Home » আন্তর্জাতিক » আরেক জুনের স্মৃতি

আরেক জুনের স্মৃতি

ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। আর কর্তৃত্ববাদী শাসন তখনই সম্ভব যখন সরকার প্রধান হিসেবে থাকেন  বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী……

ফ্যালি এস. নরিম্যান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

আমার কাছে জুন হলো স্মৃতির মাস : ২৬ জুন ‘জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবস’- আমি এই নামেই একে অভিহিত করে থাকি, আগে দিয়ে ঘটা একটার পর একটা ঘটনা মনে পড়ে। ওই জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবসের কিছু স্মৃতি প্রকাশ করার সময় এখনই। মনে পড়ে ১৯৭৫ সালের ১২ জুন দিনটির কথা। ওই দিনই ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে রাজ নারায়নের দায়ের করা নির্বাচনী মামলার রায় প্রকাশ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। এতে অসাধুতা অবলম্বনের দায়ে ইন্দিরা গান্ধীকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় বছরের জন্য সব ধরনের সরকারি পদ গ্রহণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। কয়েক দিন পর ইন্দিরার আইনজীবী জে বি দাদাচানজি আমাকে বলেছিলেন, ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদনের যুক্তি এবং স্থগিতাদেশ আবেদন (সুপ্রিম কোর্টে দাখিলের জন্য) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী তাকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। ওইসব নথিপত্র তৈরি করেছিলেন ইন্দিরার নিজস্ব সিনিয়র অ্যাডভোকেট ননি পালকিবালা। তারপরও অনুরোধ করায় তিনি বেশ পুলকিত হয়েছিলেন বলে জানান আমাকে। তিনি কাগজপত্র পুরোপুরি পরীক্ষা করে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় এবং আমি আইনমন্ত্রী এইচ আর গোখলের (স্থগিত আবেদনের ওপর শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন) অফিসে ছিলাম। সিদ্ধার্থ ফোন তুলে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলেন, কেবল তিনিই এ কাজটি করতে পারতেন। বললেন : ‘আমার কথাটা শুনুন।’ তিনি আবার বললেন, ‘না, ম্যাডাম, আমার কথাটা শুনুন।’ ‘ইন্দিরাজি আমার কথাটা শুনুন।’ একটু ‘শুনুন’- ‘এই আবেদনটি এখনই দাখিল করতে হবে।’ আমি ফোনের অপর প্রান্তে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেলাম। ওই সময় ইন্দিরার আশপাশে ভিড় করে থাকা জ্যোতিষীরা আরেকটু শুভ সময়ে আবেদনটি দাখিল করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন! জ্যোতিষীদের পরামর্শে ভক্তি রেখে ১৯৭৫ সালের ২২ জুন আবেদনটি দেরিতে দাখিল করা হলো, অবকাশকালীন বিচারকের বেঞ্চে (বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ার) স্থগিত আবেদনটি তালিকাভুক্ত করা হলো। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত পছন্দের আইনজীবী পালকিবালা আবেদনের ওপর শুনানিতে অংশ নিলেন। তিনি ভালোভাবেই কাজটি করলেন, স্থগিতাদেশ প্রাপ্য ছিলেন।

পরদিন সন্ধ্যায় আমার স্ত্রী ও আমি ট্রেনযোগে মুম্বাই ছাড়ার সময় আমি ইভিনিং নিউজের একটি খবর পড়লাম। ভেতরের পৃষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ খবরটি প্রকাশ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবকে বদলি করা হয়েছে। তার জায়গায় রাজস্থান থেকে এস এল খুরানাকে আনা হয়েছে। এই সময় কেনো এই বদলি করা হলো? তখন আমি বিষয়টির দিকে আর কোনো মনোযোগ দেইনি।

ওই সময় স্বরাষ্ট্রসচিব পদে হঠাৎ বদলি আমার কাছে তেমন কোনো ইঙ্গিতবহ বলে মনে হয়নি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, এটা ছিল সতর্কতামূলক প্রস্তুতি। কেবল সঞ্জয় গান্ধী এবং প্রধানমন্ত্রীর দুই-একজন ঘনিষ্ঠজন ছাড়া এই প্রস্তুতি-পর্ব সম্পর্কে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না। যদি সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ খারিজ করে দেন, তবে এই বদলির আলোকে কাজ করা হবে বলে স্থির করা হয়েছিল। কৃষ্ণ আয়ারের নির্দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হলো ২৪ জুন। আমি তখন মুম্বাই। এটা ছিল শর্তসাপেক্ষ স্থগিতাদেশ। ‘অপারেশন ইমার্জেন্সি’ সাথেসাথে চালু হলো। তবে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বশীল রাষ্ট্রপতির সম্মতিহীনভাবে নয়।

ফখরুদ্দিন আলী আহমদের নেতৃত্বে আরো তিন প্রখ্যাত আইনজীবী এইচ আর গোখলে, এস এস রায় ও রজনী প্যাটেল (তারা সবাই কংগ্রেসের সদস্য) ঘোষণায় সই আনার জন্য ২৫ জুনের মধ্যরাতে গেলেন।

এমনকি ২৬ জুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা অনুমোদনের আগেই এর আগের রাতেই জরুরি আইনের ঘোষণায় সই হয়ে গেছে এবং কার্যকরও হয়ে গেছে। ওই সময়ের মিসেস গান্ধীর মন্ত্রিসভার অন্যতম যোগ্য সদস্যের মন্তব্য আমার মনে পড়ছে। সকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মিসেস গান্ধী তাকে জরুরি আইন জারি নিয়ে তার মতামত জানতে চাইলেন। বেশ কায়দা করে বাবুজি জবাবটা দিলেন, ‘ম্যাডাম, আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন, তখন আমি আর কি বলবো?’

আমি ২৭ জুন বোম্বাই থেকে ডাকযোগে দিল্লিতে আইনমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠালাম। এতে বীরোচিত কিছু ছিল না।

এ ধরনের ঘটনা আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আপনারা যারা জরুরি আইনের অভিজ্ঞতা লাভ করেননি, বা এ নিয়ে খুব একটা পড়াশোনা করেননি, তাদের জেনে রাখা উচিত, ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। ১৯৭৫ সালের জুনে ভারতে জরুরি আইন জারির সময় দেশটিতে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার, সরকার প্রধান হিসেবে ছিলেন বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো সাংবিধানিক দায়িত্বশীলেরা এবং এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক পর্যন্ত আমাদের হতাশ করেছেন।

২৫ জুন রাতে পার্লামেন্টের বিরোধী দলের সব এমপিকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক করা হলো, অবশ্য পার্লামেন্টের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলো। লোকসভার স্পিকার পর্যন্ত এর প্রশংসা করে প্রকাশ্যে বললেন, এতে করে পার্লামেন্টের কাজকাম ‘আরো সাবলীলভাবে’ করা সম্ভব হবে। আর আদালত রায় দিল, তাদের উচিত পার্লামেন্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা, কিন্তু আটক থাকার কারণে যেতে পারেননি। কিন্তু তার পরও পার্লামেন্টের এ ধরনের কার্যক্রম বৈধ।

সর্বোচ্চ আদালতের এটা প্রথম লজ্জাজনক রায়। তবে এরপর তারা আরো লজ্জাষ্কর রায় দিয়েছিল (১৯৭৬ সালের এপ্রিলে এডিএম জাবালপুরে)। ওই রায়ে আদালতের সবচেয়ে সিনিয়র পাঁচ বিচারপতির চারজনই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধানে প্রদত্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার বিধানটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। সাহস করে একমাত্র ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি এইচ আর খান্না। ভারতের প্রধান বিচারপতি হওয়ার জন্য পরম্পরায় তিনি তিন নম্বর স্থানে ছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, সিনিয়রিটির আলোকেই প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়ে থাকেন। তারপরও তিনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা লঙ্ঘনকে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৭৫ সালের জুনে জরুরি অবস্থা জারির পর মিসেস গান্ধী ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। তাতে তিনি পরাজিত হন। ওই সময় বেশির ভাগ মানুষেরই চিন্তায় ছিল, তিনি কি সেনাবাহিনী তলব করবেন? তার তত অবনতি ঘটেনি। তিনি কাজটি করেননি। তিনি কি জনগণের রায় মেনে নেবেন? কয়েকজন আইনজীবী-রাজনীতিবিদের পরামর্শ সত্বেও তিনি মেনে নিয়েছিলেন।  আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ঘটনার ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহানের মন্তব্যও স্মরণ করি। তিনি বলেছিলেন, সত্যিকারের গণতন্ত্রের চূড়ান্ত নিদর্শন হলো, নির্বাচনে পরাজয় বরণকারী সরকারের স্বেচ্ছায় তার বিরোধীদের কাছে ক্ষমতা সমর্পণ করার আগ্রহ।

(লেখক : ভারতের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট)