Home » অর্থনীতি » সামনে রোজা : প্রতি সরকারের সময়ের ব্যতিক্রমহীন একই অভিজ্ঞতা

সামনে রোজা : প্রতি সরকারের সময়ের ব্যতিক্রমহীন একই অভিজ্ঞতা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

সামনে রমযান মাস। এ মাসটিকে ঘিরে মুসলিম পরিবারগুলোর নানা প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। এসব প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কেনাকাটা। এ মাসকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ীও রীতিমতো তৎপর হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব এরই মধ্যে দেশের খোলা বাজারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনাসহ দেশের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দামের উর্ধ্বগতি। এমনিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের দুর্দশা। এ সময়ে পাইকারি বাজার কয়েকজন পুঁজিপতি আর মহাজনের হাতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে; যারা দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধির সংকেত দেয়, নিয়ন্ত্রণ করে, এমনকি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার মানসে পণ্য গুদামজাত করে রাখে। রমযান হলেও ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার উল্টোরূপ দেয়। রমযান আসলে দ্রব্যমূল্যর উর্ধ্বগতি এটা যেন একটি ঐতিহ্য হয়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে ক্রেতা সাধারণ রমযান এলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশংকায় উৎকন্ঠিত থাকেন। রমযানের দিনে যে সব পণ্যের বেশী প্রয়োজন পড়ে সে জাতীয় দ্রব্যের মূল্য এখন বাড়তির দিকে। বিশ্বের সব দেশে উৎসব এলে পণ্য সামগ্রীর দাম কমে কিন্তু বাংলাদেশে তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়।

ছোলা, মটর, খেসারি, পিয়াজ, তেল, চিনি, বেসন, মাংস, মাছ, মুরগি বিভিন্ন মসলা, শাক সব্জি সহ প্রভৃতি দ্রব্যের দাম কম বেশী বেড়েছে। রমযানের ইফতারিতে ছোলা ও পিয়াজ এবং কাঁচা মরিচ, অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হওয়ায় চাহিদার প্রেক্ষিতে বিক্রেতারাও বাড়িয়ে দিয়েছে ছোলাসহ অন্যান্য দ্রব্যের দাম। এক মাস ব্যবধানে মোটা স্বর্ণা চাল কেজি প্রতি ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা দরে, পারিজা চাল ৪৪-৪৫ টাকা, মিনিকেট (ভালো মানের) ৫৬-৫৭ টাকা, মিনিকেট (সাধারণ) ৫৩-৫৪ টাকা, বিআর২৮ ৪৮-৫০ টাকা, সাধারণ মানের নাজিরশাইল ৬ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা ও উন্নত মানের নাজিরশাইল ৫৬ টাকা। এছাড়া পাইজাম চাল কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৪৮-৫০ টাকা, বাসমতি ৫৬ টাকা, কাটারিভোগ ৭৬-৭৮ টাকা, হাস্কি নাজির চাল ৪১ টাকা এবং পোলাও চাল ১০০ (পুরাতন), নতুন ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মুদি পণ্যের দাম ঊর্দ্ধমুখী। বাজারে ছোলা ও ডালের দাম এক ধাপ বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া ছোলা এখন বাজারে ৯৫-১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মুগ ডালের দাম গত সপ্তাহে কেজিতে ১০ টাকা বাড়ার পর এখন বাজারে আরও ৫ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা দরে; ভারতীয় মুগ ডাল ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাসকলাই ১৩৫ টাকা, দেশি মসুর ডাল ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১২৫ টাকা ও ভারতীয় মসুর ডাল ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে চিনির দাম কেজিতে প্রায় ৫-৮ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া চিনি এখন বিক্রি হচ্ছে ৭২-৭৩ টাকা দরে। গত কয়েক সপ্তাহের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ ও রসুন। দেশি রসুন এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। এছাড়া ভারতীয় রসুন কেজিতে ২৩০ টাকা দরে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। গত সপ্তাহের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে প্রায় সব ধরনের ভোজ্য তেল। এখন বাজারে ৫ লিটারের বোতল ব্র্যান্ড ভেদে ৫০০ থেকে ৫১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি লিটার ভোজ্য তেল ১০০ থেকে ১০৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লবণ কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৩৮ টাকায়; দারুচিনি ১০ টাকা বেড়ে ৩৬০ টাকা; জিরা ৪৫০ টাকা; শুকনা মরিচ ২০০ টাকা; লবঙ্গ ১৫০০ টাকা; এলাচ ১৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বিদ্যমান অবস্থায় সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে রোজার মাসে সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রমযানকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক মন্দাভাব, আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত নানা জটিলতা বিভিন্ন প্রেক্ষিতে চালের দাম বেড়েছে, যা কিনা ক্রেতাদের উপর হঠাৎ চাপ প্রয়োগ করছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব রকম চালের দাম বেড়েছে। রমযান মাসে দাম আরো বাড়তে পারে বলে ক্রেতারা আশংকা প্রকাশ করছেন। অন্যসব জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বাড়িয়ে চালের দামটা কম থাকলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি মেলে। কারন চালের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মানুষকে আঘাত করে। এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এক বৈঠকে রমযান মাসে দ্রব্য মূল্য স্থিতিশীল রাখার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, রমযানের জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না। কথাটি কতটুকু কার্যকর হবে তা রমযানের শুরুতে বোঝা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, চাহিদা অনুযায়ী দ্রব্যের সরবরাহ প্রচুর রয়েছে। চলতি মাসে দ্রব্যসামগ্রীর দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে ক্রেতারা রীতিমত হতাশ হয়ে পড়ছেন। এমনিতে অর্থনৈতিক মন্দাভাব তার উপর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শুরু হচ্ছে রমযান, সব মিলিয়ে এক উৎকন্ঠা কাজ করছে। ক্রেতারা মনে করছেন, রমযান মাসে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এজন্য এখনই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কর্তৃপক্ষও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাজার পুরোপুরি পুঁজির লগ্নিকারকদের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ যাদের আমরা ব্যবসায়ী বলে থাকি। আবার এই ব্যবসায়ীরাই কিন্তু শাসক শ্রেণীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই তাদের স্বার্থে আঘাত হানার শক্তি-সাহস কারো থাকতে পারে তেমন আশা সুদূর পরাহত। আমাদের গণমাধ্যমগুলো বাজারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রতি রোজার শুরু থেকে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে। এতে জনগণের কোনো সুফল ঘটে বলে মনে হয় না। নয়তো প্রতি রোজার মাসে অভিন্ন দুর্ভোগ আমাদের পোহাতে হবে কেন? মানুষের ক্রয় ক্ষমতার অধীনে থাকবে খাদ্য-পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। রোজাকে উপলক্ষ্য করে লাগামহীন খাদ্য-পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে এযাবৎকালের একটি সরকারের শাসনামলেও কোন ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা আমাদের দেখা হয়নি। অভিজ্ঞতাগুলো এক এবং অভিন্ন। রোজা এলে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যেন অবধারিত। জনগণও এ বিষয়ে পরিস্থিতির অসহায় শিকরে পরিণত হয়েছেন। রোজায় খাদ্য-পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে এটা অনিবার্যভাবেই আমাদের মনোজগতে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। সে কারণে কেউ টুঁ শব্দ করে না। রোজার মাসে মুনাফাবাজ ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফাকে অনিবার্য বলেই বিবেচনা করে থাকি।

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার যদি কিছু করতে চায় তবে তাকে বিকল্প বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটা করতে হলে সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে- যেন বাজারে আরো ব্যবসায়ী আসতে পারে, ফলে সেখানে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। অথবা হতে পারে সেটা টিসিবিকে শক্তিশালী করা। সরকারের হাতে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এটা ছাড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। বাজারও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কিন্তু সরকার যা করেন তা হচ্ছে, মাঝে মাঝে ব্যবসায়ীদের ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কখনো হুমকি ধামকি দেন, কখনো সবক দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে এটা কোনো পদ্ধতি নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ একটা ব্যবস্থাপনার বিষয়, একটা সিস্টেমের বিষয়, সরকারকে এই সিস্টেমে হাত দিতে হবে।

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ডাল, ছোলা, তেল, চিনি যা যা প্রয়োজন আগে থেকে আমদানি করে মজুদ করে রাখতে হবে। মজুদ করার ব্যবস্থা না থাকলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ২/১ মাস আগে তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আবার শুধু রমজানের সময় নয়, পণ্যদ্রব্যের মূল্য অন্য সময়েও বাড়ে। কাজেই টিসিবির হাতে প্রয়োজনীয় মজুদ সব সময় থাকতে হবে এবং তাকে বাজারে উপস্থিত থাকতে হবে। টিসিবি যতদিন দুর্বল থাকবে ততদিন বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে অতি মুনাফা খোর ব্যাবসায়ীদের হাতে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলতেই থাকবে।