Home » প্রচ্ছদ কথা » মাদক যুদ্ধ : ক্রসফায়ারেই কী সমাধান ?

মাদক যুদ্ধ : ক্রসফায়ারেই কী সমাধান ?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ম্যানিলা সিটির কার্টিলো রামিরেজের মর্ত্যে উচ্চারিত শেষ শব্দটি ছিল “দৌড়াও”। এই চিৎকারই তার স্ত্রীর ভিক্টোরিয়ার প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু কোন সুযোগই পায়নি রামিরেজ। মুখোশধারী ছয় মোটরসাইকেল আরোহীর গুলি তাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। আলোকোচ্ছটায় বর্ণিল ম্যানিলায় তখন ১১ ডিসেম্বর ২০১৭’র রাত। ঠিক এক সপ্তাহ পরে তার একমাত্র কন্যা স্বামীসহ নিহত হয় ক্রসফায়ারে। এই খন্ডচিত্রটি ফিলিপাইনে চলতে থাকা ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর।

‘চরমপন্থী ’ প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতার্তের ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য শুরু হওয়া “ওয়ার অন ড্রাগস” বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এরকম ভয়াবহ চিত্র এখন সারা ফিলিপাইনের নিত্যদিনের ঘটনা। সস্ত্রীক চাল কিনতে বাজারে যাওয়া রামিরেজ মাদক কারবারী ছিলেন কিনা তা প্রমানের আগেই পরিবারশুদ্ধ তাকে হত্যা করা হয়। ম্যানিলার দরিদ্র অধ্যূষিত এলাকাগুলিকে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-র  মূল্য দিতে হচ্ছে এভাবেই, জীবন দিয়ে।

অভিযোগ, তদন্ত এবং বিচার-সবই করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মারছে শত শত মানুষ। এর মধ্যে দুতার্তের প্রতিপক্ষরা রয়েছে, এমনকি মিন্দানাও শহরের মেয়র পর্যন্ত রয়েছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোষ্ট -এর ২০ জানুয়ারি’১৮ এবং ২০১৭-র ১৬ নভেম্বর সংখ্যার বিশেষ রিপোর্টের ভাষ্যে বলা হয়, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দুতার্তে সৃষ্টি করছেন ‘একটি এতিম জেনারেশন’- যা আগামীতে ফিলিপাইনে চরমপন্থা উস্কে দিতে পারে, কারণ হত্যাকান্ড শুরু হলে তার বিস্তৃতিই কেবল ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ চলছে অনেকটা ফিলিপিনো ষ্টাইলে। ‘আমরা জঙ্গীবাদ রুখে দিয়েছি। এখন আমরা দেশকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে চলেছি’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র এই বক্তব্য জানান দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকার অবশেষে জঙ্গীবাদ দমনের মত কঠোর অবস্থানে। তার পরিনাম আমরা দেখছি, কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে ইতিমধ্যে নিহতের সংখ্যা শ’ ছুঁতে চলেছে। অভিযান কতদিন অব্যাহত থাকবে সেটি পরিস্কার নয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাষ্যমতে, অভিযোগ এবং প্রমান থাকলে সংসদ সদস্য বদি’রও রেহাই মিলবে না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায় এক্ষেত্রেও অভিযোগ, তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার সর্বগ্রাসী। টাকার অংকে তো বটেই, সংখ্যায়, পরিমানে মাদক এখন মহামারী। কিশোর-তরুণদের বড় অংশ মাদকের কবলে। এর কারবার এতটাই অনিয়ন্ত্রিত এবং সর্বগ্রাসী যে, সরকারকে বন্দুকযুদ্ধে এর সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। এতে যারা নিহত হচ্ছেন তারা মূলত: ‘ক্যারিয়ার’ বা ‘পুশার’ এবং ‘এ্যডিক্ট’। কমন ব্যাক-গ্রাউন্ড হচ্ছে, কম-বেশি হতদরিদ্র পরিবারের কিশোররা চুরি-চোট্টামি, ছিঁচকে চুরি-ছিনতাই থেকে একসময় ভিড়ে গেছে মাদক কারবারে, কাজ করছে ড্রাগ চেইনের ‘লিংক’ হিসেবে। যে চেইনের শীর্ষে অমিত ক্ষমতাধররা।

বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্ত পথে বাংলাদেশে মাদক ঢুকছে কিভাবে? সরবরাহ উৎসপথে আটকে যাচ্ছে না কেন? এর মূল কারন হচ্ছে, চোরাচালানের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আর এই কালো অর্থনীতি গ্রাস করছে সরকারের দায়িত্ববানদের। ঠেকানো যাদের দায়িত্ব, তারাই মাদক সরবরাহ নিশ্চিত করছেন। কারন তারা এই কারবারের অংশীজন। এইজন্যই সারাদেশ জুড়ে মাদকের বিস্তার।

বহুল উচ্চারিত মাদক ইয়াবা থেকে আয়কৃত টাকার পরিমান কেমন? ভিমরি খাওয়ার মত তথ্য আছে। মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের হিসেব মতে,  মিয়ানমার থেকে বছরে বাংলাদেশে ৮০ কোটি পিস যার মাথাপিছু বরাদ্দ ৫ পিস। এর বাজারমূল্য কমপক্ষে ২৪ হাজার কোটি টাকা, অথচ দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য ৬’শ কোটি বেশি নয়। মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা বিতাড়নেই বাংলাদেশকে বিপদে ফেলেনি, ইয়াবা সরবরাহ করেও বিপদে ফেলেছে। এর সাথে জড়িত  উভয় দেশের অসৎ রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্য  ও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী (বিজিপি)।

কিছু সূত্র ধরিয়ে দেয়া যাক। বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নায়েক রাজ্জাককে মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশের সীমানা থেকে ২০১৬ সালে। তখন স্বরাষ্ট প্রতিমন্ত্রী, (এখন পূর্ণমন্ত্রী) বলেছিলেন, সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে এটি ঘটেছে। নয় দিনের মাথায় নায়েক রাজ্জাক ফেরত আসার পরে বিজিবি মহাপরিচালক সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, এটি ভুল বোঝাবুঝির কারনে নয়। হাবিলদার লুৎফরের বদলে নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিজিপি মহাপরিচালকের ভাষ্যে সে সময় জানা গিয়েছিল, ২০১৪ সালের ২৭ মে বিজিপি’র গুলিতে নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় নিহত হয়েছিলেন বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমান। ইয়াবা পাচারের  এই রুট থেকে প্রচুর ইয়াবা আটক করা হয়েছিল। একবছর পর নায়েক রাজ্জাক নাফনদীর এলাকা থেকে ১২ লাখ পিস ইয়াবা  আটক করেন। এইজন্যই তাকে অপহরন করা হয়। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, ইয়াবা চোরাচালানে কারা, কিভাবে যুক্ত এবং বিজিবি’র সৈনিকদের হত্যা, অপহরণের পেছনের মূল কারণও ইয়াবা ব্যবসা।

গত ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই রোহিঙ্গা সলিডারিটি নেতা হাফেজ সালাহ উল ইসলাম বৈঠক করছিলেন সৌদি নাগরিক আহমেদ সালেহ আল তান্দী’র সাথে টেকনাফের একটি বাড়িতে। বৈঠকটি হচ্ছিলো ২৬ কোটি টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। বৈঠকরত অবস্থায় বাড়ির মালিক মাওলানা সৈয়দ করিমসহ সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরপরই ঘটনাস্থলে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেন গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেবার জন্য। পরে অবশ্য বিজিবি মহাপরিচালকের বরাতে প্রথম আলো’র খবর: আরএসও নেতা ও সৌদি নাগরিকের সাথে বৈঠকে বদির সংশ্লিষ্টতা নেই।

আরএসও নেতা হাফেজ এখন বাংলাদেশী ভোটার ও পাসপোর্টধারী। ২০১৩ সালেও সে গ্রেফতার হয়েছিল। সংসদ সদস্যের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন বলে কথিত এই হাফেজ ইয়াবা, অস্ত্র ব্যবসা এবং মানব পাচার ও জঙ্গী অর্থায়নে যুক্ত। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী পাসপোর্টে মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে পাঠানোর নেপথ্যের ব্যক্তিও এই হাফেজ। এসব অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। তারপরেও রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা এসব বিষয় জানেন না, এটি বিশ্বাস করা কঠিন।

অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের ক্ষমতাবানরা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি ‘অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেট’। অভিযোগ রয়েছে, এটি নিয়ন্ত্রন করছেন একজন সংসদ সদস্য ও মিয়ানমারের কয়েকজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা। আর এই চোরাচালান ঠেকাতে গিয়ে বলি হচ্ছেন বিজিবি’র সদস্যরাও। নিহত, অপহৃত হয়েও ঠেকাতে পারছেন না মাদকের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইয়াবা চোরাকারবার সিন্ডিকেটটির নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী এবং জড়িতদের একাধিক তালিকা তৈরী করেছিল বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা। ২০১৩-১৪ সালে করা তালিকার শীর্ষে ছিলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য। তার পাঁচ ভাইসহ তালিকায় ছিল টেকনাফ যুবলীগ নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অনেকেরই নাম। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্টমন্ত্রী মাদকবিরোধী সপ্তাহের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে সাথে নিয়ে। সে সময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসার সাথে বদি’র সম্পৃক্ততা নেই”। সেই তিনি এখন বলছেন, ‘বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, প্রমান নেই’।

গত বছর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বসবাস, ভোটার তালিকায় অর্ন্তভূক্তি পাসপোর্টের ব্যবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গমনাগমন, স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহন-সব ব্যবস্থাই করছে ক্ষমতাবানরা¡। এ যেন সরকারের ভেতরে আরেক সরকার । এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে ক্ষমতাবলয়, হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ও অস্ত্র ব্যবসা এবং এর সাথে উগ্রবাদী তৎপরতা মিলে-মিশে একাকার।

সারাবিশ্বের মত বাংলাদেশেও ড্রাগ বা মাদকের ব্যবসা চলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। বিশেষ করে মৌলবাদী এবং জঙ্গী দলগুলোর অর্থের অন্যতম উৎস মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা। অবৈধ এই ব্যবসা চালু রাখতে জঙ্গী-মৌলবাদী এবং শাসকশ্রেনীর ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ ব্যক্তির সাথে গড়ে ওঠে অশুভ আঁতাত। দশকের পর দশক ধরে ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল শীর্ষে ছিল। বছর কয়েক হলো সেটি এখন ইয়াবার দখলে। এজন্য বদলে গেছে চোরাচালানের রুট এবং ধরণ। কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি বদলায়নি।

মাদক ব্যবসার গোড়াশুদ্ধ উপড়ে ফেলা এবং যেকোন মূল্যে সিন্ডিকেট ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা আছে কিনা সেটি কেউ জানে না। মাদক কারবারের মূলস্রোত অক্ষুন্ন রেখে মাঠ পর্যায়ে সরবরাহকারীদের বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার কতটা সমাধান বয়ে আনবে ? কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে এডহকভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরেক দফা উস্কে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ কারবার বন্ধে এডহক ভিত্তিতে বন্দুকযুদ্ধের সূচনার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। গত শতকের সত্তর, আশি দশক এবং এর পরেও মেক্সিকো, কলম্বিয়া, বলিভিয়ায় এবং অধূনা ফিলিপাইনে পরিচালিত ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষ ও কমিউনিষ্ট নিধন। যা আসলে ওইসব দেশে মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে পারেনি ও করেওনি। যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচারে বাংলাদেশ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের আইনের সবশেষ সুযোগ দিয়ে বিচার নিশ্চিত করেছিল।

তাহলে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা কথিত আত্মরক্ষার্খে হত্যা হয়তো সাময়িক উপশম, কিন্ত দীর্ঘমেয়াদে?