Home » প্রচ্ছদ কথা » গুম : যার উত্তর মিলছে না

গুম : যার উত্তর মিলছে না

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ফরহাদ মজহার অপহরন ঘটনার আপাত: পরিসমাপ্তি ঘটেছে অনেক প্রশ্ন, অনেক নাটকীয়তা নিয়েই। তিনি কিডন্যাপ করার বর্ণনা পুলিশের কাছে দিয়েছেন, আদালতেও জবানবন্দী দিয়েছেন। পুলিশ বলেছে, তদন্ত করে দেখবেন, জবানবন্দীর সত্যতা। বিএনপি সরকারকেই দায়ী করছে এই অপহরণের জন্য এবং তাদের ভাষায় চাপ সহ্য করতে না পেরে সরকার তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তারা আরও বলেছেন, ভারতে মুসলিম নিধন এবং গো-মাংস নিষিদ্ধের প্রতিবাদ করায় মূলত: ফরহাদ মজহারকে এই পরিনতি বরণ করতে হয়েছে।

গত সাড়ে তিন বছরে ফরহাদ মজাহারের মত ‘রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ’ বা অপহৃতদের মধ্যে পরিবারে ফিরতে পেরেছেন মাত্র ২৭ জন। ফিরে আসার এসব ঘটনায় প্রতিটিতে কম-বেশি সমিল লক্ষ্য করা যায়, যেমনটি ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ভাষ্য থাকে একই রকম। ঘটনাগুলি মোটামুটি ছক বাঁধা। একটি বড় অংশকে অপহরণের পর ‘উদভ্রান্ত’ বা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ অবস্থায় দেশ-বিদেশের কোন সড়কে পাওয়া যায়। ফিরে আসার পরে তারা প্রায়শ: ‘রহস্যজনক স্মৃতিভ্রষ্টতার’ শিকার হন।

২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তথাকথিত নিখোঁজ এবং অপহরণ ও গুমের শিকার হয়েছেন ২৮৪ জন। তাদের মধ্যে ৪৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৩৬ জনকে এবং পরিবারে ফেরত এসেছেন ২৭ জন। বাকি ১৭৭  হতভাগ্যের কি ঘটেছে জানা যায়নি। আজতক তাদের হদিস মেলেনি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশকেন্দ্রের ওয়েবসাইট থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর কোন ঘটনায় অনুসন্ধান, তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া এগোয়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে শত শত মানুষকে অবৈধভাবে আটক করে গোপনে স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে ২০১৬ সালে ৯০ জনকে গুম করা হয়েছে বলে বিস্তারিত তথ্যাদি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে এবছরের প্রথম ৫ মাসেই ৪৮ জনকে গুম করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়। এছাড়াও আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীকে এ কাজ পরিচালনায় অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এমনকি মানবাধিকার, মানুষের জীবন ও আইন প্রতি তোয়াক্কা না করাকে সরকারের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই প্রতিবেদনে বলেছে।

১৬ এপ্রিল ২০১৪ ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা-নারায়নগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন। তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট পরিবেশ আইনবিদ রিজওয়ানা হাসানের স্বামী। অপহরণের ৩৪ ঘন্টা পর চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে মীরপুর রোডে নামিয়ে দেয়া হয়। বাঁধন খুলে কলাবাগানে পুলিশ চেকপোষ্টে আসলে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং জবানবন্দী রেকর্ড করে ছেড়ে দেয়া হয়। এই অপহরণ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি হিমাগারে চলে গেছে।

রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না ২০১৫ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে বনানী থেকে ‘নিখোঁজ’ হন এবং ২১ ঘন্টা পরে পুলিশ তাকে ধানমন্ডী থেকে গ্রেফতার দেখায়। বনানী থেকে সাদা পোষাকধারী পুলিশরা তুলে নিয়ে গেছে বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করলেও পুলিশ, র‌্যাব অস্বীকার করে। খুব কমক্ষেত্রেই রাষ্টদ্রোহীতা ও নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ এনে তাকে জেলে রাখা হয়। এরকম স্পর্শকাতর অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত এগোচ্ছে না বা আদৌ কি হয়েছে জানা যায় না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সে সময়ের মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকার উত্তরা থেকে ‘রহস্যজনক নিখোঁজ’ হন। ৬২ দিন পরে ভারতের শিলংয়ের একটি সড়কে উদভ্রান্ত ও অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ঘোরাঘুরিরত সালাহউদ্দিনকে পায় ভারতীয় পুলিশ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি, যারা অপহরণ করেছে তারাই তাকে ভারতে নিয়ে গেছে। এর বেশি তিনি কিছু বলেননি। সালাহউদ্দিনের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে কোন উচ্চ-বাচ্য নেই, এমনকি তার দলও ভুলে গেছে তার কথা!

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পরে গণমাধ্যমে সাক্ষাতকারদাতা তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ দিনগত রাতে ‘নিখোঁজ’ হন। ৫ দিন পরে এয়ারপোর্ট রোডে উদভ্রান্ত অবস্থায় হাঁটতে থাকা তানভীরকে পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দেয়। এই ‘নিখোঁজের’ বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি। ঢাকার আদালত পাড়া থেকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী ২০১৬ সালের ৪ আগষ্ট ‘নিখোঁজ’ হয়ে সাত মাস পরে অজ্ঞাতস্থান থেকে বাড়ি ফিরে আসলেও কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।

নিখোঁজ, অপহরণ, গুম-যাই বলা হোক- এর শিকার মানুষটির নিকটজনরা প্রায়শ: যে অভিযোগটি করেন-আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যারা ফিরতে পারেন ভাগ্যের জোরে তাদের বক্তব্যও একইরকম। মাইক্রোবাসে তুলে চোখ বেঁধে তাদের অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটুকু বলে আর কিছু মনে করতে পারেন না বা বলেন না  এবং স্রেফ বোবা বনে যান।

ফিরে আসার পর ফরহাদ মজহারের বক্তব্যও ওই একইরকম। পুলিশকে তিনি জানিয়েছেন, শ্যামলীতে তার বাসার সামনে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু চাঞ্চল্যকর হচ্ছে, ‘‘সরকারকে বিব্রত করতে সন্ত্রাসীরা এ কাজ করে থাকতে পারে বলে ফরহাদ মনে করেন’’। ভাবুন তো, জামায়াত-বিএনপি ঘরানার কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার এরকমটিই মনে করছেন! প্রশ্ন উঠেছে, যা ঘটেছিল সেটি কি ফরহাদ মজহার ইচ্ছেকৃত চেপে যাচ্ছেন অথবা নির্দেশিত হয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহসাই মিলবেনা।

লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার কি ঠিক করেছিলেন যে থ্রিলার লিখবেন? এডগার এ্যালান পো’র মত নিজেই থ্রিলারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হবেন? সেজন্যই কি সাতসকালে খুলনা যাত্রা করেছিলেন ব্যাগেজ ছাড়াই এবং গফুর নামে টিকিট কেটে ফেরার পথে ব্যাগেজ জোগাড় করে নিয়েছিলেন? নাকি কোন সাজানো মঞ্চে ঈদোত্তর বিশেষ একটি নাটকে মহড়া দিয়ে এলেন। খুব সহসাই এ রহস্যের উন্মোচন হচ্ছে না। পুলিশের খুলনার রেঞ্জ ডিআইজি’র মতে, তিনি ভ্রমনরত অবস্থায় ছিলেন।

ফরহাদ মজহার যদি দিনভর একটি নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন আসবে নাটকের রচয়িতা, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশক কে? এটি কি তিনি নিজেই নাকি বিএনপির দাবি অনুযায়ী সরকার বা কোন এজেন্সি । কিংবা এমন কোন রাজনৈতিক দল যারা অতীত-বর্তমানে এরকম রহস্যজনক নাটক মঞ্চস্থ করতে ও করাতে বিশেষ পারঙ্গমতা অর্জন করেছে।

অনেক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল এটি অপহরণ। বাসা থেকে বের হবার সামান্য পরেই সকাল সাড়ে ৫টার দিকে মোবাইল ফোন করে তার স্ত্রীকে জানালেন, “ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে”। এই ‘ওরাটা’ কারা সেটি হচ্ছে মূল রহস্যের জায়গা। সরকারের দায়িত্ববান কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি ভ্রমন করছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক মন্তব্য না করেই পুলিশি তদন্তের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে রহস্যোপনাসের প্লট বলে মনে হচ্ছে! কিন্তু দুর্বল গাঁথুনির। ফাঁক-ফোঁকড় অনেক। সত্যি কি ওষুধ কেনার জন্য তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন? নাকি কারো ফোনকলে সাড়া দিয়ে বেরিয়েছিলেন? অপহরণের পরে তাকে ফোন করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল এবং তারা ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণও দাবি করেছে। এরপরে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। নাটক নাকি ঘটনা এগিয়ে চলে। জানা যায় ফরহাদ মজহার খুলনায়। রাত ১১ টায় হানিফের গাড়ি থেকে উদ্ধার। সরকারী ভাষ্য, তিনি ভ্রমন করছিলেন।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “একজন অপহরণ বা নিখোঁজ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর যদি সরকার বা আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনী তার সম্পর্কে কিছু বলতে না পারে তখন সাধারন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে”। আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, একটা ঘটনারও সুরাহা হয়েছে বলে জানা যায়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। ফলে জন-পারসেপশন হচ্ছে, সরকারের সমালোচকদের ক্ষেত্রে রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনা বেশি ঘটছে। এটি দুর করতে হলে অবশ্যই অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।