Home » প্রচ্ছদ কথা » রামপালে ক্ষমতাসীনদের ‘শিল্প-বানিজ্য’ নগরী

রামপালে ক্ষমতাসীনদের ‘শিল্প-বানিজ্য’ নগরী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

কম-বেশি ১৮৬টি ভারী-মাঝারি শিল্প স্থাপনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে, সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায়। সরকার এখন বলছে, ইউনেসকো’র শর্ত মেনে আপাতত: সুন্দরবনের আশে-পাশে বড় ধরনের শিল্প অবকাঠামোর অনুমোদন দেয়া হবে না। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার মেনে চলবে ইউনেসকো’র শর্ত-সুপারিশ। সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টার। তার মতে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ নয়, চলবে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সুন্দরবন থাকুক আর না থাকুক উন্নয়ন চলবেই- এ ব্যাপারে সরকার প্রধান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই উন্নয়ন জোয়ারে এতকাল কোন বাধা পাত্তা না পেলেও যেইমাত্র শর্তসাপেক্ষে ইউনেসকো খসড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যা এখনোও চুড়ান্ত নয়, ঠিক অমনি সরকার সেটি লুফে নিয়েছে। প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী এবং সবশেষ জ্বালানী উপদেষ্টা ফলাও করে সেটি প্রচার করেছেন। গেল কয়েকদিন জ্বালানী উপদেষ্টা মিডিয়ায় দারুন সরব- ইউনেসকো যা বলেছে তার বাইরে যাবেনই না-হাক-ডাক, ভাব যেন তেমনই!

অথচ এত বড় প্রতারণা কী মেনে নেয়া যায়? ইতিমধ্যে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে ভারী শিল্প-কারখানা স্থাপনে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই কিনেছেন কম-বেশি তিন হাজার একর জমি। দল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নেতৃবৃন্দ কিনেছেন প্রায় সাত হাজার একর। একুনে দশ হাজার একর জমি কেনা হয়েছে এবং কেনার হিড়িক পড়ে গেছে।

এসব জমি তো আর বসতবাড়ি, রেষ্টহাউস বা বাংলো বানানোর জন্য কেনা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে ভাগ্যবান নেতা, যিনি এর আগে চিংড়ি ঘেরের ম্যানেজার ছিলেন, তিনি মোংলার জয়মনিরগোল এলাকায় কিনেছেন প্রায় দুশো একর জমি। নিশ্চয়ই বসবাসের জন্য নয়! দেশের খ্যাতনামা শিল্পগোষ্ঠি ওরিয়ন, বসুন্ধরা, সামিট, ইনডেক্সসহ নামী-দামী কর্পোরেট গ্রুপেরা সুন্দরবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার জলা-জমি কিনে নিয়েছেন। নিশ্চয়ই শিল্প, কল-কারখানা স্থাপনের জন্য ?

খুলনা-মোংলা হাইওয়ের মাঝামাঝি থেকে শেষ মাথায় গেলে যে কারো মনে হবে- এখানে গড়ে উঠছে মেগা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল শিল্পাঞ্চল।  চিংড়ি ঘের,  গ্যাস প্ল্যান্ট, সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলির শিল্পবর্জ্য নিঃসরিত হচ্ছে। মিশকালো ধোঁয়া ও ফ্লাই এ্যাশ মিশে যাচ্ছে সুন্দরবনে। মোংলার সাম্পানঘাটে বিশাল আকৃতির সাইনবোর্ডঃ ‘‘এলাকাটি সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা’’। কিন্তু খোদ সরকারই সুন্দরবন ঘেঁষে জয়মনিরগোলে নির্মান করেছে বিশাল সাইলো বা খাদ্যগুদাম।

মোংলা ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চলের বিশাল সারির পর রামপালের দিকে যেতে দুই পাশে যে জমি মাত্র কিছুকাল আগেও ফাকা ছিল, আজ তার এতটুকুও জমি ফাঁকা নেই। সবই প্রস্তাবিত অথবা নির্মানাধীন শিল্প কারখানার দখলে। অথচ গোটা অঞ্চল প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ-এর অন্তর্ভুক্ত। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার নয়টি উপজেলায় ইতিমধ্যে ১৪০ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে চ’ড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। সুন্দরবনের দুই কিলোমিটারের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মাহববুবুল আলম হানিফ ‘সানমেরিন শিপইয়ার্ড’ নির্মানের ছাড়পত্র পেয়ে গেছেন।

ছাড়পত্র প্রসঙ্গে বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল চমৎকৃত করে দেবার মত। তার মতে, “দেশের জন্য সুন্দরবনও দরকার, আবার শিল্প-কারখানাও দরকার। আমরা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্দ্রী বরাবরে উপস্থাপন করছি”। বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে সুন্দরবনকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠির তীব্র প্রতিবাদ রয়েছে। কারণ, সুন্দরবন রক্ষা করতেই হবে-এটি তাদের প্রধানতম কাজ।

প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ এবং জ্বালানী উপদেষ্টাকে স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজন পড়ে না, তাদের রাষ্ট্রীয় গেজেট নিশ্চয়ই পড়তে হয়, পড়েন, জানেনও। রাষ্টপতির পক্ষে উপসচিব স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে; “প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিব বৈশিষ্ট্য নষ্ট ও পরিবর্তন হবে, এমন কোন কাজ করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দুষনকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না”। প্রসঙ্গত: সরকার সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার এলাকা প্রভাবিত প্রতিবেশ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের একজন, সংসদ সদস্য, একদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল আলম হানিফ কী জানেন না যে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় চিংড়ি ঘের করতে হলে পবিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগে? গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছে ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা একসাথে কতগুলি রাষ্ট্রীয় আইন ভেঙ্গে চলেছেন!

এক. সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) কোন বাণিজ্যিক কর্মকান্ড স্থাপনা নিষিদ্ধ হলেও দাকোপের সুতারখালীতে ৩৫ একর বিশিষ্ট চিংড়ি খামার এবং দোতলা ও একতলা স্থাপনা নির্মান করেছেন হানিফ।

দুই. ঘের স্থাপনের বেড়িবাঁধ কেটে সুন্দরবনের পশুর নদ থেকে নিয়মিত লবন পানি ঘেরে প্রবাহিত করা হচ্ছে।

তিন. ঘেরের মাঝে অবস্থিত কালীমন্দিরের জায়গা তিনি ইজারা নিয়েছেন এবং একটি পুকুর ভরাট করে জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে ফেলেছেন।

চার. আরেকটি মন্দির নির্মান করছেন। পানি শোধনাগার স্থাপন করেছেন।

পাঁচ. চিংড়ি খামারে তিনি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর ব্যবহার করে মারাত্মক শব্দদুষন সৃষ্টি করছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের পাঁচ ধারায় বর্ণিত ইসিএ  এলাকায় নিষিদ্ধ এসব কর্মকান্ড করে সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইন লংঘন করছেন…..।

এখন দেখা যাক, সুন্দরবন এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মানে সরকার প্রধানের অবস্থান কি? কারণ তার নিজের এবং অনুসারীদের ভাষায়,“বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে দেশের একবিন্দু ক্ষতি হতে পারে না। তার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই”! সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে অনমনীয়। এক্ষেত্রে তিনি দেশ- বিদেশে সকল বাধা উপেক্ষা ও অতিক্রম করেছে; এমনকি ভারতে এরকম দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প পরিত্যক্ত হবার পরেও।

প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে যুক্তি হাজির করেছেন নানাসময়ে। তার উল্লেখযোগ্য যুক্তিগুলো হচ্ছে; উন্নয়ন করতে গেলে জলা- বনের কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করতেই হবে। উন্নয়নের সুফল সে ক্ষতি পুষিয়ে দেবে। এখন উন্নত প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করলে পরিবেশের ক্ষতি সহনীয় মাত্রায় হবে। ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হবে। সারাদেশে বিদ্যুতের জোয়ার এলে দু’চারটে ক্ষতি মানুষ ভুলে যাবে। যে প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র ফেরত এনেছি, একই প্রক্রিয়ায় উন্নয়নবিরোধী সব তৎপরতা থামিয়ে দেয়া যাবে।

ষাট দশকে পাকিস্তানের সেনাশাসক আইয়ুব খান কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, পাহাড়ীদের দুর্দশা যাই হোক, বিদ্যুতের উন্নয়ন তা ভুলিয়ে দেবে। আইয়ুবের উন্নয়ন তত্ত¡ মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। কাপ্তাই থেকে যে বিদ্যুৎ এসেছে সে তুলনায় অর্থনৈতিক, পরিবেশ-প্রতিবেশগত ক্ষতি অপূরণীয়। পাহাড়ীরা উচ্ছেদ হয়েছে, জলমগ্নতায় বদলেছে তাদের জীবন। এই উন্নয়ন প্রকল্পকে জীবনহানির সমতুল্য চিহ্নিত দশকের পর দশক তারা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে।

এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। পাহাড়ে ক্যান্টনমেন্ট তৈরী করতে হয়েছে। এক দেশের মধ্যে ‘দুই চিন্তা’ জন্ম নিয়েছে। একই দেশের অধিবাসীরা পরস্পরকে শত্রæ ভেবে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে বহু বছর। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রকৃতি ও মনুষ্য জীবন বিবেচনায় সবচেয়ে ক্ষতিকর উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এই ধরনের উন্নয়ন দর্শন বা উন্নয়ন লক্ষ্যটি সৎ-স্বচ্ছ হয় না। কারণ এরকম তথাকথিত উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ থাকে না, উন্নয়নও আসলে উদ্দেশ্য নয়। জনস্বার্থ তো কোন বিষয়ই নয়। এসব একপর্যায়ে পরিবেশ- প্রতিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। এজন্যই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদাহরন নিয়ে আসতে হয়েছে। উন্নয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যেন-তেন প্রকারে শক্তি প্রয়োগের নীতিতে জনভাবনার বিপরীতে উন্নয়ন অনেক সময় কদর্য পরিনতি ডেকে আনে। এরকম অজ¯্র উদাহরন থাকা সত্তে¡ও রামপালের বিষয়ে সরকার প্রধান অনমনীয়ই থেকে যাচ্ছেন।

এই নিবন্ধ লেখার সময় জানা গেল, ইউনেস্কো ১২ জুলাই সুন্দরবন বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারে। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে বাংলাদেশে ইউনেস্কো প্রতিনিধি বিয়েট্রিকা কালডুন এ খবর জানিয়েছেন। তার মতে, গত ২ জুলাই থেকে পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে শুরু হওয়া বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় প্রকল্প অনুমোদন, বাতিল কোনটিই করা হয় না। সম্মেলন শুরুর আগে গত মে মাসে সুন্দরবনের ওপর তৈরী হওয়া খসড়া সিদ্ধান্তের কিছু বিষয়ে সংশোধন আসতে পারে। তবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত খুব শিগগিরই।

এরই মধ্যে গত রোববার থেকে সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় দাবি করে আসা হচ্ছে, ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে। শুধু একটি কৌশলগত সমীক্ষা করতে বলেছে ২০১৮ সালের মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের ব্যাপারে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির কোন আপত্তি নেই।