Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাজেট : পাপমুক্ত করে অসীম পূন্যলাভের পদক্ষেপ

বাজেট : পাপমুক্ত করে অসীম পূন্যলাভের পদক্ষেপ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এই জনগন ঝাঁকের কৈয়ের মত ভোট দিয়েছিল আওয়ামী লীগকে; বুক বেঁধে ভবিষ্যতের আশায়। এখন  বর্তমান বলেও কিছু নেই বলেই মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ভোট দেয়ার সুযোগই মেলেনি। এক অভূতপূর্ব এবং প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে জনগনের কোন স্থান ছিল না। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত ছিলেন ১৫৩ জন। এদেরই একজন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। সুতরাং নির্বাচকমন্ডলীর কাছে তার বা তাদের কোন জবাবদিহিতা থাকার কথা নয় এবং নেইও।

কোন জবাবদিহিতা না থাকায় চলতি বছরের বাজেটে এজন্যই চেপে বসেছে বিশাল করের বোঝা। জনগনের পকেট কেটে অথবা কষ্টে-সৃষ্টে জমানো টাকাও ট্যাক্স-ভ্যাটের নামে কেড়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবারে জনগনকে টাকা গুনতে হবে নানাভাবে। সে বিভিন্ন ধরনের কর পরিশোধ করবে। বছরে তিন-চারবার বেড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করবে। পনের শতাংশ ভ্যাট সৃষ্ট দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি তার চোখের জল আর নাকের জল এক করে ছাড়বে।

প্রশ্নটি জরুরী, জনগন আর সরকার কী আলাদা হয়ে গেছে? লুটেরা পুঁজিপতি, কতিপয় সরকারী কর্মকর্তা (কর্মচারী নয়), কর্পোরেট আর সরকারী দলের স্বার্থ কি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে? বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সুযোগ-সুবিধার কথা একেবারেই বিবেচনায় আসছে না? অর্থমন্ত্রী তার কথ্যমতে জীবনের ‘শ্রেষ্ঠতম’ বাজেট দিয়েছেন, নাকি জনগনের ওপর ‘শ্রেষ্ঠতম বালা-মসিবত’ নাজিল করলেন? বাজেট পাশ হওয়ার আগেই সেটি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।

এই ‘শ্রেষ্ঠতম’ বাজেট ঘোষণার পর সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে, বাজেট দলিলের জায়গায় জায়গায় অসত্য তথ্য দিয়ে বাজেট অঙ্কের হিসাব মিলানো হয়েছে। তাদের মতে, ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার হিসেব অঙ্ক জানা কোন শিশুও বিশ্বাস করবে না। সিপিডি’র বক্তব্য সত্য ধরে নিলে কি এই দাঁড়ায়, অর্থমন্ত্রী কী লুটেরা পুঁজির আরো স্ফীতি ঘটাতে এবং কতিপয় জনগনের পকেট খালি করে কতিপয় ব্যক্তির হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করার সুযোগ সৃষ্টি করলেন।

অর্থশাস্ত্রে আবাগারী শুল্ক শব্দটি বাংলায় ‘অপরাধ বা পাপ কর – sin tax’ বলেই গন্য করা হয়। এই কর মূলত: আবাগারী শুল্ক হিসেবে পরিচিত। দেশে উৎপাদিত তামাক, এ্যালকোহলবা মদ জাতীয় পন্য ও লাইসেন্স প্রাপ্ত মদ, খাঁজা, আফিম ব্যবসার ওপর আবাগারী শুল্ক প্রযোজ্য। সমাজের জন্য ক্ষতিকর নেশা বা পরিবেশ দুষণকারী দ্রব্য ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে এই ‘পাপ’ কর আরোপ এবং ফি-বছর পর্যালোচনা করা হয়।

তার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠতম’ বাজেটে ব্যাংকে লাখ টাকার আমানতকারীকেই ‘সম্পদশালী’ আখ্যা দিয়ে ‘পাপ’ করের বোঝা চাপালেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, লাখপতি মানে সম্পদশালী এবং ব্যাংকে আমানত করা ‘পাপ’, সেজন্য তাদের আবাগারী শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। জনগন অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে পারে বাজেটে তাদের ‘পাপমুক্ত’ করা ও অসীম পূন্যলাভের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য, কৃতজ্ঞতা জানাতে পারে অর্থমন্ত্রীর নিয়োগদাতা প্রধানমন্ত্রীকেও।

এই ‘পাপ’ আসলে কার? রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “এ আমার, এ তোমার পাপ”। তাহলে সেই পাপের ভার সাধারন জনগন নেবে কেন? এর উত্তর কি প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রীর কাছে আছে? তারা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনকে আলাদা করে দিয়েছেন। এজন্য ফি-বছর বাড়াচ্ছেন বিদ্যুৎতের দাম, গ্যাসের দাম। এমনকি বছরে দুবার করে। আট বছর ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দামের নিম্নগামীতা কোন সুফলই এই জনগন পেলো না!

প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, “জনগনের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে”। অর্থমন্ত্রীর কথায়, জনগন লাখপতি। সুতরাং তাদের সিনট্যাক্স বা পাপ কর দিতে হবে। পনের শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য বাড়িয়ে তুলবেন, টাকার অবমূল্যায়ন ঘটাবেন এবং জনগনের পকেটের সমুদয় অর্থ নিয়ে যাবেন দেশের কথিত উন্নয়নে!

এই উন্নয়ন ‘ভিকটিম’ তারাই হবেন যাদের হাতে দেশের সত্যিকার উন্নয়ন ঘটছে। কৃষক উৎপাদন করবে, তার কন্যা গার্মেন্টসে কাজ করে পোশাক রপ্তানী বাড়াবে, কৃষক পুত্র মধ্যপ্রাচ্যে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পুষ্ট করবে। এই প্রান্তিক পরিবারগুলি অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে ব্যাংকে অর্থ আমানত করলে তাকে আবাগারী দিতে হবে অর্থমন্ত্রীর শ্রেষ্ঠতম উচ্চাভিলাষের বলি হয়ে!

অচিরেই এই আবাগারী কর আমানতকারীদের জন্য হয়ে উঠবে ‘নিপীড়ন কর’। পৃথিবীর কোন দেশে এরকম করের কথা শোনা যায়নি। এই দেশের জনগন ব্যবহার করেন সেভিংস একাউন্ট। এখানে সঞ্চয় ছাড়া তার বেতনসহ নানা লেন-দেনের টাকা জমা ও উত্তোলন হয়। তাহলে বছরের বার লাখ তাকে এই আবাগারী বা পাপ কর দিতে হবে। পলিসি রিসার্চ ইনষ্টিউটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এটিকে অবিহিত করেছেন, “দিনে-দুপুরে ডাকাতি” বলে।

জনগনের পকেট কাটা বা জনচাঁদাবাজি এবং প্রবৃদ্ধির হিসাব মিলিয়ে দিতে ‘অবাস্তব তথ্য’ ব্যবহার যদি সাফল্য হয়, তো অর্থমন্ত্রী সফল! জনগনের ওপর করারোপে উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়ে বাজেট প্রণয়নে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে পিঠ চাপড়াচ্ছেন! তাহলে কী ব্যাংক সেক্টরে ঋণের নামে লুটপাট, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি, হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপী ঋণসহ পাচারকৃত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি কি সরকার এভাবে পুষিয়ে নিতে চায়?

ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতে লুটতরাজ এবং খেলাপী ঋণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাতকে অকার্যকর করে দিলেও অর্থমন্ত্রী মোটেও চিন্তিত নন। এমনকি অর্থপাচার নিয়েও তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নন। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের যেসব কাহিনী শুনি তা সঠিক নয়। এইগুলি রঙ-চঙ দিয়ে বলা হয়। তবে অর্থপাচার যে একেবারে হয় না, তা নয়। যে ধরনের অর্থপাচারের কথা বলা হয়, বাস্তবে ততটা হয় না। অর্থপ্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চুরি অহরহ হবে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে’।

ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা ছাড়াই এবং অর্থপাচারকারীদের চিহ্নিত না করে বাজেটে নতুন করে ২ হাজার কোটি টাকা সরকারী ব্যাংকগুলিকে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে, এই অর্থের জোগান দিতে ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকার ওপর কর বসানো হয়েছে?  নাকি আরো খেলাপী ঋণকারীর সংখ্যা বাড়িয়ে তোলার জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর অর্থমন্ত্রীকে দিতে হবে। কারণ ক্রমাগত ধ্বস নামা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগনের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়।

এমনিতেই সাধারন গ্রাহকদের ওপর ব্যাংকগুলোর জুলুম চলছে। নানা অজুহাতে টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। লেজার ফি, কার্ড ফি, চেক বইয়ের ফি সহ নানা ছুতোয় ব্যাংকগুলি ফি-বছর গ্রাহকদের টাকা কেটে নিচ্ছে। অথচ পৃথিবীর কোন দেশে এগুলোর জন্য আলাদা মাশুল দিতে হয় না। কারণ ব্যাংকগুলি গ্রাহকের আমানত বিনিয়োগ করে লাভবান হন। এজন্য নানাধরণের প্রণোদনার মাধ্যমে তারা জনগনকে আকৃষ্ট করে থাকে।

সেজন্যই প্রশ্ন উঠতেই থাকবে এই বাজেটের কেন্দ্রে কারা, উপকারভোগী কারা হবে? এটি কি শুধুই স্বপ্নযাত্রা না এর কোন দিকদর্শন আছে? উত্তর অর্থমন্ত্রীই ভাল দিতে পারবেন। কারণ প্রতিবার বাজেট ঘাটতি এবং এডিপি’র বাস্তবায়ন প্রমান করে যে, বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সরকারের নেই। না থাকলেও এই বাজেট প্রণয়নের সুবিধাভোগী যে জনগন নয়, বিশেষ একটি শ্রেনী, সেটি অনুধাবন করতে পন্ডিত হওয়ার দরকার হয় না।

সরকার বড় ব্যবসায়ী ও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় সব ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করেছে। এই নীতি প্রমান করে, বড় ধনী এবং বৃহৎ শিল্প উন্নয়নে সরকার যতটা আগ্রহী, মধ্য ও নিম্নবিত্তদের ক্ষেত্রে সরকারের বিবেচনা ততটাই কম। এটি একটি অনির্বাচিত সরকারের নীতি হতে পারে! তাহলে কি সেই অভিযোগই বর্তমান সরকার প্রমান করতে চায় যে, তারা আসলে জনগনের ভোটে নির্বাচিত নয় এবং জনস্বার্থ থোড়াই পরোয়া করে।

বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে মজার কথাটি বলেছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তার মতে, রমজান এলে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের জন্য জিনিষপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। কি অদ্ভুত কথা! সরকারে কারা আছে? দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনের দায় তো সরকারের।