Home » অর্থনীতি » সরকারের উদ্ভাবনী শক্তি এবং জনগণের সীমাহীন ভীতি

সরকারের উদ্ভাবনী শক্তি এবং জনগণের সীমাহীন ভীতি

আমীর খসরু ::

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকগণ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন এখন থেকে বহু শত বছর আগে থেকেই। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, টমাস হবস, শার্ল লুই মঁতেস্ক্য, জ্যঁ জাঁ রুশো পর্যন্ত যারা রাষ্ট্রের প্রণালীবদ্ধ মতবাদ বিকশিত করেছেন তাদের ভাষ্য- রাষ্ট্র মানবমুক্তির সম্ভাব্য গ্যারান্টি। রুশো প্রথমবারের মতো ‘সামাজিক চুক্তির’ কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। আর এর অর্থ হচ্ছে- রাষ্ট্রের কাছে জনগণ তার অধিকার সমর্পণ করবে এবং রাষ্ট্র ব্যক্তির সমস্ত অধিকার রক্ষা ও জীবন যাপনের নিশ্চিতি বিধানে সচেষ্ট হবে। এর ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের বৈধতার আইনী অস্তিত্ব বিরাজমান। রাষ্ট্র জনকল্যাণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে- এটাই হচ্ছে তাদের কথা। আর এখানেই রাষ্ট্রের পক্ষে এর ম্যানেজার অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আদায়, আয়-ব্যয়সহ সব ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য থাকা উচিত, জনকল্যাণ এবং জনগণের উন্নয়ন। আর এ কারণেই সরকারের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নটি বড় করে আসে। এর ব্যতয় যদি হয় তবে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের সকল কার্যক্রমই আইনের ব্যতয় হিসেবেই আবির্ভূত হয়ে পড়ে।

কিন্তু বাংলাদেশে এমন জিজ্ঞাসা এবং ঔৎসুক্য থাকায় বারণ আছে। এটাও ঠিক যে, পৃথিবীর কোনো দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পুরোপুরি অর্থাৎ শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের গ্যারান্টি দিতে পারেনি। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা বা রিপ্রেজেনটেটিভ গভর্নমেন্ট- এর প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ড মিল থেকে শুরু করে অনেক রাজনীতি বিজ্ঞানীই এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। কিন্তু যতো বেশি সম্ভব গণতন্ত্র নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যতো বেশি গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকবে, উন্নয়ন ততো বেশি জনকল্যাণমুখী হবে। বর্তমান জামানার প্রখ্যাত দার্শনিক, লেখক সামির আমীন তার সম্পাদিত ফরাসি ভাষায় লিখিত একটি বইয়ে (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন-প্রতিরোধের বিশ্বময়তা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা, ২০০৪) বলেছেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে গণ-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন।

কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি নেই- সে বিষয়টি আদৌ বিবেচনায় নেয়া হয় না; বরং এর উল্টোটাই ঘটে থাকে সব সময়। আর উল্টো কথা শুনতে শুনতে এখন জনগণ আগাম বুঝে গেছে ক্ষমতাসীনরা কি বলতে চাইবে, চায়, বা চাচ্ছে।

এখন দেশের উপরিতলার মানুষদের জন্য ব্যাপক আলোচনার বিষয়- ‘‘বাজেটে কি করিলে কি হইতো’ জাতীয় বিষয়াবলী। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখছে বাজেটকে ভিন্নভাবে। আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়লো কিনা, প্রকৃত আয় কতোটা কমলো ইত্যাকার বিষয়াদিকেই তারা বাজেট হিসেবে মনে করেন। এটা শ্রেষ্ঠতম কিংবা পাপমুক্ত হয়ে পুণ্য লাভের জন্য হয়েছে কিনা সে বিবেচনার সময়টুকুও তাদের নেই।

এতোদিন মধ্যম ও ক্ষুদ্র আয়ের মানুষজন নিরাপত্তার খাতিরেই ব্যাংকে অল্প-স্বল্প অর্থ জমা রেখে নিজ নিজ পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ব্যয় করতেন। এখন সেখানেও সরকারের হানা। যারা অর্থাভাবে শপিং মলে যেতে পারেন না, তারা ছোটোখাটো দোকানে গিয়েও দেখেন ‘ভ্যাটের থাবা’।

এই মুহূর্তে র্যা ব-পুলিশ-আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর চেয়েও ভ্যাটভীতিই মানুষকে বেশি বিচলিত করছে। ঢালাও ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে এর প্রভাব প্রান্তিক মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত ও বিপন্ন করবে। প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা সিপিডি এ কারণেই বলেছে, এই বাজেট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। সিপিডি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণীত বিশাল আকারের এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। হয়তো অর্থমন্ত্রী এসব গবেষণালব্ধ কথাকেও কখন বলে বসবেন- রাবিশ!

তবে ভ্যাট, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা কর্তনসহ নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জন্যই অর্থমন্ত্রী মুহিত বলার হিম্মত ও সাহস রাখেন এই বলে যে, জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি তিনি দিয়েছেন। এটা তার পক্ষেই মানায়। কারণ লোপাট হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকাকে তিনি যেভাবে তুচ্ছজ্ঞান করে বক্তব্য দিয়েছেন- তাতে এমন কথা তিনি এবং তারা ছাড়া কে বা কারা বলতে পারে?

নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনার জন্য অর্থমন্ত্রী মুহিতকেই শুধু বাহবা দিয়ে কোনো লাভ নেই; অধিকাংশ তার প্রাপ্যও নয়। অর্থমন্ত্রীকে যিনি মন্ত্রীসভায় রেখেছেন বাহবা এবং ধন্যবাদটা তারই বেশি প্রাপ্য।

কিন্তু এ কথাটি মনে রাখতে হবে, ভ্যাট বৃদ্ধি ও এর উপরে নির্ভরতা তখনই মানায়, যখন  মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তারা সক্ষম হন অর্থনৈতিকভাবে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন সারা জীবনই এই সক্ষমতার তত্ত্বের কথা বলেছেন। অবশ্য এসব তত্ত্ব জানলে বা শুনলে তো আর শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি অর্থমন্ত্রী মুহিত এবং তার সরকারের পক্ষে দেয়া সম্ভব হতো না।

তবে আমজনতার একটিই কথা হচ্ছে-এটাই কি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের চুক্তি? এ কথাটি মনে রাখতেই হবে, জনমানুষ যখন ওই চুক্তির উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে (অবশ্য ইতোমধ্যে ফেলেছে) তখন আমাদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিই জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। আর সেটাই বিশাল এক দুর্ভাবনার বিষয়।