Home » আন্তর্জাতিক » মাহাথির কী পারবেন প্রতিশ্রুতিপূরণ করতে?

মাহাথির কী পারবেন প্রতিশ্রুতিপূরণ করতে?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ::

মালয়েশিয়ায় নির্বাচনের ফলাফল সাধারণভাবে অনুমান করা যেতো। সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে পর্যন্ত ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গ্যানাইজেশন (আমনো) ও কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত জোটটি সেই ১৯৫৫ সাল থেকে জিতে আসছিল। ক্ষমতায় থাকার জন্য বছরের পর বছর ধরে আমনো সম্ভাব্য সব ধরনের কৌশল প্রয়োগ করেছে। কখনো তারা দেশটির জাতিগত গ্রুপগুলোর মধ্যকার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উস্কে দিয়েছে, কখনো সমালোচকদের জেলে ঢুকিয়েছে, কখনো নির্বাচনে কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে, কখনো ভোটারদের ঘুষ দিয়েছে, লোকরঞ্জক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কিংবা হেরে গেলে অশান্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে। গত ৯ মে অনুষ্ঠিত নির্বচানের সময়ও তারা এই কৌশলগুলোর সবই প্রয়োগ করেছে। কিন্তু তারপরও নাজিব রাজাকের সরকার বিরোধী দলের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগে ছিল। মালয়েশিয়ার ভোটারদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদায় ঘটে, বিরোধী জোট খুব সহজেই জয়ী হয়। আর এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ায় সরকার পরিবর্তন ঘটল।

যে দেশে রাজনীতি সবসময় সাম্প্রদায়িক নীতিতে পরিচালিত হয়, সেই দেশে জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকার পরিবর্তন বিশাল একটি ঘটনা। যে অঞ্চলের সহজাত স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে থাকেন, সেখানে গণতন্ত্রের বিজয় বিরাট কিছু। আর যে নাজিব মালয়েশিয়ার সরকারি সংস্থা থেকে ব্যক্তিগতভাবে ৬৮১ মিলিয়ন ডলার লুট করেছেন বলে মার্কিন বিচার দফতর অভিযোগ করেছে, তার জন্য এই ফলাফল একটি বেশ বড় ধরনের চপেটাঘাতই ছিল।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতা ও গণতন্ত্রের বিরল উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই মালয়েশিয়ার নামটি উচ্চারিত হয়ে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ক্রমাগতভাবে অন্যায় কৌশলের আশ্রয় নেওয়ায় এবং দেশটির মালয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের ক্ষমতায় বহাল রাখার জন্য প্রবল উন্মাদনা সৃষ্টি করায় এই উভয় কৃতিত্বই ম্লান হয়ে পড়েছিল। এখন নতুন সরকারের বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে সত্যিকারের পরিবর্তন কতটা ঘটে।

সংশয়বাদীরা বলছেন, ক্ষমতায় থাকার জন্য নাজিব যেসব নোংরা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, সে সবের উদ্ভাবক ছিলেন আমনো থেকে পাঁচবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এই মাহাথির মোহাম্মদই। এই ডা. মাহাথিরই মালয়েশিয়ায় ঘৃণ্য বর্ণবাদী বিভেদনীতির প্রচার করেছিলেন, যাতে মালয় ভোটাররা আমনোর প্রতি অনুগত থাকে। আরো বড় বিষয় হলো, পাকাতান হারাপান নাম দিয়ে গঠিত যে জোটটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে, তারাও কিন্তু আমনোর নির্বাচনী-জালিয়াতি ঠেকাতে লোকরঞ্জক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। তারা অজনপ্রিয় কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পণ্য-পরিষেবা কর প্রত্যাহার এবং নাজিবের প্রত্যাহার করা পেট্রোলে ভর্তুকি পুনর্বহাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

নতুন সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের নেপথ্যে আরেকটি বিষয় কাজ করেছিল তা হলো আমনোর দলছুট ও সরকার পরিচালনায় তুলনামূলক সামান্য অভিজ্ঞতা থাকা বর্ষীয়ান বিরোধী রাজনীতিবিদদের নিয়ে বিশালাকারের জোট গঠন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলা যায় মাহাথির মোহাম্মদের সাথে আনোয়ার ইব্রাহিমের আঁতাতের কথা। একসময় আনোয়ার ইব্রাহিম ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী। তিনি তখন ছিলেন মাহাথিরের স্নেহধন্য। কিন্তু পরে তার বিরাগভাজনে পরিণত হন। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা পায়ুকামের অভিযোগ এনে জেল ঘাটিয়েছিলেন মাহাথির। যে দলগুলো নিয়ে পাকাতান হারাপান গঠিত, তার নেতা হলেন এই আনোয়ার ইব্রাহিম। নাজিব যদি তাকে আবারো জেলে না পুরতেন, তবে ৯২ বছর বয়স্ক মাহাথিরের বদলে তিনিই হতেন এখন প্রধানমন্ত্রী। ডা. মাহাথির ও আনোয়ার ইব্রাহিম যদিও দাবি করেছেন, তারা তাদের আগের বিবাদ মিটিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু তবুও পরিষ্কার নয়, কারামুক্ত আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে মাহাথির কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন।

এতসব সংশয়, সন্দেহের পরও কল্পনা করা কঠিন, আমনোর পরাজয়ের পরও মালয়েশিয়া আরো ভালো পথে এগিয়ে যাবে কি না। নতুন ক্ষমতাসীনদের জন্যই প্রয়োজন নির্বাচনীব্যবস্থাকে আরো সুষ্ঠু করা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে একটি ইতিবাচক দিক হলো, ভোটাররা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে আমনোর মালয় উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং কট্টর ইসলামপন্থী পাসের, তারা পাকাতান হারাপানে যোগ দেয়নি, আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। আমনোর ক্ষমতায় থাকার সময় নতুন এমপিদের অনেকেরই নানা ধরনের সরকারি পক্ষপাতিত্বের শিকার হতে হয়েছে। ওই অভিজ্ঞতার আলোকে তারা আমলাতন্ত্রকে আরো নিরপেক্ষ করতে চাইবেন। মালয় ভোটারদের বিপুল ভোটারের কারণে তাদেরকে এড়িয়ে যাওয়া খুবই কঠিন কাজ। তবে পাকাতান হারাপান সম্ভবত তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কিছু অংশ হলেও পূরণ করে আমনোর দোসরদের দুর্নীতি উদঘাটন করবে। জোটটি ওয়াদা করেছিল, তারা নাজিবের বিরুদ্ধে থাকা কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে রাজনীতিকে কুলুষতামুক্ত করতে সহায়তা করবে।

সম্ভবত নতুন সরকার অর্ন্তদ্বন্দ্ধ সামাল দিতে পারবে না, খুব বেশি কিছুও করতে পারবে না। কিন্তু তবুও তারা যদি কেবল টিকেও থাকে, তবুও মালয়েশিয়ার জনসাধারণ ও তাদের প্রতিবেশীদের মনে করিয়ে দেবে যে মাঝে মাঝেই শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের পরিবর্তন হওয়া দরকার। কম্বোডিয়ান, সিঙ্গাপুরিয়ান, থাই ও ভিয়েতনামিরাও হয়তো চিন্তা করবে, ভাগ্য সহায় হলে একই ধরনের ঘটনা তাদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। (ইকোনমিস্ট অবলম্বনে)