Home » অর্থনীতি » উদ্বেগ চালের দাম বৃদ্ধি নিয়েই

উদ্বেগ চালের দাম বৃদ্ধি নিয়েই

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

পাহাড়ে লাশের মিছিলের সাথে খবর একটাই! চালের দাম বাড়ছে। বাড়ছে তো বাড়ছেই। তিনবেলা মোটা ভাত খাওয়া সাড়ে পনের কোটি বাঙালীর মাথায় হাত, কোথায় গিয়ে থামবে চালের দাম? এই দেশের মানদন্ডে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসেবে ‘সুষম খাদ্য’ বলতে যাই থাকুক, এখন মোটা চালের ভাতই চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ার কারণে জনপদের মানুষ ক্রমশ: আতঙ্ক গ্রস্ত হয়ে পড়ছে নিকট ভবিষ্যত ভাবনায়।

সরকারের গুদামে চালের মজুত নেমে এসেছে ২ লাখ টনের নিচে। বেসরকারী মজুত ১০ লাখ টন কম। দুই খাতেই চালের মজুত আশঙ্কাজনক। ২০১৭ সাল শুরু করেছিল ব্যবসায়ীরা ১০ লাখ টন মজুত কম নিয়ে। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, উচুঁমাত্রার শুল্কের কারণে আমদানী করে পোষাচ্ছে না। এদিকে, সব ধরনের চালের দাম মাত্র একমাসে বেড়েছে কম-বেশি ৮ শতাংশ এবং চলতি বছরে বেড়েছে সবশুদ্ধ ৪৮ শতাংশ।

মাত্র ক’দিন আগেও শুনতে শুনতে কানে আসছিল – প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি, দলীয় নেতা-পাতি নেতাসহ সুবিধাভোগীরা ও দলদাসদের- সকলের মুখে উন্নয়ন সাফল্যের উপচানো গল্প। বলা হচ্ছিলো, কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়; বাংলাদেশ বিশ্বের উদাহরন হয়ে উঠেছে। সরকারের সকলে একযোগে কোরাস গেয়েছেন, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বিপুল কৃষি উৎপাদন-এই দেশ চাল রপ্তানীকারক দেশে পরিনত হয়ে গেছে।

সরকারের বিশ্বস্ত অর্থনীতিবিদদের একজন কাজী খলীকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে যা ভুল হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পুর্ণ- এ আত্মতুষ্টিতে ভুগে দেশে চালের ঘাটতি ও মজুতের বিষয়টি ভুলে গেছি”। খলীকুজ্জামানের কথা সত্য হলে দাঁড়াচ্ছে যে, সরকারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ছিল না এবং ঘাটতি ও মজুত সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ছিল। এটি হলে সরকারকে অবশ্যই দায় নিতে হবে এবং শুরু হতে পারে খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে।

খাদ্যমন্ত্রী অবশ্য ফতোয়া দিয়েছিলেন, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে চালের দাম বেড়ে গেছে। তবে এখন তারা  চুপ মেরে গেছেন। তার অসত্য ও আজব তথ্য শুনতে শুনতে জনগন আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝে গেছে। তার কথা সত্য ধরে নিলে, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী হিসেবে সে বা তার সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেন? অথচ দেশের কে না জানে, চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলি ক্ষমতাসীন রাজনীতির সাথে জড়িত। সুতরাং তাদের অনৈতিক মুনাফার দায়ও সরকারের।

একটি অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এদেশে মজুত রাখার বিরুদ্ধে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। ২০১১ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল অব এসেনসিয়াল ফুড কমোডিটি এ্যাক্ট সংশোধন ও হালনাগাদ করে। ঐ আইনের আওতায় পণ্য মজুতের হিসেব পাক্ষিকভাবে দেয়া হয়েছিল প্রথম দুই বছর। ২০১৪ সাল থেকে এই হিসেব আর পাওয়া যায় না। ফলে বেসরকারী পর্যায়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুত গড়ে উঠছে নির্বিঘ্নে এবং মজুতদাররা যখন যেমন খুশি বাড়াচ্ছে চালসহ নানা পণ্যমূল্য।

সরকার এতকাল জানিয়ে এসেছে, ধান-চাল উৎপাদন ও মজুতের পরিমানের দিক থেকে দেশ খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করেছে। এই নিরাপত্তা কতটা ‘ফানুস’ ছিল এবং বাস্তবতা কতটা ভিন্ন, তা এখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে। বছরটি শুরুই হয়েছিল যেখানে ১০ লাখ টন ঘাটতি নিয়ে, সেটি পূরণের বদলে মনে হচ্ছে, সরকার লাফিয়ে লাফিয়ে চালের দাম বৃদ্ধি উপভোগ করছে এবং মন্ত্রী এই বাড়ার পেছনে বিএনপিপন্থীদের কারসাজির ভূত দেখতে পাচ্ছেন!

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার গল্প বলা হলেও খাদ্য ব্যবস্থাপনার দৈন্য এখন ফুটে উঠেছে দগদগে ঘায়ের মত। অন্যদিকে কৃষি বাজারে অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকের ভাগ্যের কোন উন্নয়ন নেই। সরকার কৃষকদের ব্যাংক হিসেব দিয়েছে। ব্যাংক ঋণ নিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ঋণ নিয়ে কৃষক উৎপাদনে গেছেন। কিন্তু ঘরে ফিরেছেন নিঃস্ব হয়ে। কেউ জেলে থাকছেন, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সার্টিফিকেট মামলা মাথায় নিয়ে। এভাবে কথিত খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা কৃষককে কারাবাস বা পলাতক করছে।

অধিকাংশ কৃষক মনে করেন, চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রন চলে যাওয়ায় তারা বিপুল পরিশ্রম করেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এজন্য ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। আটকে যাচ্ছেন আরো নতুন দেনার জালে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সরকার যেখানে ক’দিন আগেও চাল রপ্তানী করার কথা বলেছে, সেখানে এখন বিপুল পরিমান চাল আমদানীর কথা উঠবে কেন? ফি-বছর এই আমদানীর কারণেই কৃষক ফসলের দাম পায়নি, আটকা পড়ে গেছে ঋণ-মামলা জালে।

প্রতি বছরই বিপুল পরিমান চাল আমদানী করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ টন চাল আমদানীর জন্য বাজেটে ৭৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ চাল রপ্তানীর যুগের অবস্থা এটি এবং অর্থবছরের ছয়মাস পেরোতেই বরাদ্দের দ্বিগুনেরও বেশি চাল আমদানী করা হয়। ওই ছয় মাসের আমদানী আগের বছরের মোট ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনেরও বেশি। সে সময়ে সরকার মাত্র ৫০ হাজার টন রপ্তানীর ঘোষণা দিয়ে আমদানী করে ৮ গুন বেশি।

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেখাতে গিয়ে সরকার বিপুল আমদানীর এই হিসেব স্বীকার করেনি। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয় ব্যাপক চাল আমদানী। পরিমান ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার টন। মন্ত্রীরা সে সময়ে বলেছিলেন, এসব চাল গো-খাদ্য হিসেবে আমদানী করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় চালের হিন্দি লেখা মোড়ক ও উৎপাদন তারিখ সরকারের মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তারপরেও তারা দাবি করেছে, সুগন্ধী চাল ও গো-খাদ্যের বাইরে কোন চাল আমদানী করা হয়নি।

ভেতরে ভেতরে এই সরকার কতটা সিন্ডিকেটবান্ধব তার একটি নমুনা হচ্ছে ২০১৪ সালে ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট।  রিপোর্টের বলা হয়, জুলাই ২০১৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানীকৃত চালের পরিমান কম-বেশি ৮৭ হাজার টন। দেশে আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মৌসুমে এই চাল আমদানী করা চলছিল। ফলে কৃষক ফসলের মূল্য নিশ্চিত করতে পারেননি। এভাবেই কথিত কৃষকবান্ধব সরকার চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটকে সবসময় সহায়তা দিয়ে এসেছে এবং বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়েছে।

সরকারী ভাষ্যে উৎপাদন ও উন্নয়ন-দুটোই বাড়ছে। তবে খাতগুলি বিচার করলে দেখা যাবে, উৎপাদকরা আছেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে। আর কথিত উন্নয়ন কতিপয় মানুষের সুবিধা এনে দিয়ে একটি লুটেরা ধনিক শ্রেনী গড়ে তুলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এই কথিত উন্নয়ন বৃত্তের বাইরে। দেশের অর্থনীতির প্রধান তিন ভিত্তি কৃষি, গার্মেন্টস শিল্প ও রেমিট্যান্স। এই তিন খাতের মানুষেরাই সবসময়  মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন, মজুত, রপ্তানী-সবকিছু এখন নগ্ন সত্য হয়ে হাজির হয়েছে। হাওড়ে বন্যায় মৌসুমী বোরো ফসল মার খাওয়া, ধানক্ষেতে ব্লাষ্ট রোগের আক্রমন, অতিবৃষ্টি আর বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজি- দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এক লহমায় ধ্বসিয়ে দিয়েছে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে? ফি-বছর লাগাতার মিথ্যাচারের নিট রেজাল্ট হচ্ছে, মোটা চালের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে মোটা ভাত, ধ্বসে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা !