Home » প্রচ্ছদ কথা » সিদ্দিকুরের চোখ, ইউএনও’র হাতকড়া, অতি-উৎসাহী প্রশাসন আর ওবায়দুল্লাহরা

সিদ্দিকুরের চোখ, ইউএনও’র হাতকড়া, অতি-উৎসাহী প্রশাসন আর ওবায়দুল্লাহরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র সিদ্দিকুর এখন জেনে গেছেন, তার চোখে হয়তো আর আলো নাও ফিরতে পারে। তাকে সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত: এইটুকু করুণা করা হয়েছে যে, তার চোখের চিকিৎসায় ভারতের চেন্নাই পাঠানো হবে। পুলিশ কমিশনার তার চোখে টিয়ার সেল লাগার ঘটনায় ইতিমধ্যেই ‘রহস্যময়তা’ খুঁজে পেয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত করে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ঐ তদন্ত রিপোর্টে সন্তুষ্ট না হলে তিনি আবার তদন্ত করাবেন।

পুলিশি নির্মমতা বা রহস্যময়তার শিকার হয়ে এই ছাত্রটি যখন চোখের আলো হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় রয়েছেন, ঠিক সে সময়ে খুলনায় ‘ছিনতাইকারী’ অভিযোগে এক যুবকের চোখ তুলে নিয়েছে পুলিশ। এইসব ভয়াবহ ঘটনা স্বাভাবিকভাবে যেমনটা হয়ঠিক তেমনি চাপা পড়তে যাবার সময় একজন ‘‘ভাগ্যবান’’ ইউএনও’র প্রতি অন্যায় আচরনের প্রতিবাদে সকল মহলের তৎপরতা সত্যিই চেখে পড়ার মতো। তাকে নিয়ে এখন সকল মাধ্যমে চলছে তোলপাড়। সে তোলপাড় পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও, অবশ্য প্রশাসনের কর্মকর্তা হবার সুবাদে সংগত কারনও যে নেই তা নয়।

সদ্য কৈশোর পেরোনো এজন তরুণ সিদ্দিকুর কী জানেন, আমাদের এই রাষ্ট্র-সরকার-সমাজ সাড়ে চার দশক ধরে কিছু খুবই সামান্য ব্যত্যয় ছাড়া এক অস্বাভাবিক পথে হাঁটছে? অর্ধসত্য- সত্য-মিথ্যের মিশেল দিয়ে যে কোন বিষয়কে ধামাচাপা দেয়ার ক্ষেত্রে এখন কোন দ্বিধা নেই, রাখ-ঢাক নেই। ধারাবাহিক পলিসি অব ডিনায়েল (প্রত্যাখান বা না বলার নীতি) ও অসহিষ্ণুতা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং জনমানুষের মনোজমিনে জায়গা করে নিচ্ছে। এই রোগ একদিকে গণতন্ত্রের (?) প্রাতিষ্ঠানিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে, তেমনি শাসকশ্রেনীর বিভিন্ন অঙ্গকে লাগামহীন ও বেপরোয়া করে তুলছে।

দুই. ১৯৯৫ সালে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছিল। অমন বদলি আকছার হয়েই থাকে। কিন্তু ঐ বদলিটিকে কেন্ত্র করে পরবর্তীকালে অনেক ঘটন-অঘটন সৃষ্টি হয়েছিল। এটি ছিল প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র অফিশিয়ালদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের- ফলশ্রুতি। ড. কামাল সিদ্দিকী সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্যসচিব। আরেক সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ‘জেলা গেজেটিয়ার’ পদে বদলি আদেশের ফাইলটি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বাক্ষরের জন্য তিনি উপস্থাপন করেন।

খানিকটা গুরুত্বহীন জেলা গেজেটিয়ার পদে সাধারনত অতিরিক্ত সচিবদের দেয়া হয়। স্বাক্ষরের আগে প্রধানমন্ত্রী তার মুখ্যসচিবের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সব ঠিক আছে কিনা এবং কোন সমস্যা হবে কিনা? মুখ্যসচিব তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, না, কোন সমস্যা নেই। এভাবে, সে সময়ের ‘‘জাদরেল’’ সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীর অভ্যন্তরীন কোন্দলের শিকার হয়েছিলেন এবং তাকে কেন্দ্র করে যা যা ঘটেছিল, তা ইতিহাস। ঘটনার অভিন্ন বর্ণনা শুনেছিলাম সে সময়ের দু’জন কর্মকর্তার কাছে, যাদের একজন এখন প্রয়াত।

পরবর্তী ঘটনা অনেকের জানা। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কিভাবে সরকারের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে পরবর্তীতে ‘জনতার মঞ্চ’গঠন করেছিলেন, সচিবালয়ে বিদ্রোহ ঘটেছিল এবং এসব ঘটনা সরকার পতনে কি ভূমিকা রেখেছিল- সেগুলি পরের সরকারগুলোর কাছে উদাহরন হয়ে আছে। নির্মোহভাবে বলা যায়, এর মধ্য দিয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনের বারোটা বেজেছিল, রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে আমলাতন্ত্র  একেবারেই ‘পার্টিজান’ হয়ে যায়; যার মন্দ-ভাল ফল গত দেড়যুগ ধরে দেশের মানুষ ভোগ করছে।

ম.খা. আলমগীর জাদরেল সিএসপি, একাত্তরের ময়মনসিংহের এডিসি, লাইমলাইটে আসেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ এর একজন বাস্তবায়নকারী, খাল-কাটাখ্যাত এবং সিভিল-মিলিটারী সরকারের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে। প্রয়াত: জিয়ার প্রতি অনুরক্ত এই আমলা মূলত: ১৯৯৫ সালের ওই ঘটনার পর বিসিএস প্রশাসন সমিতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগের গুডবুকে চলে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তার প্রাপ্তিযোগ এবং পুন:পুন নির্যাতনের শিকার হওয়া, সকলেরই জানা আছে।

তিন. তারিক সালমান সিভিল ব্যুরোক্রেসির জুনিয়র সদস্য। সৎ, নিষ্ঠাবান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে ধারনা পাওয়া যাচ্ছে। আগৈলঝড়া ও বরগুনা সদরে ইউএনও হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তার কৃত অনেক বিষয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে। তিনি বরিশালের সেরনিয়াবাত পরিবারের আর্শীবাদপুষ্ট ক্ষমতাসীন দলের কথিত হাইব্রিড ও দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি শক্ত অবস্থান বজায় রেখে চলেছিলেন। যেটি পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের, গ্রেফতার ও হাজতবাসকে ত্বরান্বিত করে।

কর্মকালে তিনি তার জেলা প্রশাসকদ্বয়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, এমনকি বিভাগীয় কমিশনারেরও। একথা সকলেই জানেন, ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে এসময়কালের প্রায় সব জেলার জেলা প্রশাসকগন, বিভাগীয় কমিশনারবৃন্দ ও উপজেলা নির্বাহী আফিসারগন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অংশের প্রতি কতটা অনুগত এবং ‘পার্টিজান’। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা রয়েছে । তারিক সালমান এর বাইরে ছিলেন বলে ধারনা তৈরী হয়েছে।

তার বিষয়ে ঘটনাক্রম এরকম; আগৈলঝড়ার ইউএনও থাকাকালীন একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকারী শিশুর আঁকা শেখ মুজিবের ছবি তিনি স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রনপত্রে ‘লোগো’ হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি ‘বিকৃত’ ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে- এমত অভিযোগে জেলা প্রশাসক তাকে শোকজ করেন। ইউএনও উত্তর দেন, যা জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অত:পর দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন বা আনা হয় একজন সাবেক বিএনপি নেতা, বর্তমান বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট ওবায়দুল্লাহ সাজুকে।

তিনি ইউনিও’র বিরুদ্ধে সিএমএম আদালতে মামলা ঠুকে দেন। বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে ‘হৃৎকম্পন’ হচ্ছিলো এবং যারপরনাই ব্যথিত হয়েছেন-অভিযোগে ওবায়দুল্লাহ আদালতকে জানান। সমন পেয়ে ইউএনও আদালতে হাজির হলে জামিনযোগ্য মামলায় তিনি জামিন পান নাই, সংক্ষিপ্ত হাজতবাসের দুই ঘন্টা পরে নাটকীয়ভাবে জামিন পান। শুরু হয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। প্রশাসন, ক্ষমতাসীন দল ও বিচার প্রশাসনের অনেক কুৎসিত তথ্য প্রকাশিত হতে থাকে।

পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সিভিল প্রশাসন ইউএনও’র ঘটনায় বিষ্ময় ও ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ত্বরিৎ হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী ইউএনও’র প্রতি এই আচরনে যুগপৎ  বিষ্মিত ক্ষুব্দতা প্রকাশ করেন। ক্ষমতাসীন দলও সচকিত হয়ে ওঠে। ‘এস্কেপ গোট’ হিসেবে ওবায়দুল্লাহ দল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত হন। বরিশাল ও বরগুনার জেলা প্রশাসকদ্বয়কে প্রত্যাহার করা হয় এবং সিএমএম আলী হোসেনের বদলির সুপারিশ সুর্প্রীম কোর্টে পাঠানো হয়।

বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে যে হৃৎকম্পন হচ্ছিলো তা কতটা বন্ধ হয়েছে জানা না গেলেও সাময়িক বহিষ্কৃত ওবায়দুল্লাহ ইউএনও’র বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিয়েছে। বরিশাল আওয়ামী লীগ ওবায়দুল্লাহ’র বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত স্বাগত জানিয়েছে, যদিও এর কোন মূল্য নেই। উল্টোটা হলেও তারা স্বাগত জানাতো। কারণ, বিশেষ একটি পরিবারের ‘ফ্রাঙ্কেনষ্টাইল’ ওবায়দুল্লাহ ও বরিশাল আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত হয় কাদের মাধ্যমে-ক্ষমতাসীনদের কেন্দ্রের তা অজানা নেই।

চার. ক্রমশ: অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র-সমাজে ইউএনও তারিক সালমানের ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের ত্বরিৎ প্রতিক্রিয়া সিভিল প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু অন্যান্য বিভাগ ও জনগনকে কতটা আশ্বস্ত করলো, সে প্রশ্ন থেকেই যাবে? কারণ, একজন ইউএনও যখন ব্যাংক ম্যানেজারকে প্রকাশ্যে চড়-থাপ্পড় মারছেন, সংসদ সদস্য শিক্ষককে কান-ধরে ওঠবস করাচ্ছে; একজন কলেজ শিক্ষক ফরিদউদ্দিনকে দিগম্বর করে রাজপথে ঘোরানো হচ্ছে এবং সহকারী কমিশনার শিক্ষককে লাঞ্চিত করছে কিংবা পুলিশ শিক্ষকদেরকে পেটাচ্ছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাবীতে মিছিলে নির্বিচারে ‘‘ব্যবস্থা’’ নেয়া হচ্ছে -এরকম ছবি বা খবর মিডিয়ায় অসংখ্যবার প্রকাশিত হলেও সকলে বেশ নির্লিপ্ত থাকছেন। পাঠক, এগুলো সামান্য কয়েকটি ঘটনা মাত্র, অনেকেই এর চেয়েও ঢেড় বেশী ঘটনার খবর রাখেন, তা সত্য বলে মানি।

অসহিষ্ণু সরকার, সংসদ সদস্যবৃন্দ, প্রশাসনযন্ত্র তথ্য প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারাকে ভালভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন। অতি বিতর্কিত এই আইনটি সরিয়ে দেয়ার কথা উঠছে, তবে দ্বিমতও আছে কর্তাদের। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯ ধারা মূলত: ৫৭ ধারার প্রায় অবিকৃত প্রতিস্থাপন। এসব আইনের চর্চায় সরকার হয়তো সুখ-স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে, কিন্তু জনগনের সুখ-স্বস্তি কেড়ে নিয়ে ক্রমশ: নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।

অতি সম্প্রতি শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে প্রশাসনের বিরোধ বা সখ্যতার প্রেক্ষাপটে প্রাক-নির্বাচনী বছরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম এবং নিকট ভবিষ্যতে এর প্রভাব তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য।