Home » আন্তর্জাতিক » চীন যুক্তরাষ্ট্রের কতো বড় শত্রু ?

চীন যুক্তরাষ্ট্রের কতো বড় শত্রু ?

আসিফ হাসান ::

দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিং তার সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে- তা গোপন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সেখানে যে আরেকটি পরাশক্তি আছে এবং সে তার আধিপত্যকে আরো প্রবল করে যাচ্ছে, সেটা আমরা বুঝতেই পারছি না। একেবারে শক্ত ‘ফাঁস’ দিতে ইতোমধ্যেই চীনের চারপাশে ৪শ’ সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক চলচ্চিত্রকার জন পিলজার নতুন একটি ডকুমেন্টারি নির্মান করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে নতুন, বৃহত্তম বাণিজ্যিক চীনকে শত্রু  হিসেবে গণ্য করার ধারণাটিই তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন এই ডকুমেন্টারিতে। তিনি বেইজিংয়ের একেবারে দোরগোড়ায় যুদ্ধপ্রস্তুতির বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।

মার্শাল আইল্যান্ডস, জাপান, কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে দুই বছর ধরে ছবি সংগ্রহ করে তিনি এই অঞ্চলে আমেরিকার গোপন ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তার এই ডুকেমেন্টারি প্রচলিত ধারণা আমূল পাল্টে দেবে।

তিনি দেখিয়েছেন, অতি গোপন ‘প্রজেক্ট ৪.১’-এর আওতায় মার্শাল আইল্যান্ডসের লোকজনকে কিভাবে পরমাণু গিনি পিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

পিলজার জাপান ও কোরিয়াও সফর করেছেন। তিনি লোকজনের সাথে কথা বলেছেন, দেখেছেন তারা কিভাবে মার্কিন সম্প্রসারণ প্রতিরোধ করছে। তিনি জাপানের দ্বীপ ওকিনাওয়াও গিয়েছিলেন। সেখানে ৩২টি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তিটিকে চ্যালেঞ্জকারী লোকজনের সাথেও তিনি কথা বলেছেন। পিলজার বলেন, বর্তমানে একটি অদ্ভূত ও বিপজ্জনক পরিবেশ বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাওয়া দেশ চীনের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে প্ররোচনা, হুমকি, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং বিভ্রান্তির ফলে এমন এক অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে, সেটাই ভুল বুঝাবুঝি কিংবা ভুলক্রমে বা দুর্ঘটনাক্রমে সত্যিকার যুদ্ধের শঙ্কা সৃষ্টি করছে।

চীনকে নিয়ে সত্যিই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু আছে কিনা সেই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, চীনকে শক্তভাবে ‘ফাঁস’ দিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির আশপাশে ৪শটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ঘাঁটির কয়েকটি একেবারে চীনের দোড়গোড়ায়; সেগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র, রণতরী, পরমাণু বোমারু বিমান রয়েছে। চীনা পানিসীমার ঠিক বাইরে নিয়মিত মার্কিন রণতরীগুলো টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে প্রায় এক হাজারটি বিদেশী ঘাঁটি আছে, সেখানে চীনের রয়েছে মাত্র একটি। এবং সেটাও এত ছোট যে, কোনোভাবেই ক্যালিফোর্নিয়ার ওপর হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে না।

তিনি অবশ্য এটাও স্বীকার করেন, দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপগুলোতে এয়ারস্ট্রিপ বানিয়ে বেইজিংও উত্তেজনায় ইন্ধন দিচ্ছে। তবে চীনকে টার্গেট করে যুক্তরাষ্ট্রও যে নতুন নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে, সেকথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

তিনি আরেকটি তথ্য দিয়েছেন। তা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, বারাক ওবামাই দক্ষিণ চীন সাগরের আঞ্চলিক বিতর্ককে পরমাণু শক্তিদের মধ্যকার দ্বন্ধের প্রধান বিষয়ে পরিণত করেছেন। পিলজার বলেন, ২০১১ সালে ক্যানবেরায় গিয়ে ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ঘোষণা দেন। এই মতবাদের ওপর ভর করেই তিনি চীনকে টার্গেট করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এশিয়া ও প্যাসিফিকে থাকা মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর অবস্থানগুলো জোরদার করতে থাকেন।

পিলজার বলেন, ট্রাম্প আসলে কার্টুন-চরিত্রের মতো এবং কিছুটা অনিশ্চত ধরনের মানুষ। সেটা বাদ দিলে মনে হবে, ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে নীতি অনুসরণ করে আসছিল, তিনি সেটাই বজায় রাখছেন। তার মতে, এ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগে থাকার অনেক কারণ রয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, একদিকে রয়েছে চীন। এই দেশটি অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার; অন্যদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশটি অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘস্থায়ী মিত্র। অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক, সব দিক দিয়েই সে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রতি যে অবস্থান গ্রহণ করেছে অস্ট্রেলিয়া, তাতে করে তার যুক্তরাষ্ট্রর আনুগত্য প্রকাশটাই ফুটে ওঠেছে। আর এটাই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধে সেও পড়ে গেছে। অথচ অস্ট্রেলিয়া সত্যিকারের স্বাধীন দেশ হিসেবে অবস্থান করলে তার কোনো শত্রু ই থাকতো না।

পিলজার চীনের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থানের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন বেশ ভালোভাবে। গরিব, অন্ধকার নগরীগুলো কিভাবে আধুনিক হয়ে আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে সেটা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তিনি চীনাদের আশাবাদ দেখেও মুগ্ধ হয়েছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তার আধিপত্য বিস্তারে জোর দিয়েছে, তাতে অনেককে ভীতও দেখাচ্ছে।

তিনি বলেন, এক স্ট্র্যাটেজিস্ট বলেছেন, ‘আমরা [পাশ্চাত্যে] নিজেদের শত্রু  হতে চাই না। তবে আমাদের অব্যাহতভাবে যদি শত্রু  হিসেবেই প্রচার করা হতে থাকে, তবে আমাদের সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

আর সে কারণেই চীন দ্রুত তার সামরিক বাহিনীর আকার ও শক্তি বাড়াচ্ছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি মহল সেটাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করছে।

(বিদেশী মিডিয়া থেকে)