Home » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিশ্ব জ্বালানি নেতৃত্ব যাবে চীনের হাতে

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিশ্ব জ্বালানি নেতৃত্ব যাবে চীনের হাতে

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফরেন পলিসি থেকে ::

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সময় আমরা প্রায়ই এসব বিষয়ের কিছু কিছুকে উত্তেজনাকর হিসেবে অভিহিত করে থাকি। তবে এসবের মধ্যেই পরিবেশগত সুরক্ষা এমন একটি বিষয়- যা নিয়ে এই দুই দেশের সহযোগিতা ঐতিহাসিকভাবে অনেক বেশি আন্তরিকতাপূর্ণ ও ফলপ্রসূ।

এই উর্বর কূটনৈতিক ভিত্তির কারণ একেবারে সহজ। সব দেশ ও জাতি দূষণ কমানোর ব্যাপারে আগ্রহী। কারণ যত দূষণ তত আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য তা ক্ষতিকারক, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিবন্ধকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী। তাছাড়া এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

২০০৮ সালে বেইজিংয়ে মার্কিন দূতাবাসের ছাদে বাতাসের মান পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে পরিবেশগত কূটনীতির একটি শক্তিশালী উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো দিনেই বাইরে কতটুকু নিরাপদ তা মার্কিন কূটনৈতিকদের  অবগত করা। অবশ্য, বাতাসের মানবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত চীনা নাগরিকদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শুদ্ধ বাতাসের দাবি জোরদার করে। আর তাতেই চীনা সরকার বিশুদ্ধ বাতাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সবসময়ই জনস্বাস্থ্য, কল্যাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক সম্পর্কের প্রাপ্যতা বা দুষ্প্রাত্যা প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্ষ্ট’ মন্ত্র বিশুদ্ধ বাতাস, পানি ও ভূমির মৌলিক প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে অন্ধই মনে হচ্ছে। জলবায়ু নেতৃত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থনৈতিক সুযোগ ও কূটনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারে কিংবা চীনের কাছে ছেড়েও দিতে পারে।

উন্নত বিশুদ্ধ জ্বালানির জন্য বায়ু ও সৌর জ্বালানির জন্য কর রেয়াত প্রদানের মতো অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপে প্রমাণিত অর্থনৈতিক কল্যাণের মধ্যে রয়েছে দ্রুত বিকাশমান বিশুদ্ধ-জ্বালানি শিল্পের জাগরণ, মধ্যশ্রেণীর লাখ লাখ চাকরি সৃষ্টি, তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিকাশ। ওবামা প্রশাসন চেয়েছিল গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ১৯৯৪ সালের পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য। এতে করে ১১.৩ মিলিয়ন চাকরি সৃষ্টি হতো বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের এটা পছন্দ হচ্ছে না।

ট্রাম্প প্রশাসন যদি অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পদক্ষেপ প্রশ্নে নেতৃত্ব গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, জলবায়ু বিষয়ক প্যারিস চুক্তিকে সমর্থন না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের মতো দেশের কাছে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক সুবিধা ছেড়ে দিতে হবে। এর ফলে আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, আমাদের আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও সুবিধার অপচয় ঘটবে। চীন সুযোগটি গ্রহণ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে, কয়লাচালিত বিদ্যুৎ প্লান্টগুলো বাতিল করে দেবে। আগামী পাঁচ বছর ধরে চীন বায়ু-জ্বালানি প্রবৃদ্ধিতে বৃহত্তম দেশ হিসেবেই বিরাজ করবে বলে মনে হচ্ছে।

কার্বন নির্গমন হ্রাসের কাজটি কোনো একক দেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কার্বন কোনো একটি দেশে আবদ্ধ থাকছে না। ফলে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজন এতে। দেশগুলোর সাহসী ও বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তই সমাধান দিতে পারে। আর তাতে সবাই সুস্থ থাকতে পারে।

অতীতে এই কাজে যুক্তরাষ্ট্র ছিল নেতৃত্বে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র অনেক শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছিল।

দূষণ কমিয়ে ৪৬ বছরে যুক্তরাষ্ট্র প্রবৃদ্ধি হাসিল করেছিল। জীবনরক্ষাকারী বিধিবিধানে প্রতিটি ডলার ব্যয় করে স্বাস্থ্য সুবিধা পেয়েছিল ৯ ডলার করে। আর তা ছিল অর্থনৈতিক কল্যাণকর। প্রচলিত বায়ু দূষণ কমেছিল ৭০ ভাগ, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৫০ ভাগ। ২০০৮ সাল নাগাদ পরিবেশগত প্রযুক্তি এবং পরিষেবা শিল্প ১.৭ বিলিয়ন চাকরিকে পৃষ্টপোষকতা করেছিল, ৩০০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব সৃষ্টি করেছিল। ওই বছর শিল্প রফতানি পণ্য ও পরিষেবার মূল্য ছিল ৪৪ বিলিয়ন ডলার। প্লাস্টিক ও রাবার পণ্যের মতো খাতে যুক্তরাষ্ট্র ছিল শীর্ষে। ওবামা প্রশাসনের আমলে গাড়ি শিল্পে দ্বিগুণ জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা প্রবর্তন করে মিলিয়ন মিলিয়ন টন কার্বন দূষণ কমাতে পেরেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে শিল্পটি চাঙ্গা হচ্ছিল।

দৃঢ়ভাবে পরিবেশগত নেতৃত্ব প্রদান এবং জলবায়ু নেতৃত্ব খরচের ব্যাপার নয়, বরং এগুলো হলো বিনিয়োগ। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দিয়ে বিশুদ্ধ জ্বালানি বিনিয়োগ এবং অবশিষ্ট বিশ্বকে ভুল ইঙ্গিত দেব। অথচ ঐতিহাসিকভাবেই এসব কাজে নেতৃত্বের জন্য বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আগে যৌথ জলবায়ু চুক্তির প্রতি চীনা সমর্থন নিশ্চিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে গত এপ্রিলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় জলবায়ু নিয়ে একটি কথাও বলা হয়নি। আবার জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূতের নাম পর্যন্ত ঘোষণা করেনি ট্রাম্প প্রশাসন।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র যদি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তবুও বিশ্ব থেমে থাকবে না। তারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথে চলতেই থাকবে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র পড়ে থাকবে স্টেশনে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে চায়, সুবিধা হাসিল করতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই জলবায়ু ব্যবস্থার দিকে যেতেই হবে। এ থেকে কোনোভাবেই সরে যাওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র আগে সেই জাতিই ছিল, এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আবার সেই জাতিই হতে হবে।