Home » বিশেষ নিবন্ধ » শুধুই ভোটের জন্য হেফাজতের সাথে সখ্যতা!

শুধুই ভোটের জন্য হেফাজতের সাথে সখ্যতা!

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

অবশেষে হেফাজতে ইসলামের সাথে গোপন-অপ্রকাশ্য সম্পর্কের অবসান ঘটালেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। হেফাজতের দাবির কাছে সমর্পিত হলেন তিনি। গণভবনে হেফাজতের মাওলানা শফির সাথে আলাপরত প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত বিনয়াবনত ছবিটি মনে করিয়ে দেয় একসময়ে খালেদা জিয়া ও মতিউর রহমান নিজামীর আলাপচারিতার দৃশ্য। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের দুটি ছবি ইতিহাসে দুই সময়ের পঙ্কিল রাজনীতির সাক্ষী হয়ে গেল।

উনসত্তর বয়সী ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে আওয়ামী লীগ কী পরিশেষে ‘আওয়ামী- হেফাজত লীগে’ পরিনত হতে চলেছে? সব সম্ভবের দেশে এখন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, মোসাহেবরা অনেক দুর অবধি এগিয়ে। হঠাৎই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, “কওমী মাদ্রাসা থেকে কখনও জঙ্গী সৃষ্টি হয় না। কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা কোনদিনই জঙ্গী হতে পারেন না।…ওলামাদের পথভ্রষ্ট করতে না পেরে জঙ্গীরা ইংলিশ মাধ্যমের ছাত্র-ছাত্রীদের জঙ্গী তৎপরতায় ব্যবহার করছে”।

দেখে-শুনে মনে হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম এবং কওমী মাদ্রাসার নিজেদের আর কোন প্রকার প্রচার বা সাফাই গাওয়ার দরকার নেই। সরকারের মন্ত্রীগন এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা এবং হেফাজতে ইসলামের দাবি-দাওয়ার পক্ষে সাফাই ও প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন। সরকার প্রধান হেফাজতের প্রতি সংবেদনশীল, সুতরাং তারা ‘সবুজ সংকেত’ পেয়েই গেছেন।

মনে করিয়ে দিই, মাত্র কিছুকাল আগেও হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে আওয়ামী লীগের বক্তব্য ছিল- তারা জঙ্গী; তারা মানুষ হত্যা করে, পবিত্র কোরআন শরীফ পোড়ায়; গাছ কেটে ব্যারিকেড দেয়। মাওলানা শফি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, নাস্তিকদের কতল করা ওয়াজিব। এরপর নাস্তিক আখ্যা দিয়ে অনেক তরুন-যুবকে হত্যা করা হয়। সেই হেফাজতের সাথে এখন আওয়ামী লীগের মহামিলনে একাকার। জামায়াত-বিএনপির ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির প্রতিপক্ষ হিসেবে হেফাজতে ইসলামকে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা ২০১৩ সালের মে মাসে প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। পাল্টা কৌশল হিসেবে হেফাজতকে ব্যবহার করে উৎখাতের চেষ্টা হলে সরকার সম্বিৎ ফিরে পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “হেফাজতের ওপর ভর করে বিএনপি-জামায়াত সরকার উৎখাত করতে চেয়েছে”। আইন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন আরো একধাপ এগিয়ে, “এই উৎখাত প্রচেষ্টার সাথে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই অর্থ ও প্রণোদনা যুগিয়েছে”।

কথিত ‘উৎখাত তত্ত্ব’ সম্ভবত: সরকারকে আরো কঠোরতা আরোপের মধ্য দিয়ে হেফাজতকে বাগে আনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহনে মনোযোগী করে তোলে। হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে ৫৮টি মামলা দায়ের করা হয়। মহাসচিব বাবুনগরীকে গ্রেফতার, রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি সরকারের মন্ত্রী ও এজেন্সিসমূহের নিরন্তর প্রচেষ্টায় অবশেষে হেফাজতকে বাগে আনা সম্ভব হয় এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে দীর্ঘ ‘মধুচন্দ্রিমা’র প্রেক্ষাপট তৈরী হয়।

আবার পেছনে ফেরা যাক- ২০১৩ সালের ৫ মে তারিখে হেফাজতে ইসলামকে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়ে ঢাকায় আনা জরুরী হয়ে পড়েছিল। কারণ “গণজাগরন মঞ্চ” নামক তরুনদের শাহবাগকেন্দ্রিক একটি সমাবেশ ক্রমশ: হুমকি হয়ে উঠছিল। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সমবেত কিছু তরুন ব্লগার সম্ভবত: শুরুতে বুঝতে পারেনি, তাদের দাবি তো বটেই, এরসাথে সবরকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগন সমবেত হতে থাকবে।

শাহবাগের দৃশ্যপট প্রতিদিন পাল্টাচ্ছিল। গণজাগরন মঞ্চ হয়ে উঠছিল আগুনে প্রতিবাদের মঞ্চ। ঠিক  তখনই গণজাগরন মঞ্চের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয় রাজনৈতিক কূটচাল ও বিভাজন। অন্যপক্ষে, প্রধান বিরোধী দলের নেতা জামায়াতের মন রক্ষায় গণজাগরন মঞ্চকে ‘নাস্তিক ও শয়তানের আখড়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করলে  বিএনপি এর বিরোধিতায় নেমে পড়ে। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ব্লগার আহমেদ রাজীব নিষ্ঠুর খুনের শিকার হন। এভাবেই অমিত তেজ ও সম্ভাবনায় দীপ্ত গণজাগরন মঞ্চ রাজনৈতিক জটিলতার ফাদে খাবি খেতে থাকে।

প্রতিবাদের বিকল্প প্লাটফর্ম গণজাগরন মঞ্চকে হটিয়ে দিতে হেফাজতকে ঢাকায় সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এই সমাবেশকে ঘিরে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। বিএনপি এর মধ্যে ‘আরব বসন্ত’র গন্ধ পায় এবং সরকারকে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে পতন বা ‘অন্যরকম কিছু’ ঘটানোর আশায় বিভোর হয়। হেফাজতের মঞ্চ হয়ে ওঠে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি নেতাদের মিলনকেন্দ্র।

ঢাকায় হেফাজতে ইসলামী মহাসমাবেশ ও রক্তাক্ত অবরোধ কর্মসূচি দমনে ‘অপারেশন ফ্লাশলাইট’-এর সমাপ্তির পর কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির সাথে ক্ষমতাসীনদের সম্পর্কে আপাত: ছেদ পড়ে। সে সময়ের আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ঘোষণা দিয়েছিলেন, “হেফাজতে ইসলাম পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। রাজাকার-আলবদরের উত্তরসুরী। হেফাজতকে আর ঘর থেকে বের হতে দেয়া হবে না’’। পাঠক, এটিই ছিল ২০১৩ সালের মে মাসে ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্রের বক্তব্য!

২০১৩ সালে মাওলানা শফি এক ওয়াজে নারীদের বিষয়ে কটুক্তি করার পরে ঐ বছরের ১৩ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্য; “…আমি তাকে বলতে চাই, তিনি কি কোন মায়ের গর্ভে জন্ম নেন নাই? তিনি সেই মাকে সম্মান করেন না? তার কি স্ত্রী বা কোন বোন নাই? হেফাজত বর্তমানে বিএনপির সাথে জোট বেঁধেছে। কিন্তু বিএনপি প্রধান তো একজন নারী, তাহলে তিনি কিভাবে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিচ্ছেন”…? ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “নারীদের বিরুদ্ধে যাতে আর কেউ কোন দিন অশালীন মন্তব্য করতে না পারে, সেজন্য নারী নেত্রীদের সোচ্চার হতে হবে”।

পরবর্তী ঘটনা পরম্পরা বিপরীত। সকলের মত উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির প্রতি সংবেদনশীলতা ও নমনীয়তা প্রদর্শন করেন। পরিস্কার হয়ে যায় ভোটের রাজনীতিতে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটি বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে কতটা গুরুত্বপূর্ন। যে কারণে এক সময়ে আওয়াশী লীগ ২০০৬ সালে খেলাফতে মজলিসের সাথে নির্বাচনী চুক্তি করেছিলেন, সেই একই উদ্দেশ্যে হেফাজতে ইসলামকে তিনি সাথে রাখছেন-শুধুমাত্র ভোটের জন্য।

এজন্য বহুল উচ্চারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি না করা এবং শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফের ২০১৩ সালের উক্তি কী বাণের জলের মত ভেসে গেল? শুধুমাত্র ভোটের জন্য নাকি ভেতরে আরো কোন মাজেজা আছে? এমন কোন বিষয়, যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনতে হেফাজতকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করার প্রয়োজন হয়েছিল?

হেফাজত এখন সরকারের কাছে নাম্বার ওয়ান প্রিভিলেজড। ১৩ দফার প্রতি নমনীয়তা এবং হেফাজতের বিরুদ্ধে সবগুলো মামলা হিমাগারে পাঠানো দিয়ে যার শুরু, তা পূর্ণতা পেতে থাকে পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, সুপ্রীম কোর্টের সামনে ভাস্কর্য অপসারণ দাবির সাথে খোদ সরকার প্রধানের ঐক্যমত্য এবং কওমী মাদ্রাসা সনদের প্রতি শর্তহীন স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। নববর্ষের দেয়ালচিত্র কালিমালিপ্ত করা, মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতি হুমকি এবং সরকারী তরফে বিকাল ৫ টার মধ্যে নববর্ষের অনুষ্ঠান গুটিয়ে নেয়ার নির্দেশ-সবকিছুকে একসূত্রে গ্রথিত করছেন আওমীপন্থী বুদ্ধিজীবিরাও।

আগামী নির্বাচনই যে হেফাজতের প্রতি সরকার প্রধানের আনুকূল্যের মূল কারণ, সেটি ইতিমধ্যে সকলের জানা হয়ে গেছে। বাম মিত্রদের যৎসামান্য ভোটের ওপর নির্ভর করতে পারছে না ক্ষমতাসীনরা। তাই হেফাজতের ভোট হয়ে উঠছে বড় ভরসা। ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “রিয়েলষ্টিক এপ্রোচ নিয়ে দেশ চালাতে হবে। অধিকাংশ জনগনের আবেগ-অনুভূতি তো ইগনোর করতে পারিনা”। তিনি এও বলেছেন, ভাস্কর্য অপসারণের পক্ষে থাকাই প্রগতিশীলতা। পাঠক দেখবেন, মি. কাদেরের বক্তব্য ‘অধিকাংশ জনগনের অনুভূতি’ ‘বাস্তবতা’ ‘প্রগতিশীলতা’ ইত্যাদি কথামালা সবিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদকের বক্তব্যের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, হেফাজত এবং কওমী মাদ্রাসা এখন সবচেয়ে বড় ‘বাস্তবতা’। দেশের অধিকাংশ মানুষ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা ও হেফাজতের পক্ষে এবং ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে! মি. কাদের তাঁর ভাষায়, এই অধিকাংশ মানুষের মনোভাব বুঝলেন কি করে? ভাস্কর্য অপসারণ যদি তার ভাষায় প্রগতিশীলতা হয়, তা কি শুধু সুপ্রীম কোর্টের ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে? নাকি হেফাজতের সাথে মিলে তারা দেশের সব ভাস্কর্য অপসারণ করে ফেলবেন?  তার ভাষায়, এই ‘রিয়েলষ্টিক এপ্রোচ’ যদি গ্রহনীয় হয়, তাহলে বিএনপি-জামায়াতের জোটবদ্ধতা ‘রিয়েলেষ্টিক’ নয় কেন?

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গত কয়েক দশকে ভোটারদের কাছে খাঁটি ইসলামী দল প্রমানের চেষ্টা উন্মত্ত প্রতিযোগিতার আকার নিয়েছে। প্রয়োজনে তারা যে কোন দল ধর্মান্ধ, চরমপন্থী গোষ্ঠির সাথে আঁতাত বা জোট করে ফেলছে। বিএনপি এক্ষেত্রে খোলামেলা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ জামায়াতের সাথে জোট করে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে। কথিত অসা¤প্রদায়িক দল আওয়ামী লীগ এই ক্ষেত্রে এখন আর বিএনপির চেয়ে কোন অংশে কম যাচ্ছে না। জাতীয় পার্টির কথা উল্লেখেরই প্রয়োজন নেই।

ক্ষমতা প্রশ্নে গত সাড়ে চার দশক ধরে জাতির মনোজগতই পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। ধর্মানুভূতির কোমল দিকগুলো নিয়ে রাজনীতিকরা খেলছে। জনগনের সহজাত সারল্যকে পূঁজি করে নেতিবাচকতা ও অদৃষ্টবাদী রাজনীতির চর্চাই আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এর ফলে গোটা জাতির, বিশেষ করে তরুনদের মনোজমিনে নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। সেই অনিবার্যতায় ভর করা উগ্রপন্থাও হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার এবং সেটিকে দমনের বদলে ব্যবহারের প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।