Home » বিশেষ নিবন্ধ » হেফাজতের উপর আ’লীগের এতো নির্ভরতা কেনো

হেফাজতের উপর আ’লীগের এতো নির্ভরতা কেনো

হায়দার আকবর খান রনো ::

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ইদানীংকালের গভীর সখ্যতায় আমি খুব একটা বিস্মিত হইনি। কারণ আওয়ামী লীগ কোন আদর্শবাদী দল নয়। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাবার জন্য, রাজনীতির সুবিধার জন্য, ভোটের সময় প্রতারণা করার জন্য তারা যখন যেটা প্রয়োজন মনে করবে, তখন তাই-ই করবে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের শত্রু পক্ষ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করেছে, মন্ত্রীসভা গঠন করেছে। অথচ তারাই আবার জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গর্ব করে, যিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের প্রধান এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম থেকে রেডিও মারফত। আবার জিয়াউর রহমান নিজেই স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বানিয়েছিলেন; দলে টেনে নিয়েছিলেন। মুসলিম লীগ-জামায়াতসহ এ সকল দলকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছিলেন, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে  সরাসরি সা¤্রাজ্যবাদ নির্ভর পুজিবাদী পথে দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেয়ার প্রয়োজনে সংবিধানে বিসমিল্লাহ শব্দ যুক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা জিয়া একেবারে পাল্টে দিলেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে।

পাল্টানোর কাজটি শুরু হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই। সমাজতন্ত্র শব্দটি সংবিধানে রাখা হলেও এটাও ছিল জনগণকে ধোকা দেয়ার কৌশল মাত্র। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই শুরু হয়েছিল বেপরোয়া গনবিরোধী কাজকর্ম। সমাজতন্ত্রের ধারেকাছেও যায়নি সেদিনের সরকার। পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সঙ্গে কিছুটা আপোস করার প্রবণতা তখনই দেখা দিয়েছিল। লাহোরে শেখ মুজিবের ইসলামী  সম্মেলনে যোগদান, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৪ সালে দিল্লী সম্মেলনে পাক যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি তার স্বাক্ষ্য বহন করে। দিল্লী সম্মেলনে আমাদের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাঙ্গালী জানে কিভাবে ক্ষমা করতে হয়।’ এইভাবে যুদ্ধাপরাধী পাকসেনাদের মুক্তি দেয়া হয়েছিল, যদিও কথা ছিল পাকিস্তানের সরকার প্রয়োজনে তাদের বিচার করবে। ওই সম্মেলনে ‘‘ফরগেট এ্যন্ড ফরগিভ’’ কথাটি যৌথ ঘোষণায় লেখা হয়েছিল।

পাকিস্তানের অনুসারীরা আরও ভালোভাবে ফিরে এলো জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে। কিন্তু আওয়ামী লীগও কম যায়নি। ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে একত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আওয়ামী লীগ নিজেই বাতিল করে দিল। আর পরবর্তীতে সেই জামায়াতই হলো বিএনপির মিত্র। আদর্শ বলে কিছু নেই। এই আদর্শহীনতার রাজনীতি দেশকে সর্বনাশের পথে নিয়ে গেছে।

জামায়াতকে নিয়েও আওয়ামী লীগ খেলতে চেয়েছিল; পারেনি। জামায়াত শেষ পর্যন্ত বিএনপির বন্ধু হয়েছিল। অনুরূপভাবে হেফাজতকে নিয়ে খেলতে চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। সেই হেফাজত এখন আওয়ামী লীগের মিত্র। বস্তুত: জামায়াত আর হেফাজতের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ দ্বারা পরিচালিত ধর্মীয় মৌলবাদী দল বা সংস্থা। পক্ষ পরিবর্তন বা পাশার দান পাল্টে যাওয়া রাজনীতির সাধারণ বৈশিষ্টে পরিণত হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াত-প্রধান গোলাম আজমের কাছে গিয়েছিলেন তার সমর্থন ও দোয়া চাইতে। এতে আওয়ামী লীগের কিছু আসে যায়নি। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াত-হেফাজতের মতোই আরেকটি ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী দল খেলাফতে মজলিসের সঙ্গে পাচ দফা চুক্তি করেছিল। চুক্তির ধারাগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনার বিরোধী নারী বিদ্বেষী, ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল। শুধুমাত্র যেনতেনভাবে নির্বাচনে জেতার জন্য অমন দলের সঙ্গে অমন চুক্তি করতে সামান্যতম বাধেনি আওয়ামী লীগের। যখনই সেই নির্বাচন আর হলো না, তখনি আওয়ামী লীগ সেই চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে দিল। কী অদ্ভুত এই আচরণ। এমন আদর্শহীনতার নিদর্শন রাজনীতিতে বিরল।

২০১৩ সালে ৫ মার্চ গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা হিসাবে হেফাজত মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ করেছিল। যে খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকে নাস্তিকদের মঞ্চ বলে গাল দিয়েছিলেন, সেই তিনিই হেফাজতের সমাবেশকে উৎসাহিত করলেন।

হেফাজতে বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লব করবে বলে ধারণা দিয়েছিল। তারা তুলকালাম কান্ড করেছিল। বড় বড় গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করেছিল। সিপিবি অফিস ও বায়তুল মোকাররমের দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করেছিল। সরকারের পতন হতে পারে এই সম্ভাবনায় খালেদা জিয়া সর্বাত্মক সহযোগিতা করলেন। কিন্তু সরকারের পতন হলো না। বরং গভীর রাতের পুলিশি এ্যকশনে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

এরপর পাশার দান পাল্টে গেল। হেফাজত এখন সরকারের মিত্র। গোপন সমঝোতা হয়েছে। হেফাজতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঠপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য লেখকের গল্প, প্রবন্ধ বাতিল হয়ে যায়, হিন্দুয়ায়িত্বের অথবা নাস্তিকতার অভিযোগে। ভাস্কর্যের সৌন্দর্য তারা বোঝেন না। ভাস্কর্য মানেই নাকি মূর্তি পূজা। তাদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে সরকার হাইকোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্য স্থানান্তরিত করে। যে সকল শুভবুদ্ধির মানুষ এর প্রতিবাদ করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাদের সমালোচনা করেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন যেন প্রতিযোগিতা করে মৌলবাদী ভাবাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। বিএনপি ধরেছে জামায়াতকে। আওয়ামী লীগ ধরেছে হেফাজতকে। ক্রমাগত দুটি বড় দলের মধ্যে পার্থক্য যেন আর থাকছে না।

খুব একটা পার্থক্য আগেও ছিল না। অর্থনৈতিক নীতির দিক দিয়ে দুই দল লুটেরা-ধনীক শ্রেণীর স্বার্থের পাহারাদার। দুই দলই পাশ্চত্যের সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল। দুই দল মিলেই বলা যায়, এ যাবতকালের সকল সরকারই ছিল নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা, পুঁজিবাদের স্বার্থের প্রতিনিধি। এই দলকে যদি রাজনীতির ভাষায় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বলা হয়, তবে এটাও বলতে হবে যে, তারা জাতীয় স্বার্থকে কেউই রক্ষা করেনি। তবু তারা নাকি জাতীয়তাবাদী!

উভয় দলের কেউই গণতান্ত্রিক আরচণ করেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনই তো ছিল একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচন। তার পরবর্তীকালে যতোগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোকে নির্বাচন না বলাই সঙ্গত। আগের রাতে সিলমারা, পুলিশ দিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মারা ইত্যাদি ছিল সাধারণ দৃশ্য। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ নির্বাচন বলে আর কিছু নেই। তার উপর গুপ্ত ও প্রকাশ্য হত্যা, গুম ইত্যাদি স্বৈরতান্ত্রিক ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তিনিও গণতান্ত্রিক আচরণ করেননি। ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে নিরীহ মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল পুলিশের ক্যাম্প বা থানায়। সবচেয়ে খারাপ কাজ যেটা খালেদা জিয়া করেছিলেন তাহলো ক্লিনহার্ট অপারেশনের সময় যারা মানুষ হত্যা করেছিল বা নির্যাতন করেছিল, তাদেরকে তিনি পার্লামেন্টে আইন করে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই আজ যখন খালেদা জিয়া বা বিএনপি গণতন্ত্রের কথা বলে, তখন তা বড় বেমানান ঠেকে।

আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, এহেন দুইটি দলই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যাদের কোন আদর্শ নেই, যারা পুজিবাদের ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক, হাড়ে হাড়ে দুর্নীতিবাজ, গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী। এবং এখন তারা দুজনেই মৌলবাদের সঙ্গে আপোষ করে দেশকে পেছনের দিকে দিয়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি জঙ্গী মৌলবাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যারা মানুষ খুন করছে। এই সন্ত্রাসী মৌলবাদ বিপজ্জনক। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একে মোকাবেলা করা ও দমন করা এক দিক দিয়ে সহজ। কিন্তু ভাবাদর্শগতভাবে যে মৌলবাদের বিস্তার ঘটেছে, তা অধিকতর বিপজ্জনক। আর এই ভাবাদর্শের ক্ষেত্রেই দুটি বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে শাসক দল যেভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, তার পরিণাম বড় ভয়াবহ। ’৭১ সালে যে বিজয় আমরা অর্জন করেছিলাম, যে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ছিলাম, সবই এখন হারিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে।

কিন্তু তা হতে দেয়া যাবে না। এই দুই বড় দলের বাইরে বিকল্প তৈরি করতে হবে। বাম ও উদার গণতন্ত্রীদের সমন্বয়ে তেমন বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবতে হবে। জামায়াত-হেফাজত প্রমুখ মৌলবাদী দলের ভাবাদর্শকে মতাদর্শগতভাবে রাজনৈতিকভাবে সাংস্কৃতিকভাবে ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে পরাজিত করতে হবে। এবং সেটা সম্ভব। কারণ বাংলার লোক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কখনই মৌলবাদের অনুকূলে ছিল না।

কিন্তু সচেতন সংগঠিত মানুষ তাকে পুনরায় পাল্টাতে পারে। সে বিশ্বাস ও আস্থা আমার আছে।