Home » প্রচ্ছদ কথা » হাওরে মহা-বিপর্যয় : ভুল উন্নয়নের নিদারুন খেসারত

হাওরে মহা-বিপর্যয় : ভুল উন্নয়নের নিদারুন খেসারত

হাসনাত কাইয়ুম ::

হাওরে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। হাওরের ৭ জেলার সাড়ে ৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল। গত ২৯ মার্চ থেকে শুরু হয়ে আজ পর্যন্ত বহমান ঢলের পানিতে তার ৮০% তলিয়ে গেছে, যার অর্থমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। পরিবেশ দুষনে মারা গেছে ২ হাজার মেট্রিক টন মাছ। কাকড়া, ব্যাঙ, কেঁচো কতো পরিমান মারা গেছে বা জীব-অনুজীব কতো নষ্ট হয়েছে- তার পরিমাপ করার উদ্যোগও কেউ নেয়নি। তবে এসবের প্রতিক্রিয়ায় ১০ হাজার হাঁস মারা পড়েছে। হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ২৪ লক্ষ পরিবার, তাদের গবাদিপশু আর সন্তান-সন্তুতিরা এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মাঝে পড়েছে, যার নজীর নিকট অতীতে নেই।

এ বিপর্যয় অংশ প্রাকৃতিক কিন্তু প্রধানত মনুষ্যসৃষ্ট। বিশেষজ্ঞ মতে এর দায় ‘জলবায়ু পরিবর্তন’-এর, সরকারী মতে, বাধঁ কেটে দেওয়া কৃষকদের; আর প্রতিবাদকারীদের মতে, পাউবো, ঠিকাদার আর ক্ষমতাসীনদের সিন্ডিকেটের। আবহাওয়া অধিদপ্তর কিন্তু জানাচ্ছে এ রকম অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ৩৫ বছর আগেও একবার হয়েছিলো। তখন হাওরের সিংহভাগ ফসল তলিয়ে যাওয়া, ৭টি জেলা একইভাবে আক্রান্ত হওয়া, একে একে ফসল রক্ষার সবগুলো বাধঁ ভেঙে পড়া, তেমন কিছুর কথা কিন্তু কেউ বলছে না।

৩৫ বছর আগে পরের এ পরিবর্তনের অনেকগুলো ডাইমেনশন নিয়ে আলাপ করা যায়; কিন্তু একটা বড়ো ডাইমেনশন হলো নদীর নাব্যতা। নদী তখন ঢলের পানির অধিকাংশটা বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো গভীর ছিল। গত ৩৫ বছরের ‘উন্নয়ন’ দিয়ে এই গভীরতাটা আমরা ভরাট করেছি এবং আমাদের মস্তিস্কেরও। মন্ত্রী কৃষকদের বাধঁ কেটে দেওয়ার ফিরিস্তির পাশাপাশি বাধেঁর উচ্চতার সমস্যার কথাও তুলেছেন। আমাদের উন্নয়ন দর্শন ‘বাধঁ এবং আরো উচু বাধঁ’-এর মধ্যে যেভাবে আটকা পড়েছে, তা থেকে বের করে ‘কৃষকদের বাধঁ কেটে দেওয়া’ অভিজ্ঞতার কাছে ফেরত আনতে  না পারলে, এবারের দুর্যোগ থেকে হয়তো কোনভাবে বের হতে পারা যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরো বড় বড় দুর্যোগে ‘হাওর’ পড়বেই। মন্ত্রীর পক্ষে এই সামান্য বিষয়টা বোঝা সম্ভব হয়নি যে, বাধঁ যতো উচু হবে তার ভেঙে যাওয়ার আশংকাও তার দ্বিগুন মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। বাধঁ ২ ফুট উচু না করে বাধেঁর ভেতরের গভীরতা ৩ ফুট বাড়ালে যে এর চেয়ে ঢের বেশী পানি বয়ে যাবে, আর বাধঁও ঠিকে থাকবে- এটুকু ভাবতে পারার ক্ষমতাও আমরা দুর্ণীতিবাজদের মুনাফার কাছে বিক্রী করে বসে আছি।

হাওর আসলে কতগুলো?

পত্রিকার রিপোর্ট আর সরকারী পরিসংখ্যান দেখে বাংলাদেশে কতো হাওর আছে তা বোঝার কোন উপায় নেই। ব্রিটিশরা খাজনা আদায়ের জন্য মৌজা, পরগনা ইত্যাদির সৃষ্টি করেছিলো। কৃষকরা তেমন নয়, তারা তাদের সন্তানদের মতো, গরু বাছুরের মতো, তাদের ফসলের মাঠেরও নাম রাখে। সরকারী পন্ডিতরা এ দুয়ের পার্থক্য বুঝেই অথবা না বুঝেই বৃটিশ কায়দাতেই হাওরকে ৩৭৪টি বা ৩৭৬টিতে ভাগ করেছে। এইভাবে ভাগ করা গেলে ছোট ছোট বিভক্ত এইসব ইউনিটকে উন্নয়নের নামে হজম করা সহজ হয়। গত ৫০-৬০ বছরে হজমের এ কাজটি সরকারী সংস্থাগুলোর প্রায় সবাই মিলে একযোগে করে গেছে। তাতে ৭ জেলার ৫০-৫৫টি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত ২০ লক্ষ একরের একক বৈশিষ্টমন্ডিত, পৃথিবীর একমাত্র বৃষ্টিজলের ক্ষুদে এবং প্রতিবছর নবায়নযোগ্য যে সমুদ্রটি আমাদের ছিলো, তার প্রাকৃতিক, বাস্তুতান্ত্রিক -এমনকি অর্থনৈতিক মুল্য জাতি হিসাবে বুঝে উঠার মতো সাবালক হয়ে উঠার আগেই আমরা তার মৃত্যু পরোয়ানা জারী করে বসে আছি।

বাংলাদেশে, বলা ভালো পৃথিবীতে হাওর ধারনা একটাই- এটি অখন্ড, অবিভাজ্য। কথিত ৩৭৬ টি হাওরের মাঝে কোন দেয়াল নেই, ছিলো না। হাওর যে একটা অভিন্ন একক স্বত্তা এটার প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেখা যায় ‘হাওর মাস্টার প্ল্যান’-এ। এই মাস্টার প্ল্যান যদিও পুর্ববিবৃত উন্নয়ন দর্শন থেকে পৃথক ছিলো না, তবুও এর কিছু ইতিবাচক দিক ছিলো; কিন্তু বর্তমানে এর প্রবক্তারা তাও আর মানছেন না। হাওর মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, হাওরের ভেতরে ‘ডুবো সড়ক’ নির্মানের স্বীকৃতি থাকলেও হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পরিপন্থী কোন ‘আভুরা সড়ক (বর্ষায় ডুবে যাবে না এমন সড়ক)’ নির্মাণের পরিকল্পনার স্থান ছিলো না। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকা হাওর জনপদের জনগনের দ্রুত যোগাযোগের আকাঙ্খাকে পুজি করে, হাওরে এখন যেসব ‘আভুরা সড়ক’ গড়ে তোলা হচ্ছে- তাতে পানি চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্রিজ, কালভার্ট ,আন্ডারপাস ইত্যাদিরও ব্যবস্থা রাখা হচ্ছেনা; পরিবেশগত পর্যালোচনা তো দুরের কথা। এই সব ‘উন্নয়ন’ হাওরকে ছোট ছোট বিল, ডোবা, বাওরে বিভক্ত করে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরী করতে যাচ্ছে বলে পরিবেশ সংগঠনসমুহ দীর্ঘদিন যাবত অভিযোগ করে আসছে।

ইউরেনিয়াম বিতর্ক :

ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে ৫৪টি আর্ন্তজাতিক নদী রয়েছে- তার প্রায় ১৮-২০টি নদী এ হাওরাঞ্চলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা ধরে বঙ্গোপসাগরে গেছে। পৃথিবীর সবচাইতে বৃষ্টিপাতময় অঞ্চল চেরাপুঞ্জি টাঙ্গুয়া থেকে মাত্র ৩০-৩৫ মাইল উজানে। মেঘালয়, আসাম, মিজোরামের বৃষ্টির পানির একটি বড় অংশ এই হাওর বেসিনে নেমে এসে জমা হয়। ফলে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা নতুন বা অপরিচিত কিছু নয়। ২/৩ বছর পরপরই হাওরের কোন না কোন অংশ দিয়ে আগাম ঢলের পানি নেমে আসে, আমাদের বাধঁগুলি ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়, মানুষ কিছুদিন ত্রু টিপুর্ণ বাধঁ নির্মাণের জন্য দায়ীদের বিচারের দাবীতে আন্দোলন করে, একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়। কিন্তু কোনদিনই কোন দুর্ণীতিবাজের বিচার হয় না। কিন্তু গোটা হাওরের প্রায় সব মাঠ একের পর এক তলিয়ে যায়, এমন ঘটনা ঘটেনা। আগাম ঢলে ধান তলিয়ে গেলেও প্রজনন মৌসুমে নতুন পানির ছোঁয়ায় মাছের বংশবিস্তার ভালো হয়। কিন্তু ঢলের পানিতে মাছ মরে পচে ভেসে উঠে, কাকড়া, কেচোঁ, ব্যঙ মরে যায়- এমন ঘটনা হাওরবাসী আগে কখনো দেখেনি, শুনেওনি।  হাওরে সার, কীটনাশকের ব্যবহার বহু পুরনো, এটি এ বছর এমন নাটকীয় মাত্রায় বাড়ার কোন রিপোর্ট নেই। কিন্তু মাছ টাঙুয়াতেও মরেছে, হাকালুকিতেও মরেছে, অন্যত্রও মরেছে। এটা নজীরবিহীন।

আমাদের সীমান্তের মাত্র তিন মাইল উজানে মেঘালয়ে অবস্থিত ‘রানিকর’ নদীর পানিদুষন নিয়ে স্থানীয়রা আন্দোলন করেছেন এবং সেসব খবর পত্রিকায় এসেছে, কিন্তু যৌথ নদী কমিশন বা অপরাপর কোন প্রতিষ্ঠান এইসব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আমাদের বন্ধুুরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন তথ্য জানতে চেয়েছে- এমন কোন খবর কারো জানা নেই। অথচ ‘জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ কনভেনশন-১৯৯৭’ অনুযায়ী উজানের দেশ ভাটির দেশকে এইসব তথ্য জানাতে বাধ্য। এবং কোন দেশ তার নিজ দেশের পানি প্রবাহের এমন দুষন করতে পারে না- যা তার ভাটির দেশকে  ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমাদের এখানে বিতর্ক চলছে পানিতে ইউরেনিয়াম জনিত তেজস্ক্রিয়তা আছে কি নেই- তা নিয়ে। কিন্তু কি কারনে হাওরে এসব নজীরবিহীন দুষন ঘটলো- তা নিয়ে কোন আলোচনা কোন পক্ষই ঠিকমতো তুলছে না এখনো । এইসব দুষন স্থানীয় কোন স্থাপনাজাত নাকি আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহজাত তা নিরুপন করা এবং এর মোকাবেলার পথ-পদ্ধতি বের করতে না পারলে হাওর এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হবে ।

হাওর কি শুধুই সুনামগঞ্জ?

আমাদের আশংকা হাওরের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গচিত্র পেতে আমাদের আরো বেশ কিছুদিন অক্ষো করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যতোটুকু চিত্র আমরা পেয়েছি তাতে এটুকু স্পষ্টভাবেই বলা যায়- পরিবেশ বিপর্যয়ের কারনে কোন এলাকায় এতো স্বল্প সময়ের মধ্যে এতো বিশাল ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার নজীর সারা পৃথিবীতেই আর একটাও নেই। কিন্তু এ নজীরবিহীন ঘটনা মোকাবেলায় সরকারী-বেসরকারী প্রস্তুতি নিতান্তই অপ্রতুল। এমনকি আমাদের সরকার, বিরোধী দল, এনজিও, সিভিল সোসাইটি, মিডিয়া, সংস্কৃতিকর্মী কোন পক্ষই এখনো ঘটনার গভীরতা এবং ব্যাপকতাকে বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য বিপর্যয়কে মোকাবেলার প্রস্তুতি  নেওয়ার কথা ভাবছে না। মিডিয়ার পরিবেশনা থেকে এটা যে কারো মনে হতে পারে হাওর মানেই সুনামগঞ্জ অথবা সুনামগঞ্জই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা। অথচ এর পাশেই নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি। সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকদিন আগেই খালিয়াজুড়ির শতভাগ ফসল তলানো শেষ। লড়াই করার নেতৃত্ব মনোবল কোনটাই আর অবশিষ্ট নেই, কবরের নিস্তব্দতা গোটা এলাকা জুড়ে। একই অবস্থা খোদ রাষ্ট্রপতির এলাকা কিশোরগঞ্জে, হবিগঞ্জে, মৌলভীবাজারে। ফলে মিডিয়ার মনোযোগেও নেই তারা।

উপরোল্লিখিত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে হাওরের মহাবিপর্যয়কে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসাবে ঘোষনার দাবীতে উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দের পক্ষ থেকে যে সব দাবী-দাওয়া তোলা হয়েছিলো সেগুলোতে আর একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারি :

(১) জীবন-জীবিকার জন্য শুধুমাত্র বোরো চাষের উপর নির্ভরশীল এমন ২৪ লক্ষ পরিবারকে খাদ্য সহায়তার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে (২) হাওরে সবার জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে (৩) সরকারী-বেসরকারী সকলপ্রকার ঋণের সুদ মওকুব করতে হবে এবং কিস্তি আদায় স্থগিত করতে হবে (৪) ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপুরণ অথবা বিনাসুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ দিতে হবে (৫) হাওরে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ যাতে দেখা না দেয়, তার জন্য পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে (৬) শিশুদের শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া রুখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং একইসাথে বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে  (৭) হাওরের সকল জলমহালের লীজ বাতিল করে উন্মুক্ত জলাশয়ে সকলের মাছ ধরার অধিকার দিতে হবে (৮) হাওরের পরিবেশ দুষনের প্রকৃত কারন নির্ণয় করতে হবে (৯) বাধঁ নির্মানে জড়িত দুর্ণীতিগ্রস্তদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, এবং (১০) স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, প্রাকৃতিক মৎস্যক্ষেত্র সংরক্ষনসহ পরিবেশ অনুকুল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওরের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।