Home » অর্থনীতি » চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৬১ : সামরিক হুমকির মুখে চীন

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৬১ : সামরিক হুমকির মুখে চীন

আনু মুহাম্মদ ::

চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি শুধুবিশ্ব  বাণিজ্য নয় বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্যেও চাপ সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক সংকটে আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে চীন নিয়ে বিপরীতমুখি প্রবণতা। একদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতা, প্রধান বিনিয়োগকারী, প্রধান পণ্য যোগানদাতা হিসেবে বড় ভরসাস্থল অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক শক্তিবৃদ্ধি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার আধিপত্য সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। মার্কিন প্রশাসন থেকে তাই চীন সম্পর্কে দ্বিমুখি  ভূমিকা দেখা যায়।

দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের অধিকার দাবি নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় পৃষ্ঠপোষকতা আছে। দক্ষিণ চীন সাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দিয়েই মার্কিন বন্দর অভিমুখে ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমানের পণ্য পরিবহণ করা হয়। পূর্ব এশিয়া অভিমুখে বিশাল খনিজ-জ্বালানী সম্পদও এই পথ দিয়েই পরিবহণ করা হয়। মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মৎস্যসম্পদ ছাড়াও বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ আছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন। মার্কিন জ্বালানী বিষয়ক দফতরের হিসাব অনুযায়ী এই সাগর এলাকায় কমপক্ষে ১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আছে।[1]  এই অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যখন চীন চেষ্টা করছে তখন একই দাবি নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনেই, তাইওয়ানসহ অন্যরা। এই বিবাদ ও উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই সুবিধাজনক।

[1]http://www.cnbc.com/2015/10/12/chinas-military-and-naval-buildup-in-south-china-sea-threatens-the-us.html

২০১৫ সালে খুবই গোপনীয়তার সাথে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। মহড়ার মূল বিষয় ছিলো মালাক্কা প্রণালীতে চীনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে তেল, গ্যাস ও কাঁচামাল প্রাপ্তির পথ বন্ধ করা। এসব পরিকল্পনা সফল করতে ফিলিপাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সক্রিয় করা, জাপানকে যুদ্ধমুখি করা, দক্ষিণ কোরিয়াকে যুদ্ধ উত্তেজনার মধ্যে নিয়ে যাওয়াসহ সবধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটা নিছক ট্রাম্প প্রশাসনের বিষয় নয়, ওবামা প্রশাসনের প্রথম দফাতেই হিলারী ক্লিনটন এবিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। হিলারী ২০১০ সালেই বলেছিলেন, চীন যে দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্রাটলি দ্বীপের ওপর স্বত্তাধিকার দাবি করছে তা যুক্তরাষ্ট্রের নৌচলাচল ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এই দ্বীপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব ১২ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি।

২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে যুদ্ধখাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। শুধু ইরাকেই দশ লক্ষাধিক মানুষ নিহত এবং ১২ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে তার তুলনায় অনেক কম বাজেট হলেও চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয়বৃদ্ধি, নিত্য নতুন সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত হবার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে যতোটা উদ্বেগ তার চাইতে বেশি প্রচারণা দেখা যাচ্ছে। কংগ্রসে উত্থাপিত পেন্টাগন বা মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, চীন সামরিক খাতে ব্যয় এখন ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০ সাল নাগাদ তা ২৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট এখন ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ২০১৫ সালে পেন্টাগন তার সর্বশেষ ‘যুদ্ধ বিধি’ (Law of War Manual) প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, যেহেতু ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কোনো চুক্তিতে সই করেনি। সুতরাং পারমাণবিক অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বৈধ অস্ত্র।’

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা এবং অবরোধ জারির জবাবে তা ব্যবহারের হুমকি ঐ অঞ্চলে যুদ্ধ উত্তেজনা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ভর করে বিপুল যুদ্ধ সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। তবে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি অনেক দিন থেকেই ক্রমে ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মার্কিন এই প্রস্তুতিতে উত্তর কোরিয়া নিছক উপলক্ষ, চীনই প্রধান লক্ষ।

বিশ্ব বিখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা জন পিলজার সর্বশেষ যে তথ্যচিত্র বানিয়েছেন তার নাম ‘চীনের বিরুদ্ধে অত্যাসন্ন যুদ্ধ (The Coming War on China)।’ তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেনও। [2] তিনি জানিয়েছেন, এই তথ্যচিত্রের তথ্য উপাত্ত সন্ধান ও প্রয়োজনীয় গবেষণা করতে তিনি দুইবছর সময় নিয়েছেন। তিনি দেখেছেন, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সবচাইতে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন ঘিরে। সর্বশেষ হিসাবে চীন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এখন ৪০০টি সামরিক ঘাঁটি সক্রিয় রয়েছে। এসব ঘাঁটিতে মিসাইল, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক অস্ত্রসহ বিপুল অস্ত্রশস্ত্র মজুত আছে। বর্তমান মার্কিন সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স (প্রতিরক্ষা মন্ত্রী) বলেছেন, ‘মার্কিন নীতি হলো তাদেরকে দমন করা- যারা মার্কিন আধিপত্য কেড়ে নিতে চায়।’

2https://newint.org/features/2016/12/01/the-coming-war-on-china/