Home » বিশেষ নিবন্ধ » বিলাত ফেরত সহায়ক সরকার

বিলাত ফেরত সহায়ক সরকার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

প্রায় দশককাল পরে বিএনপি ‘নির্বাচন যাত্রা’ শুরু হয়েছে। নির্বাচনমুখী একটি দল যদি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায় না করতে পারে, তাহলে তার অবস্থান হয়ে দাঁড়ায় ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’- বিএনপি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরন। নানা পন্থায় সরকারের অদম্য ও সীমাহীন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের সৌভাগ্য যে, ভাঙনের মুখোমুখি হয়নি দলটি অথবা উল্লেখযোগ্য নেতা-কর্মীরা দলছুট হয়নি। মামলা-হামলা-নির্যাতন সয়েও নিষ্ক্রিয় হয়েছেন; কিন্তু দল ছাড়েননি, আনুগত্যও পরিবর্তণ করেননি।

তবে এ বিষয়টি কখনই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হিসেবের মধ্যে ছিল না যে, ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনে এরশাদের অধীনে ঘোষিত নির্বাচন বয়কট এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এক নয়; সময়-কাল- পাত্র ভিন্ন। ২০১৪ সালে বিএনপি আন্দোলনমুখী ছিল না; নেতৃত্বও মাঠে ছিল না; জামায়াত-শিবির নির্ভর আন্দোলন নাশকতার চোরাগলিতে হারিয়ে গেছে। যদিও আতঙ্কিত সরকার বলেছিল, ‘সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার এই নির্বাচন, আলোচনার ভিত্তিতে সহসাই একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করা হবে’।

ঐ নির্বাচনের পরে বিএনপি নেতৃত্ব আন্দোলনে ইতি-টেনে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে জনগনকে সংগঠিত করে কোন আন্দোলন তারা আর করতে সক্ষম ছিলেন না- যাতে সরকারকে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য করা যায়। ফলে ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পেয়ে যায় পুরোপুরিভাবে। নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার হয়ে অনিবার্যভাবে হয়ে ওঠে হিংস্র, ক্ষিপ্র ও কর্তৃত্ববাদী। এই আশঙ্কাটি নিয়েই ২০১৪ সালের গোড়াতেই ‘‘আমাদের বুধবার’’-এ বলা হয়েছিল যে, এই সরকার কোন বিরুদ্ধ মত-পথ সহ্য করবে না।

ধারনা করা হয়, ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনের অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলেই দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারতো। নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতাসীনরা বিএনপির অংশগ্রহনে নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তাদের বার্তা দিয়েই দিয়েছিল। ফলে একটি যেন-তেন প্রকারের নির্বাচনেও ভোট দেয়ার সুযোগ দিলে কি ঘটবে- এটি তাদের জানাই ছিল। সেজন্য বিএনপিকে বাইরে রেখে একক নির্বাচনের পথ-নকশা হয়েছিল- আর বিএনপি সেই ফাঁদেই পা দিয়েছিল, লন্ডন থেকে উসকানী পাঠিয়ে দেয়া হলো।

অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু আলাপচারিতায় দেশের একজন খ্যাতনামা গবেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। তার মতে, ঐ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিএনপি অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলে গোটা ছকই পাল্টে যেত এবং ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারতো। তিনি আরো মনে করেন, মঞ্চ প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বিএনপির অপরিনামদর্শী নেতৃত্ব সে বিষয়টি অনুধাবনে সক্ষম ছিল না। যার ফলে নির্বাচনী রাজনীতির মূল¯্রােত থেকে তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দুরে সরে যেতে হয়েছে।

দুই. নির্বাচন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ বা ‘পথ-নকশা’ ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলটি সন্তোষ ব্যক্ত করে রোডম্যাপ অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তবে বিএনপির মহাসচিবের মতে, “যার কোন রোডই নাই, তার ম্যাপ আসবে কোত্থেকে”। তিনি অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, সিনিয়র নেতাদের সাথে আলোচনা করে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানাবেন। তার মতে, বিএনপি এখন সহায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহনের কথা ভাবছে না।

কিন্তু এবিষয়টি নিশ্চিত যে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনীমুখী এই দলটির সামনে কি অন্য কোন বিকল্প আছে? ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে অনেক ধরনের মেরুকরণ ঘটে গেছে, বহু কিছুণেযা হয়েছে দখলে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধ্বজাধারী আওয়ামী লীগ ধর্মকে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিএনপির চেয়েও পারঙ্গমতা অর্জন করেছে, সেটিও দৃশ্যমান। কিন্তু ভোটের বাজারে তাদের এই তৎপরতা কতটা সুফল এনে দেবে  খোদ ক্ষমতাসীন দলই সে ব্যাপারে ভালো বলতে পারবে। তবে তারা ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন পাবার আশা ছাড়েনি।

বিএনপি এখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের আওয়াজ তুলেছে মাত্র। দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে লন্ডনে রওয়ানা হয়ে গেছেন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। সেখানে তার পুত্র ও দলের দ্বিতীয় প্রধান তারেক জিয়ার সাথে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই হবে বিএনপির আগামী কর্মসূচি। লন্ডন থেকে ফিরে এসে খালেদা জিয়া সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করবেন। এর আগে নির্বাচনকে মাথায় রেখে ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করা হয়েছে অনেকটাই ‘মিশন’বিহীন পরিস্থতিতে।

তবে গুরুত্বপূর্ন একটি ম্যাসেজ নির্বচন কমিশনের পক্ষ তেকে দেয়া হয়েছে; আর তা হলো-নির্বাচনকালীন সময়ের বিষয়গুলো তাদের এখতিয়ার; এর আগের লেভেল-প্লেইং ফিল্ড গঠন তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এটিও মনে রাখতে হবে যে, বিএনপিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে হবে  নির্বাচনকালে। এটি যে সহজ নয় তা দলটির জানা আছে। এই দেশে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য তিন ধরনের শক্তির দরকার হয়। ক) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা; খ) জনগনের শক্তি; গ) আন্তর্জাতিক সমর্থন- বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের। দশককাল ধরে বিএনপির ক্ষেত্রে এই শক্তিগুলোর সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ক্ষমতাও নেই। বিএনপির ভোট আছে বটে কিন্তু জনগনের শক্তিকে সংগঠিত করার সক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক সমর্থনের ক্ষেত্রে তারেক জিয়া এখনও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অতিবড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন’।

দলের ভঙ্গুর দশা, দলের মধ্যে দল ও অনৈক্য এবং সুবিধাবাদীদের চক্রান্ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে বিএনপির। এ সকল বিপত্তিও যে  কোন সময় বিপদের কারণ হতে পারে। খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার মামলাগুলি আদালতে সহসাই নিস্পন্ন হবে যাচ্ছে-এমন আলামত সুস্পষ্ট। মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হলে আইনী মোকাবেলাসহ আগামী নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বিএনপিকে। আর এর সাফল্যেই নির্ভর করবে কি ধরনের লক্ষ্যভেদী কৌশল তারা নির্ধারন করতে সক্ষম!

বিএনপির কিছু শুভাকাংখী অবশ্য অবগতিতে রয়েছেন যে, খুব সহজেই ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের নির্বাচনের পরিনতির শিক্ষণ মাথায় রেখেই এগোচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনেককেই এই নির্বাচনের বাইরে রাখার তৎপরতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যত দিন যাবে, এই তৎপরতা বহুমাত্রিকতা পাবে। এসব কিছুকে বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনমুখী বিএনপির স্মৃতিতে রয়েছে ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা,পরিস্থিতি আর হাঁ-হুতাশ আছে, তবে দুঃখজনকভাবে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন নেই।