Home » প্রচ্ছদ কথা » জনগন এখন শুধুই সংখ্যা

জনগন এখন শুধুই সংখ্যা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. একেকটি ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। তখনই শুধু আমাদের গণমাধ্যম হৈ চৈ শুরু করে। রিপোর্ট, সরেজমিন, ষ্টোরি-কোনকিছুই বাদ রাখে না। দিক-বিদিক লম্ফ-ঝম্ফ শুরু হয় সরকারের লোকজনের। তারপর আবার যা তাই। সুন-শান, গভীর নিস্তব্ধতায় সব বিষয় চাপা পড়ে যায়। সরকার-প্রশাসন ওই পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তদন্ত কমিটি করে। তদন্ত রিপোর্ট হয় বটে, কেউ জানতে পারে না, কোন সুপারিশ বাস্তবায়নও হয় না। আবার ঘটনা ঘটলে তবেই বিষয়গুলি আলোচনায় আসে।

পাহাড়ে এখন লাশের মিছিল। ক্ষমতাবানরা নিয়মিত পাহাড় কেটে পাহাড়ী জেলাগুলিকে মৃত্যু উপত্যকায় পরিনত করেছে। ঘূর্নিঝড় ‘মোরা’র পর থেকেই আশঙ্কা ছিল আগাম বৃষ্টির- অতি বৃষ্টির। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। প্রবল বৃষ্টিতে ধ্বসে পড়া পাহাড়ের নিচে এখন শুধু লাশের সারি। এসব বিষয়ে প্রায় নিশ্চুপ গণমাধ্যমগুলো ঘটনা ঘটে যাবার পরে সরব হয়েছে। খবর দিচ্ছে লাশের সংখ্যার। আর দৌড়াচ্ছে মাইক নিয়ে এর-ওর কাছে, খবর সংগ্রহের ধান্ধায়! আর কত লাশের খবর!

গণমাধ্যম এবং কথিত সুশীল সমাজ-এখন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গণমাধ্যম কতটা সত্যানুসন্ধানী, সে নিয়ে অনেক প্রশ্ন তৈরী হয়ে আছে। কথিত সুশীল সমাজ যেমন দলদাস এবং দলকানা, গণমাধ্যমও সেরকম। কর্পোরেটসহ নানা পক্ষের স্বার্থের ধারক হয়ে উঠেছে; জনগণের পক্ষে আসলেই আছে কতোটা?। এর ফলে সরকার, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমগুলি প্যারালাল ভূমিকায় চলে আসছে অভিন্ন স্বার্থরক্ষায়।

২০০৭ সালে পাহাড় ধ্বসের পরে গঠিত তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছিল, সুপারিশ করেছিল সেগুলি কেন সরকার বাস্তবায়ন করছে না- এ বিষয়ে গত বছরগুলিতে গণমাধ্যমগুলি একটিও কার্যকর রিপোর্ট করেছে কিনা জানা নেই। অথচ গণমাধ্যমগুলি লাগতার চাপের মধ্যে রাখলে সরকার বাধ্য হতো সুপারিশ বাস্তবায়নে। সবাই যেন ভুলেই গিয়েছিল, ফি-বছর পাহাড় ধ্বসের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আর ধ্বস নামলেই মরবে মানুষ, যারা সরকারের ভাষায় ‘ইল্লিগ্যাল’!

কেন ২০০৭ সালের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি-এর অদ্ভুত উত্তর দিয়েছেন বণ ও পরিবেশমন্ত্রী। তার মতে, যারা সুপারিশ করেছিলেন, তারা মূল্যায়ন করেননি যে কোন কোন সুপারিশ বাস্তবায়ন সরকারের পক্ষে সম্ভব। মানলাম মন্ত্রীর কথা । কিন্তু পাহাড় কাটা বন্ধ হয় না কেন? প্রশাসনের গতানুগতিক উত্তর, প্রভাবশালীদের কারণে তারা বন্ধ করতে পারে না। তাহলে তো কথাই নেই। পাহাড়ও কাটা বন্ধ হবে না- ‘ইল্লিগ্যাল’ নামধারী মানুষগুলোর লাশের মিছিলও বন্ধ হবে না।

দুই. জনগনের নাভিশ্বাস উঠতে খুব সময় বাকি নেই। শাসকরা সবশেষ মরণকামড় বসিয়েছে। এখন আর কোন কিছুই আড়াল নেই। অর্থমন্ত্রীর নয়া ভ্যাট আইন এবং পাপ কর (আবাগরী শুল্ক) জনগনকে একেবারেই কোনঠাসা করে ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে! চালের দাম ইতিমধ্যে হু হু করে বাড়ছে। ছুতো দেয়া হচ্ছে হাওড়াঞ্চলে বন্যার কারণে ফসলহানির। আর রোজার আগেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। ফলে নিশ্চিত হচ্ছে পনের কোটির নাভিশ্বাস!

এই সরকারের বাজারের ওপর কোন নিয়ন্ত্রন নেই। নাকি নিয়ন্ত্রণের কোন ইচ্ছে আছে? বাজার মনিটরিংয়ের নামে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নামে জনগনের সাথে রসিকতা করে। আর ‘ব্যবসা-বান্ধব’ দাবি করে বাজারের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাবানদের সিন্ডিকেটের ওপর ছেড়ে দেয় জনগণের টাকা লুটে নিতে!

মোটা চালের কেজি ৪৫-৪৮ টাকা। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের হিসেব মতে, গত এক বছরে মোটা চালের দর বেড়েছে ৪২ শতাংশ। বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেয়ার পরিণতি! ১০ টাকা কেজি দরে চাল, প্রতি পরিবারের একজনের চাকুরি – এরকম রূপকথাসুলভ প্রতিশ্রুতি দেয়ার শিকার একেবারেই সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষগুলি!

সরকারী গুদামে মওজুদ কমেছে চাল সংগ্রহ অভিযান একেবারেই ব্যর্থ। চালের বাজারের নিয়ন্ত্রক ব্যবসায়ীরা বুঝে গেছেন, বাজারে হস্তক্ষেপ করার মত মওজুদ সরকারের কাছে নেই। ফলে তারা অবলীলায় দাম বাড়িয়ে যাচ্ছেন। চাল ব্যবসায়ীদের মওজুদ সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী অন্ধকারে। কোন পর্যায়ে ধারণা নেই, চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে মওজুদের পরিমান কত? সুতরাং কৃত্রিম সংকট তৈরীর সহজ কাজটি করে দাম বাড়াচ্ছে প্রতিদিন।

বিশ্ব বাজারে চালের দাম বাড়ছে ঠিক; বিশেষ করে বাংলাদেশ যে সব দেশ থেকে আমদানী করে। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিলে আমদানী ব্যয় বাড়তো না-এমন বত্তব্য বিশ্লেষকদের। চাল আমদানীর শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও কবে সে চাল বাজারে ঢুকবে সে বিষয়টি অনিশ্চিত। চাল নিয়ে সত্যি সত্যি কি বিপাকে পড়তে যাচ্ছে দেশ? আর কে না জানে, এজন্য দায়ী কারা। কারণ চালের মজুদ নিম্নগামী হওয়ার সাথে সরকার তৎপর হলে আজকের পরিস্থিতি হতো না। এর দায় নিতে হবে না কাউকে!

সিন্ডিকেটগুলির হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রন ছেড়ে দেবার পাশাপাশি খোলা বাজারে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির নামে লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। ১০ টাকা কেজির চাল যাদের প্রাপ্য তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না বলেই নানা অভিযোগ।

তিন. নতুন ভ্যাট আইনকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের ছক কমপ্লিট। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ভয়াল খাঁড়া নেমে আসতে যাচ্ছে জনগনের মাথায়। ভ্যাট থাবায় বাড়ছে বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম। মূল্যস্ফীতির যে চাপ বাড়তে যাচ্ছে তার গোটা দখলটাই তাদের এভাবে সকলকে বলি হতে হচ্ছে উচ্চকাঙ্খার মূল্য হিসেবে।

এবারের বাজেট সাদা চোখে দেখলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোন জবাবদিহিতা না থাকায় কোনই তোয়াক্কা নেই। বেপরোয়া রাজস্ব সংগ্রহের এই বাজেট কতটা বাস্তবায়নযোগ্য সে নিয়ে কোন সংশয়কে পাত্তা দেয়া হচ্ছে না। নিকট অতীতের কোন বাজেটে বরাদ্দ এডিপি’র ষাট শতাংশ অর্জিত হয়নি। এবারে কতগুলি মেগা সাইজের প্রকল্প ফোকাস করা হয়েছে- যা দেখে মনে অনেক ধরনের প্রশ্নই মনের মধ্যে উঠতে পারে।

তবে বলতেই হচ্ছে, এখন জনগনের কোন মূল্যই নেই; এ কারনে তাদের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাংখা, প্রত্যাশাও মূল্যহীন। এখন তারা শুধুই সংখ্যা; নির্বাচনেও তাদের কোন দাম নেই; প্রয়োজনও নেই।