Home » অর্থনীতি » আনুষ্ঠানিক হিসেবেই দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৭০ হাজার

আনুষ্ঠানিক হিসেবেই দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৭০ হাজার

এক বছরেই কোটিপতি বেড়েছে সাড়ে ৬ হাজার :: বাড়ছে সীমাহীন বৈষম্য

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত অর্থবছরে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৬৮ হাজার ৮৯১ জন। এর আগের বছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৪১৮ জন। এক বছরেই কোটিপতি বেড়েছে ৬ হাজার ৪৭৩ জন। ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিলেন পাঁচজন। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ৪০-৫০ হাজার মানুষের কাছে ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশে আয়-বৈষম্য বেড়েছে। ধনী-গরিবের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট ফারাক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব তফসিলি ব্যাংকের কাছ থেকে প্রাপ্ত হিসাবের ভিত্তিতে যে প্রতিবেদন তৈরি করে, সেটাই কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। এটা শুধু কাগজে-কলমে এবং ব্যাংকে গচ্ছিত আর্থিক স্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অন্যান্য দিক ও সম্পদের বিবেচনায় এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন ব্যাংক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শুরুর ১০-১৫ বছর কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ধীরগতিতে। ১৯৯০ সালের পর থেকে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে দ্রুত গতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি অ্যাকাউন্টধারী ছিল মাত্র পাঁচজন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ জনে। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৯৮ জন। আলোচ্য সময়ে আমানতের পরিমাণ ছিল সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ১০ শতাংশ। এরপর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩ জনে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৪ জন।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬২ জনে। এরপর অক্টোবর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছিল ৮ হাজার ৮৮৭ জনে। অর্থাৎ এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার জনে। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরে অর্থাৎ ২০০৭-০৮ সালে বেড়েছিল ৫ হাজার ১১৪। এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালের মার্চে দেশে ব্যক্তিপর্যায়ে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট ছিল ১২ হাজার ৯১৭টি। ২০১৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৮৭টিতে। সে হিসাবে এ ৬ বছরে দেশে ব্যক্তিপর্যায়েই কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পায় প্রায় ২৭ হাজার ৭৭০টি। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২১৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০০৯ সালের মার্চে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলে ব্যাংকে কোটি টাকার ঊর্ধ্বে অ্যাকাউন্ট ছিল ১৯ হাজার ৬৩৬টি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৭২৭টিতে। সে হিসাবে ৬ বছরে দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় মিলে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পায় প্রায় ৩৫ হাজার। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৮ শতাংশ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে সব থেকে বেশি; প্রায় ৫৬ হাজার জন। এর মধ্যে আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩০ হাজার ৪৭৭ জন এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে ২৩ হাজার ৭৪৫ জন। এর কারণ হিসাবে তারা মনে করেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও গ্রাহক কারসাজি করে বেশকিছু বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করে। এরই প্রভাবে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে। এদিকে অতি ধনীদের সম্পদ নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা যুক্তরাজ্যভিত্তিক নাইট ফ্রাংক চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৬ : দ্য গ্লোবাল পারসপেক্টিভ অন প্রাইম প্রপার্টি অ্যান্ড ওয়েলথ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে কোটিপতি রয়েছেন প্রায় ১১ হাজার, যাদের নীট সম্পদ ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার (১০ লাখ ডলার) বেশি। এছাড়া হাজার কোটি টাকার নীট সম্পদের মালিক রয়েছেন ১৫ জন। তবে স্বীকৃত কোনো বিলিওনিয়ার বাংলাদেশে নেই।

একদিকে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (সিপিডি) বলছে, গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে সমাজের সবচেয়ে নিচের দিকের পাঁচ শতাংশের আয় মোট আয়ের দশমিক ২৩ শতাংশ। যেখানে ২০১০ সালে ছিল দশমিক ৭৮ শতাংশ। অপর গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। গত ৫ বছর ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের উপরে। কিন্তু এর সুফল সাধারণ জনগণের নাগালের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য দূরদর্শী সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিমালা নেয়া হয়নি। এতে বৈষম্য বেড়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণের হার কমেছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। ২০১০ সালে দেশের ১০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের মোট জাতীয় আয়ে ২ শতাংশ অবদান ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে তা কমে ১ দশমিক ০১ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্য দিকে ২০১০ সালে দেশের ১০ শতাংশ ধনী লোকের মোট জাতীয় আয়ে অবদান ছিল ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে তা বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফলে গরিব আরও গরিব হচ্ছে, বিপরীতে ধনীদের সম্পদ বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কর্মসংস্থানহীন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতির ভাষায় এটির অর্থ- সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়নি।

দেশে কোটিপতির অ্যাকাউন্ট বাড়ার অর্থ আমাদের সম্পদ ক্রমেই কিছুসংখ্যক লোকের হাতে কেন্দ্রীভ‚ত হয়ে পড়ছে। এতে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে। উন্নয়ন যা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই শহরকেন্দ্রিক। এ কারণে মুষ্টিমেয় কিছু লোক উন্নয়নের সুফল ভোগ করছেন। এতে নিচের দিকের মানুষ বরাবরই উন্নয়নবঞ্চিত থাকছেন। কোটিপতি আমানতকারী বাড়ার অর্থ হলো, টাকাওয়ালাদের কাছে ব্যাংকিং খাত জিম্মি হয়ে পড়ছে। এটা হয়েছে, কল্যাণ অর্থনীতির নীতি থেকে সরকারের সরে যাওয়ার কারণে। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকে অনুসরণ করছে। এই নীতিতে মূলত জোরজুলম করে, যেনতেন ও দুর্নীতি-লুটপাট করে অর্থ বানানো হয়। এখন বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে।