Home » বিশেষ নিবন্ধ » ‘মাদকের মূল হোতারা চিহিৃত হচ্ছে না, তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে’ : সুলতানা কামাল

‘মাদকের মূল হোতারা চিহিৃত হচ্ছে না, তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে’ : সুলতানা কামাল

এ্যডভোকেট সুলতানা কামাল, বিশিষ্ট মানবাধিকার সক্রিয়বাদী এবং দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকান্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দুর্নীতিবিরোধী নজরদারী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর চেয়ারপারসন এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে সুলতানা কামাল বিস্তারিত মূল্যয়ন করেছেন আমাদের বুধবারের সাথে এক সাক্ষাতকারে।

আমাদের বুধবার : মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে যুদ্ধ আইন-শৃংখলাবাহিনী চালাচ্ছে সেটিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ণ করেন?

সুলতানা কামাল : মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে কথা আইন-শৃংখলাবাহিনী থেকে বলা হচ্ছে, সেটি যদি সত্যি সত্যিই ওয়ার অন ড্রাগস হয়ে থাকে, তবে সে ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। মাদক যে কত ক্ষতিকর হতে পারে এবং একটি জাতিকে কীভাবে অবক্ষয়ের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে, সে সম্পর্কে সবার কিছু না কিছু ধারণা রয়েছে। কাজেই এটি একটি জরুরি বিষয়। রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব এর সমাধান করার এবং যাতে করে সমাজে মাদক ঢুকে যেতে না পারে বা বিস্তৃতি লাভ করতে না পারে। হয়তো মাদককে একেবারে নিমূর্ল করা যাবে না, কিন্তু অবশ্যই এক্ষেত্রে একটি নিয়ন্ত্রিত অবস্থানে আমরা পৌঁছাতে পারি। কথা হচ্ছে সেই যুদ্ধটা কোন পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। আমি বলছি বলে না, মানবধিকারের কতগুলো শর্ত আছে। যে শর্তগুলো প্রতিটি রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। যেকোনো সভ্য রাষ্ট্র মানবধিকারের এ শর্তগুলোকে সম্মান করে। মানুষকে তার অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তার যে শাস্তি প্রাপ্য তার বাইরে কোনো কিছু প্রদান বা আদালতের যে শাস্তি প্রদান করার কথা, তারা ছাড়া অন্য কেউ শাস্তি দিতে পারেন না। এটি আমাদের সংবিধানের ৩১ থেকে ৩৫ ধারার মধ্যে সুষ্পষ্ট ভাষায় লিপিবদ্ধ আছে। আমরা সে জন্যই যে পদ্ধতিতে ‘তথাকথিত বন্দুক যুদ্ধে’র নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, আজ পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন এ হত্যাকান্ডের স্বীকার হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে কাহিনী একই। অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদেরকে পুলিশ বা র‌্যাব ধরতে গেছে, তারা আক্রমণ করেছে, আইন-শৃংখলাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে তারা মৃত্যু বরণ করেছে। ঠিক অবধারিতভাবে যারা আক্রমণ করছে তারা পাল্টা আক্রমণে মৃত্যু বরণ করছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের কারো কারো পরিবার অভিযোগ করেছে তাদের কিছুদিন আগে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি সাজিয়ে বন্দুকযুদ্ধে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

আমাদের বুধবার : এটি মানবধিকারের কতটা বিপক্ষে?

সুলতানা কামাল : এটি মানবধিকারের একেবারেই বিরুদ্ধে। মানবধিকারের মূল কথা হলো, প্রাণের অধিকার অ্যাবসিলিউট; এটি কেউ নিতে পারে না, হজম করতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রও এটি করতে পারে না। রাষ্ট্র যদি প্রাণের অধিকার হরণ করে, তবে সেটিও একটি অপরাধ। কিছু কিছু রাষ্ট্র শাস্তি হিসেবে  মৃত্যুদন্ড রেখে দিয়েছে, সেটি নিয়েও কথাবার্তা চলছে। যদি  মৃত্যুদন্ড বাংলাদেশে শাস্তি হিসেবে থেকে থাকে, তবে সেটিই শাস্তি। এ শাস্তিটি হবে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, সেই অপরাধের শাস্তি যদি  মৃত্যুদন্ড হয়, তখন  মৃত্যুদন্ড হবে। সেটিকে আমরা আইনবর্হিভূত হত্যা ঘটাতে পারি না। আমরা সেটি অপছন্দ করি। কিন্তু এখন যে ঘটনাটি ঘটছে সেটি আইনবর্হিভূত ও সংবিধান বর্হিভূত। এটি পুরোপুরো মানবধিকার বিরোধী।

আমাদের বুধবার : মাদক বিরোধী অভিযানে মূল হোতারা কী ধরা পড়ছে এবং তাদের কোন শাস্তি হচ্ছে বলে কী আপনি মনে করছেন?

সুলতানা কামাল : পত্রপত্রিকায় যে বিশ্লেষণ এসেছে এবং যারা অপরাধ-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তাদের কাছ থেকে যে মতামত এসেছে- তাতে এ শঙ্কাটাই প্রকাশ করা হচ্ছে যে, যেসব তালিকা এসেছে তাতে হয়তো যারা মাদক ব্যবসার হোতা তাদের নামও আছে, কিন্তু তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। বিচারের আওতায় না আনা গেলে, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে প্রশ্ন এবং জেরা করা প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গেলে, আসলেই একটি মানুষ যে  প্রমাণিত অপরাধী তা বোঝা যায় না। শঙ্কা যেটি প্রকাশ করা হচ্ছে তা হলো, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত মূল হোতারা চিহিৃত হচ্ছে না, তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। সাধারণ চোখে সবাই দেখছেন এরা আসলে মাদকের হোতা; কিন্তু মাদকের আসল হোতাদের যে নামগুলো সামনে  রয়েছে তাদেরকে ধরা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নাই বলে তাদের ধরা হচ্ছে না। এসবের কারণে যে কর্মকান্ড এখন পরিচালিত হচ্ছে তা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।

আমাদের বুধবার : ফিলিপাইনে মাদক বিরোধী যুদ্ধ চলছে বেশ কিছু সময় ধরে। ১২ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এতে সমাজের দরিদ্র্য ও নিম্নবর্গের  মানুষ নিহত হচ্ছে এবং পুরো বিষয়টিকে তারা বলছেন, এটি সমাজে এতিম ও বিধবা সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরেকটি দিক বলা হচ্ছে, ফিলিপাইনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য এ অভিযানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ অভিজ্ঞতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? 

সুলতানা কামাল : ফিলিপাইনে যে ঘটনা ঘটছে সেটি অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমনকি বিমানে তুলে নিয়ে ফেলে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। আমি আশা করব, সেরকম বর্বরতার মধ্যে আমরা যাব না। আমরা যে পর্যায়ে রয়েছি সেটি মানবধিকারের দৃষ্টি থেকে কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। আমরা বারবারই বলছি, সাংবিধানিক উপায়ে এ সমস্যারগুলোর সমাধান করা উচিত। ফিলিপাইন সরকারও জোর গলায় দাবি করতে পারে না যে, এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে তারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। আমরা লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতাও জানি, সেখানেও এ ধরনের অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যেগুলো এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের কার্যকর ফল দিয়েছে বলে আমরা শুনিনি। কাজেই আমি আশা করি, বাংলাদেশ এত দূর পর্যন্ত যাবে না। এতদিন তারা যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে সেটি তারা পুনর্বিবেচনা করবে। কিন্তু আমরা আশা করব, বাংলাদেশের যে সংবিধান রয়েছে, যে আইন-কানুন রয়েছে তার মধ্যে থেকেই আইন-শৃংখলাবাহিনী মাদক বিরোধী যুদ্ধ পরিচালনা করবে।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি ভূখন্ড দখল করার যুদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম কিছুটা আবশ্যিক ভিত্তিতে। সেটি আবশ্যিক ভিত্তির মধ্যে একটি ছিল মানুষের মানবধিকার কখনো হরণ করা হবে না। মানুষকে কখনো অন্যায়ভাবে অবিচারের মধ্যে ফেলা হবে না। নির্যাতন করা হবে না। কাজেই সেসব ব্যাপারে রাষ্ট্রের একটা সাবধানতা অবলম্বন করার নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আমাদের বুধবার : বাংলাদেশে ইতোপূর্বেও বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড ঘটেছে। এটিকে কী তাহলে আবার নতুন নামে ডাকা হচ্ছে ?

সুলতানা কামাল : যৌথবাহিনী থেকে শুরু করে অপারেশন ক্লিন হার্ট প্রতিটিতে আমরা মানুষের মৃত্যু দেখেছি। মানুষ হার্ট ফেল করে মারা যাচ্ছিল, আমরা ক্রয়ফায়ারের গল্প শুনেছি। আমরা এনকাউন্টার শুনেছি, শুট আউট শুনেছি। এখন বলা হচ্ছে বন্দুক যুদ্ধ। প্রতিটির ক্ষেত্রে কাহিনী একই। যারা এ কাজটি করছেন গণমাধ্যমের মাধ্যমে তাদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, তারা আমাদের যে কাহিনীগুলো বর্ণনা করছেন এবং জোর গলায় বলার চেষ্টা করছেন এটিই ঘটছে তারা যখন রাতে একা ঘুমাতে যান কিংবা আয়নায় নিজের মুখটা দেখেন তারা নিজেদেরও এ গল্পগুলো বিশ্বাস করাতে পারেন কিনা?

আমাদের বুধবার : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ