Home » বিশেষ নিবন্ধ » ক্রিকেট যখন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক
during the 2015 ICC Cricket World Cup match between Bangladesh and Afghanistan at Manuka Oval on February 18, 2015 in Canberra, Australia.

ক্রিকেট যখন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক

আসিফ হাসান ::

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল আমার দাদা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমার বাবা, আর এখন ভারতের বিরুদ্ধে লড়ছি আমি- আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগে সামাজিক মাধ্যমে এমন ধরনের একটি মন্তব্য ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের প্রসঙ্গ আসার কারণ, ওই দুই দল সেমিফাইনালে খেলেছে। ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে পাকিস্তানের মুখোমুখি হতে হবে- এমন আশাবাদকে সামনে রেখে ওই বক্তব্যটি ব্যাপক সাড়া ফেলে।

ভারতের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগে দিয়ে আরো কিছু ফটোশপ কারুকাজ, ভিডিও আপলোড হয়। সবগুলোতেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হুঙ্কারে ভারতের নাজেহাল অবস্থা ফুটে ওঠে। বহু ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হচ্ছে; তারপরেও ফেসবুক-পাগল তরুণ প্রজন্ম খেলা শুরু করে দিয়েছে। এই লড়াইয়ে তারা হারতে নারাজ। ভারত যত বড় প্রতিপক্ষই হোক না কেন, বাংলাদেশই জয়ী হবেই- এটাই তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ-শ্লোগান।

ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটির ফলাফল যা-ই হোক না কেন, বর্তমান ক্রিকেট বাংলাদেশে নতুন মাত্রার সৃষ্টি করেছে। এটা আর শুধু খেলা নয়। আমাদের জাতিসত্তার একটি পরিচিতিফলকে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ হলে সেটা নতুন মাত্রার সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার আগে এখানকার মানুষ কাকে সমর্থন করতো? পাকিস্তান বা ভারতকে। যারা ‘পাকু’ বা ‘ভাকু’ গালি শুনতে রাজি ছিলেন না, তারা শ্রীলঙ্কাকে সমর্থন করতেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের সাথে সাথে বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত শক্তিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। একসময় ব্রাজিলের মানুষ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যেমন গণতান্ত্রিক ও উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ে সামিল হয়েছিল, ফুটবলই তাদের দৈনন্দিন যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ দেখাতো, ক্রিকেট সম্ভবত তার চেয়ে আরো বড় করে বাংলাদেশের মুক্তির দিশা দিতে এগিয়ে এসেছে। এ দেশের মানুষ স্মরণাতীত কাল থেকেই জাতীয়তাবাদের স্বপক্ষে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারনবাদ, উপনিবেশিকতার  বিরোধী। সেটাই এখন ফুটে ওঠেছে ক্রিকেটের মাধ্যমে। ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে তরুনদের মাঝে জাতীয়তাবাদের ভিত শক্ত-পোক্ত, কোন দলীয় পক্ষ নয়- সবাই এখানে এক পক্ষ। আমরা অন্য কারো নই, আমরা বাংলাদেশী। আমরা এগিয়ে যাবোই।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ শক্তি হলো ভারত। একসময় খুব সহজেই বাংলাদেশকে হারাত ভারত। ছবিটা বদলে যায় ২০০৭ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সেবার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ‘টিম ইন্ডিয়া’কে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল, বাংলাদেশের কাছে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল সৌরভ-শচিনদের। তারপর ২০১১ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে হেরে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১৫-র বিশ্বকাপে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কোয়ার্টার ফাইনালে ফের মুখোমুখি হয় ভারত-বাংলাদেশ। ম্যাচের আগেই জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখানো হয় ‘জিতেগা ভাই জিতেগা, ইন্ডিয়া জিতেগা’। এ হেন বিজ্ঞাপন মেনে নিতে পারেননি তদানীন্তন বাংলাদেশের আইসিসি প্রেসিডেন্ট মুস্তাফা কামাল। তিনি নিজে আইসিসি-র সিইও ডেভিড রিচার্ডসনকে ডেকে এই বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে বলেন। তার পরও তা বন্ধ হয়নি। মাঠের ভিতরেও ছড়ায় উত্তাপ। রুবেল হোসেনের বলে ক্যাচ তুলেও আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বেঁচে যান রোহিত শর্মা। রিপ্লেতে দেখা যায়, বলটি কোমরের নিচেই ছিল। বাউন্ডারি লাইনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মাহমুদুল্লার ক্যাচ নিয়েছিলেন শিখর ধাওয়ান। তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। ওই সময় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ছিলেন এন শ্রীনিবাসন। তার একগুঁয়েমি, বড়-র মানসিকতা বাংলাদেশে বিরূপ চেতনাকে প্রবল করে তোলে। আইসিসি প্রেসিডেন্ট  এবং মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) পর্যন্ত শ্রীনিবাসনের হীন লালসার বিরোধিতা করেন প্রকাশ্যে।

বিশ্বকাপের পরই বাংলাদেশ সফরে যায় ভারত। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল হেরে বসে ১-২-এ। প্রথম দু’টি ম্যাচ ‘কাটার মাস্টার’ মোস্তাফিজের সৌজন্যে জিতে নেয় বাংলাদেশ। এই সিরিজে মোস্তাফিজকে ধাক্কা মেরে ব্যাপক সমালোচিত হন ধোনি। ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুতেও ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচটি উত্তাপ ছড়িয়েছিল। জেতা ম্যাচ মুশফিকুর রহিমরা ছুড়ে দিয়ে চলে আসেন। ১ রানে ম্যাচ জেতে ভারত। এখানে জয় বা পরাজয় বড় কথা নয়। আমরা লড়াই করবো- এটাই শেষ কথা।

এখন আবার ভারতের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। আর সেটাকে কেন্দ্র করেই ছড়াচ্ছে নতুন উত্তাপ। এই উত্তাপ মনে হয় কখনো কমবে না।