিং নামে পরিচিত নতুন বন্ধুর কাছ থেকে ঢাকাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে চেষ্টা করছে।

বাস্তবতা হলো চীন, বাংলাদেশ ও নেপাল এখন যৌথ সামরিক মহড়ার কথা ভাবছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার এই অংশ যে বদলে গেছে, সেটাই তুলে ধরছে। দৃঢ়প্রত্যয় তবে উচ্চ ভাবাদর্শকেন্দ্রিক পরোক্ষ-আগ্রাসী একমুখী সময় অতিক্রম করে আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতা ও ঈর্ষার বহুমাত্রিক প্রবাহের পাশাপাশি নানামাত্রিক সময়ে প্রবেশ করছি। বাস্তবতার ধারে কাছেও নেই এমন যে কোনো সম্পর্কের সাথে বিভ্রম-ভিত্তিক সম্পর্কের সাথে কেবল ভালোভাবেই তুলনা করা চলে। এটা শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছার চিহ্নটি ধারণ করে।