Home » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্পের সৌদি সফর : বিশাল অংকের অস্ত্র বিক্রয় আর ইরানকে হুমকিই উদ্দেশ্য

ট্রাম্পের সৌদি সফর : বিশাল অংকের অস্ত্র বিক্রয় আর ইরানকে হুমকিই উদ্দেশ্য

আমাদের বুধবার বিশ্লেষন ::

প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার পুরস্কার হাতে হাতে পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  সৌদি বাদশাহ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র  ক্রয়ের চুক্তি করেছেন। নগদ প্রাপ্তির পাশাপাশি দুই দেশের অভিন্ন শত্রু  ইরানকেও বার্তা দিয়ে দেওয়া হলো এই চুক্তির মাধমে। এছাড়া ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও নানা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির পুন:নির্বাচিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প আর বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের উপস্থিতিতে চুক্তিটি সই হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের জয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। পূর্বসূরি বারাক ওবামার আমলে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি করে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা নাখোশ হয়েছিল। ইসরাইলও তীব্র বিরোধী ছিল ইরানের সাথে চুক্তির।

ট্রাম্প ওই পথে হাঁটছেন না। তিনি কেবল সৌদি আরবের সাথেই চুক্তি করেননি, সৌদি রাজধানীতে মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের একটি সম্মেলনেও ভাষণ দেন।

এটাও আবার ২০০৯ সালে কায়রোতে ওবামার ভাষণেরই জবাব বলে মনে হচ্ছে। ওবামা যেমন ওই ভাষণের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পও সেই অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন আরো বড় পরিসরে। ইরাক যুদ্ধের ফলে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল, ওবামা সেটা সংশোধন করার উদ্যোগী হয়েছিলেন। আর ট্রাম্প গত বছর নিজের বলা ‘আমি মনে করি ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে’ উক্তিটি কিছুটা মোলায়েম করে নিলেন। তিনি রিয়াদ ভাষণে চরমপন্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলেন। তার মতে, এটা ‘ভিন্ন বিশ্বাসগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ নয়,’ বরং ‘ভালো ও মন্দের’ মধ্যে লড়াই। মুসলিম নেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প আরো বললেন, ‘আমরা এখানে বক্তৃতা ঝাড়তে আসিনি, কী করা উচিত, সেটা বলতেও আমরা এখানে আসিনি।’

তিনি তার শ্রোতাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কী করতে হবে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তাদের শত্রু দের ধ্বংস করার জন্য আমেরিকান শক্তির জন্য অপেক্ষা করে থাকলে চলবে না। সুন্দর ভবিষ্যত তখনই কেবল সম্ভব, যদি আপনারা নিজেরাই সন্ত্রাসী আর চরমপন্থীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন।’ তিনি পাঁচবার বলেন, ‘তাদেরকে তাড়িয়ে দিন।’

আর এরপর তিনি সেদি আরবের কাছে ১১০ বিলিয়ন ডলারের ‘সুন্দর’ অস্ত্র বিক্রির কথা ঘোষণা করেন। এছাড়া তিনি রিয়াদে গ্লোবাল সেন্টার ফর কম্বেটিং এক্সট্রিমিস্ট আইডলজি এবং টেররিস্ট ফিন্যান্সিং টার্গেটিং সেন্টারের উদ্বোধন করেন।

ইরানকে তিনি সরাসরি অভিযুক্ত করেন আঞ্চলিক বেশির ভাগ সমস্যা সৃষ্টির জন্য। তিনি বলেন, ‘লেবানন থেকে ইরাক, ইয়েমেন পর্যন্ত সবজায়গায় সন্ত্রাসী, মিলিশিয়া এবং অন্যান্য চরমপন্থী গ্রুপগুলোকে তহবিল, অস্ত্র আর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটি করছে ইরান।’

তবে জিহাদিদের বেশির ভাগই যে সুন্নি এবং সৌদি আরবেরও যে মানবাধিকার রেকর্ড ভালো নয়, সে তথ্য বেমালুম চেয়ে গেছেন ট্রাম্প।

ইরানের বিরুদ্ধে এই বিষোদগারের ফলে ওবামার আমলে গ্রহীত নীতি পুরোপুরি বদলে গেল বলেই মনে হচ্ছে। সৌদি আচরণেও সেটা বোঝা যাচ্ছে। ইরানের সাথে চুক্তির পর ২০১৬ সালে ওবামা সৌদি আরব গেলে তাকে শীতল সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ট্রাম্পকে গ্রহণ করা হয় বেশ উষ্ণভাবে।

তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্প হঠাৎ করে ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসবেন না। তিনি হস্তক্ষেপ করার নীতিও গ্রহণ করবেন না। তাছাড়া সৌদি আরবের সাথে যে সামরিক চুক্তিটি হলো, সেটার অনেক কিছু আগের প্রশাসন আমলেই হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে আসছে।

এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যে ঝাঁঝালো বক্তব্য ট্রাম্প রেখেছেন, তা সত্য নয় বলে মনে করেন বিখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় এক কলামে তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তৃতা ভন্ডামি আর তাচ্ছিল্যে ভরপুর। ফিস্ক লিখেছেন, ট্রাম্প ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ইন্ধন’ দেওয়ার জন্য আইএস-এর বদলে ইরানকে দায়ী করেছেন। তার এই মন্তব্যের ফলে উদার সংস্কারবাদী নেতা হাসান রুহানিকে পুনঃনির্বাচিত ইরানি জনগণ ‘হতাশ’ই হয়েছে।

ফিস্ক বলেন, তিনি ‘চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদী’ পরিভাষাটি পরিহার করে তার জায়গায় ‘ইসলামি চরমপন্থী’ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। দুটির মধ্যে প্রচ্ছন্ন পার্থক্য রয়েছে। ইংরেজিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে তিনি যা বুঝিয়েছেন তা হলো সন্ত্রাসীরা মুসলিম।

তারপর ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমাদের বন্ধুরা কখনো আমাদের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করবে না এবং আমাদের শত্রু রা কখনো আমাদের সংকল্প নিয়ে সংশয়ে থাকবে না’ তা দিয়ে তিনি কি বন্ধু বলতে সৌদিদেরই ধরে নিয়েছেন? নাকি ‘ইসলামি বিশ্বকে’? ইসলামি বিশ্ব বোঝানো হলে তাতে ইরান, সিরিয়া ও ইয়েমেন, এমনকি লিবিয়ার মিলিশিয়ারাও থাকবে। ফিস্ক প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প যাদের শত্রু  বলতে কি আইএস-কে বুঝিয়েছেন? নাকি রাশিয়াকে? নাকি সিরিয়া? নাকি ইরান? নাকি তিনি সুন্নি মুসলিমদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে শিয়া মুসলিমদেরকে শত্রু  গণ্য করছেন?