Home » আন্তর্জাতিক » মোদি’তে ইসরাইলের এত আগ্রহ কেন?

মোদি’তে ইসরাইলের এত আগ্রহ কেন?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারতের প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে ইসরাইল সফর করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একে খুবই সফল সফর হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে যখন পোল্যান্ডে যাচ্ছিলেন, সেদিনই শেষ হলো মোদির ইসরাইল সফর।

অস্তিত্বের শুরু থেকেই ইসরাইলের বেশির ভাগ মিত্র পাওয়া গিয়েছিল পাশ্চাত্যে। জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় দুই দেশ চীন ও ভারত আরবদের সমর্থন দিয়েছিল; ইসরাইলের সাথে দেশ দুটির কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিল না।

অনেক বছর ধরেই ভারত ছিল বিশেষভাবে ইসরাইলের প্রতি বৈরী। ভারতের নেতৃত্বে থাকা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন অনেকবারই ইসরাইল বিরোধী ঘোষণা দিয়েছে।

অতীতে ইসরাইলী-ফিলিস্তিনী সংঘাতে ভারত ভারসাম্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে আসছিল। মোদিই এই ঐতিহ্যের পুরোপুরি ও বেপরোয়া লংঘন ঘটালেন। তিনি ফিলিস্তিনীদের সাথে সাক্ষাত করার গরজই অনুভব করেননি। এমন অবস্থায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটা বৈশ্বিক-ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ধরনের জোটগত পুনর্গঠন হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন অনেক।

চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে ১৯৯২ সালে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, অন্যদিকে ওসলো শান্তি-প্রক্রিয়া নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তখন থেকেই চীন, ভারত এবং আরো অনেক দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে ফেলল ইসরাইল।

শুরুতে চীন ও ইসরাইল উভয়ের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে ধীরে ধীরে। কিন্তু গত কয়েক বছরে উভয় দেশের সাথে বাণিজ্য বেড়েছে দ্রুত। ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সাথে ভারতের বাণিজ্য ছিল ২০ কোটি ডলার। গত বছর তা দাঁড়িয়েছে ৪২০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক আরো নাটকীয়ভাবে বড়েছে। ১৯৯২ সালে যেখানে ছিল মাত্র ২ কোটি ডলার, সেখানে গত বছর দাঁড়িয়েছে ৭৭০ কোটি ডলারে।

শুরুতে বেশির ভাগ বাণিজ্যই ছিল সামরিক সরঞ্জাম খাতে। আমেরিকার আপত্তির কারণে চীনের সাথে অস্ত্র বাণিজ্য সীমিত হলেও ভারতের সাথে সেটা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তবে চীন ব্যাপকভাবে ইসরাইলী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করে। নতুন প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠা কোম্পানি- উভয় দিকেই নজর ছিল চীনাদের।

বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ের আগে পর্যন্ত চীন ও ভারত উভয় দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল অনেকটাই নিম্ন পর্যায়ের। তবে চলতি বছর এই অবস্থা বদলে গেছে। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর উদযাপন উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে চীন সফর করেন। আর অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফর করলেন ইসরাইল, যেটাকে কেবল পারস্পরিক ‘ভালোবাসা প্রকাশের প্রতিযোগিতা’ হিসেবেই কেবল বর্ণনা করা যায়।

এমন পরিবর্তন কেন ?

এর তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ‘স্টার্ট-আপ ন্যাশন’ হিসেবে ইসরাইলের খ্যাতির কারণে চীন বা ভারতের পক্ষে দেশটিকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে দেশটি। ইসরাইলে এমন সব বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন ঘটিয়েছে, যেদিকে চীন বা ভারত আগে নজর দেয়নি। উভয় দেশের সাথে সরাসরি বাণিজ্য এখন বিপুল হলেও, পরোক্ষ বাণিজ্য আরো বিশাল। উভয় দেশই ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, চীন ও ভারত উভয় দেশেরই বিপুল সংখ্যায় মুসলিম সংখ্যালঘুর আছে এবং তারা উভয়েই সন্ত্রাসবাদের ননানাদিক নিয়ে ভীত। পশ্চিম তীরে ইসরাইলী নীতিতে তারা একমত না হলেও ইসরাইলের সাথে উভয় দেশই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহী।

তৃতীয়ত, আরব দেশগুলোর দুর্বলতা। উপসাগরের অনেক দেশই এখন ইসরাইলের সাথে সহযোগিতা করছে। ফলে ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই এখন ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক উন্নতি ঝুঁকিমুক্ত হয়ে পড়েছে।

আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, নেতানিয়াহুর সফরের আগে মোদি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে কোলাকুলি সেরে আসেন। আবার গত মাসে পুতিনের সাথে সাক্ষাত করে মোদি তাকে ‘সহজাত মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেন। ব্যাখ্যা করলে কী দাঁড়ায়? পশ্চিম ইউরোপ ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের প্রতি বৈরী হয়ে ওঠেছে। জার্মানি তো ট্রাম্পকে চোখের বালি মনে করছে। ইউরোপের দৃষ্টিতে ইউরোপের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ট্রাম্পকে তাদের প্রতিরোধ করতেই হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অবস্থা আর দেখা যায়নি। ৩০ বছর আগে বিশ্ব মোটামুটিভাবে উদার গণতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় বিভক্ত ছিল। এখন উদার গণতন্ত্রের সাথে লড়াই হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক প্রতাপশালীদের মধ্যে। মোদি, ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, পুতিন- কি এক কাতারে পড়ছেন না?

মোদিকে ইসরাইলে স্বাগত জানানোর জন্য নেতানিয়াহু তার মন্ত্রিসভার সব সদস্যকে বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করেন। এই সফরটি যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমপর্যায়ের হয়, তার সব আয়োজন নিশ্চিত করেন নেতানিয়াহু। মোদির ইসরাইলে অবস্থানের পুরোটা সময় নেতানিয়াহু তার সাথে ছিলেন।

রাস্তায় লোকজনও মোদিকে বিপুল আগ্রহভরে গ্রহণ করেছিল। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী না বলে থাকতে পারেননি এবং তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমেরিকা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তখন মোদির উষ্ণ সফরটি অবশ্যই দারুণ বিষয়’।

এই সফরকে কেন্দ্র করে কয়েকটি বড় ধরনের প্রশ্ন এখন ঘুরপাঁক খাচ্ছে। চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে ইসরাইল কি এখন নতুন মিত্রদের সন্ধান করছে? যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপে তার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে যাচ্ছে?

ট্রাম্পের আমলে বিষয়টা বিশেষভাবে সত্য। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলে আসছেন, তিনি ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অন্যদিকে মনে হচ্ছে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি এলোমেলো হয়ে পড়েছে। এ কথাটাই জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত গর্বভরে বলেছেন, আমেরিকার নীতি এখনো পুরোপুরি অনিশ্চয়তাপূর্ণ।

অনেকেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করছে। তারা মনে করছেন, চীন ও ভারতের সাথেই তাদের ভবিষ্যত। অবশ্য অনেকে এখনো ততটা উৎসাহী নয়। তাদের মতে, ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। অভিন্ন মূল্যবোধ পোষণ করে দুই দেশ। তাছাড়া আমেরিকান ইহুদি সম্প্রদায়ের সমর্থনের কথাটা কিভাবে ভোলা যায়?

ইসরাইলের নতুন মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহে থাকা লোকজন আরেকটি কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরাইলের পক্ষে ভোট দিয়ে আসছে আর চীন তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। আর ভারত কিছু দিন ধরে কৌশলগত ভোট দানে বিরত থাকছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ইসরাইল দুটির একটি বেছে নেওয়ার মতো কোনো সমস্যায় পড়েনি;  অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের কথাটা বাদ দিলে। এই মুহূর্তে প্রাচ্যে তার নতুন জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে উপভোগ করছে। আবার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সাথেও সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

তবে ইসরাইল যখন বিডিএসের (বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং অবরোধ) যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তখন পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশের সাথে বিপুল সম্পর্ক ইসরাইলকে নিঃসঙ্গ করার তাদের প্রয়াসকে বিদ্রুপে পরিণত করছে। কারন ভারত আর ইসরাইল এখন প্রকাশ্যের ঘনিষ্ট বন্ধু ও মিত্র।

(নিউজ উইক ও দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)