Home » অর্থনীতি » চালের দাম : পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না

চালের দাম : পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

দেশের নিম্ন আয়েরর মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য ‘মোটা চালে’র দাম এখন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে  ৪৮ থেকে ৫০  টাকায়। শুধু মোটা চালই নয়, সব ধরনের চালের দামই বিগত যে কোন বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। দেশে মোটা চালের দাম বাড়তে বাড়তে কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় উঠেছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে এখন মোটা চালের দাম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এতে প্রায় দুই কোটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে ও পড়ছে  যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, চালের দাম এত বেশি বাড়ল কেন? খাদ্যব্যবস্থা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, দূরদৃষ্টির অভাব, খাদ্য নিয়ে সরকারের উদাসিনতাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখানো; জনগণকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো’র প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির পেছনে যে দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে- তা বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখার পথে প্রতিবন্ধক হয়েছে। যখন চাল আমদানি করার প্রয়োজন ছিল না, তখন চাল আমদানি করা হয়েছে; একসময় দেশের বাজারে চালের দর এতটা কমে গিয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা পরের মৌসুমে চাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। আর এ বছর হাওর-অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ফসলহানি হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সৃষ্টির পরও সরকার আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে। অথচ তখনও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মাথায়  চাল আমদানির চিন্তাটুকুও  ঢুকেনি। বরং প্রথম পর্যায়ে চাল আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করা হয়। পরে ঘটনার ভয়াবহতা ও প্রতিক্রিয়া দেখে, অনেক সমালোচনার পর ওই ১৮ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু তখনই আমদানির চিন্তা করলে আমদানি ব্যয় কম হতো, ওই চালের দামও কম হতো। তাহলে প্রশ্ন ওঠে-এই বিলম্ব কি ইচ্ছাকৃত?

এতা গেলো একটি দিক। তবে যে জটিল বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল- তা হলো, সরকারি গুদামে চালের মওজুদ এখন মাত্র ১ লাখ ৮১ হাজার টন (১৮ জুনের হিসাব)। গত ১০ বছরের মধ্যে এটা সর্বনিম্ন মওজুদ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি গুদামে কমপক্ষে ৬ লাখ টন চাল মওজুদ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মওজুদ এর চেয়ে কমে গেলে চাল ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেবেই, আর চালের দাম বাড়বেই। এবার মূলত সেটাই হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের হয় কোন নিয়ন্থন নেই অথবা এটাও ইচ্ছাকৃত; কিংবা ক্ষমতাবানদের হাতে সাধারন মানুষ জিম্মি।

সরকার এখন অভ্যন্তরীন ধান-চালও সংগ্রহ করতেও পারছে না। কারণ, বাজারে চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা হলেও সরকার-নির্ধারিত ৩৪ টাকা দরে কেউ সরকারকে চাল দেবে না, এটাই স্বাভাবিক। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, বাজারে বর্তমানে কী পরিমাণ চাল আছে, এ সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছেও নেই অথবা তা জনগনের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছেনা। অথচ খাদ্য মওজুদ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী- খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটা নিয়মিত মনিটর করা ও হিসাব রাখা। কারণ, এর পরিণতিতে এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবয়বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় দেশের অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ আসতো কৃষি খাত থেকে। সেখানে বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে কৃষির জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান চলে এসেছে ১৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে। এবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপির যে হিসাব করেছে- তাতে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেখানো হয়েছে। সব চেয়ে বিষ্ময়কর হলো, এতে খাদ্য শস্য খাতে বাড়তি উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে । বাকি ৪০ ভাগ আউশ ও আমন থেকে আসে। আউশের উৎপাদন ৭ শতাংশের মতো কম হয়েছে। আমণের উৎপাদন আগের বছরের একই পর্যায়ে রয়েছে। বোরোর উৎপাদনে এবার দুর্যোগ ও হাওরের বিপত্তির কারণে ৬/৭ লাখ টন কম উৎপাদন হবে বলে বলা হচ্ছে। এ হিসাবে কোনভাবেই খাদ্য উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা নয়। একই কারণে কৃষিতে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাস্তবসম্মত নয়।

চাল নিয়ে রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। চাল আর রাজনীতি খুব বেশি দূরের কিছু নয়। এদেশে সবসময়ই চালের দামকে স্পর্শকাতর ইস্যু মনে করা হয়। ভোটের রাজনীতিতেও চাল গুরুত্বপূর্ণ। ‘১০ টাকা কেজি চাল’ নিয়ে বহু বাতচিত হয়েছে। এমন ওয়াদা করা হয়েছিল, নাকি হয়নি তা নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে। তবে চালের বর্তমান উচ্চমূল্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মানুষেরা। পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না। উচ্চমূল্যে চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারন মানুষ। ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে সংসারের বাজেট। এমনকি পত্রিকায় এও খবর বেরিয়েছে, চালের উচ্চ মূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ৪-৫ সদস্যের ছোট একটি পরিবারে কেবল চালের পেছনেই খরচ বেড়েছে কমপক্ষে পাঁচশ’ টাকা।