Home » অর্থনীতি » রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-১ : ডাক্তার রোগী তত্ত্ব ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-১ : ডাক্তার রোগী তত্ত্ব ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

অরুন কর্মকার ::

‘রূপপুর আজ পরচিতি নাম/ বিশ্বের দরবারে পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ/ বাঙালিও আজ পারে/’

এটি একটি ছড়ার অংশবশিষে। ছড়াটির রচয়তিা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী প্রকৌশলী ইয়াফেস ওসমান। ছড়াকার হিসেবে তিনি যথেষ্ট প্রসদ্ধি। তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে তিনি শুধু ছড়া লেখেননি। অনেক ‘স্মরণীয়’ উক্তিও করেছেনে। তার একটি হচ্ছে- আমরা (বাংলাদেশে)  রোগী। আর রাশিয়া হচ্ছে ডাক্তার। রোগী ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। এখন ডাক্তার যে প্রেসক্রিপশন দেবে রোগী সে অনুযায়ীই চলবে।

এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেনে যে, পারমাণবকি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্থাপনের বিষয়ে বিন্দু বির্সগও আমরা জানি না। আর রাশিয়া হচ্ছে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তাই আমরা রাশিয়ার শরণাপন্ন হয়েছি। এখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সব কিছুই (এ টু জেড) রাশিয়ার পরার্মশমত, রাশিয়ার লোকোবল দিয়ে, রাশিয়িার প্রযুক্তি ব্যবহার করে, রাশিয়ার দেওয়া ঋণের অর্থে এবং রাশিয়ার পরিচালনায় বাস্তবায়তি হবে। তাই এই প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তা করার কিছু নেই।

শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন মহলে যখন প্রকল্পটির প্রযুক্তি, জনবল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যয়, নিরাপত্তা প্রভৃতি নিয়ে কথার্বাতা শুরু হয়, তারই এক পর্যায়ে তিনি ওই উক্তটি করেন। তারপর অনেক পথ হাঁটা হয়েছে। প্রস্তুতির পর্যায় থেকে পায়ে পায়ে প্রকল্পটি পৌঁছে গেছে বাস্তবায়নের পর্যায়ে। প্রকল্পটিকে এই পর্যায়ে পৌছাতে মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানকে নিশ্চয়ই অনেক কাজ করতে হয়েছে। ধরে নেওয়া যায় যে তিনি একজন রোগী হিসেবে, একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরার্মশে নিশ্চিন্তেই সে সব করেছেন এবং প্রকল্প নিয়ে নিশ্চিন্তেই আছনে।

তবে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত থাকার লোক বিরল। কারণ এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি। তাছাড়া, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধুমাত্র প্রযুক্তির বিষয় নয়। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে পারমানবি তেজস্ক্রিয় র্বজ্য ব্যবস্থাপনা, জননিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার দায় (নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি), আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সর্বোপরি ব্যবসা। এই প্রকল্পে ক্রেতা-বিক্রেতা আছে, যথাক্রমে বাংলাদেশ ও রাশিয়া। রাশিয়া সব কিছু করে দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয়সহ সব দায় বাংলাদেশের। এটাই আন্তর্জাতিক আইন।

তাই বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। থাকা সঙ্গতও নয়। এমনকি যুক্তির খাতিরে ডাক্তার- রোগী তত্ত¡ মেনে নিলেও রোগীকে কিছু জিনিস বুঝতে হয়। যেমন ডাক্তার যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন, ফার্মেসী থেকে সে অনুযায়ীই ওষুধগুলে দেওয়া হচ্ছে কি না। ডাক্তার যে কোম্পানির ওষুধ লিখিছেনে ফার্মেসী থেকে কি সেটাই  দেয়া হচ্ছে, না কি অন্য কোম্পানীর নিম্নমানের ওষুধ গছানো হচ্ছে। ওষুধগুলো ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করেছে কি না এ বিষয়গুলো না বুঝলে  রোগীর সমস্যা হবেই।

এখন প্রশ্ন হল, রোগী হিসেবে বাংলাদেশ রাশিয়ার দেওয়া প্রেসক্রিপশন ঠিকঠাকভাবে বুঝে ওষুধ ব্যবহার করতে সর্মথ কি না। ভারতের তামিলনাড়– রাজ্যের কুদনকুলমে একটি পারমাণবকি বিদ্যুৎকেন্দ্রে করেছে রাশিয়ার। ওই কেন্দ্রেরে একটি ইউনিটের নির্মাণকাজ যখন শেষ পর্যায়ে তখন ভারতের পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বিজ্ঞানীরা ইউনিটটির যন্ত্রপাতিসহ সব কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন। তাতে বড় ধরনের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে।

ভারতের বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় উদ্ঘাটিত হয় যে, ইউনিটটির কয়েকটি র্স্পশকাতর স্থানে যে মানের ইস্পাত ব্যবহার করার কথা ছিল, তার চেয়ে নিম্নমানের ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে। চারটি পাম্পে ত্রুটিপূর্ণ বাল্ব ব্যবহার করা হয়েছে। এই রকম আরও কিছু ত্রু টি উৎঘাটন করার পর রাশিয়া তা পরির্বতন করে দিতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি মালামাল কেনার দায়িত্বে রাশিয়ার যে র্কমর্কতা ছিলেন, তাঁকে চাকরিচ্যুত করেছে।

এখানে বিষয়টি দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের। তাই প্রশ্ন হলো- ভারতরে মতোও জনবল আমাদের আছে কি না- যারা রাশিয়ার দেওয়া সব কিছু যথাযথভাবে বুঝে নিতে সক্ষম। এক কথায় জবাব হল, নেই। একদিকে জনবল নেই, তার ওপর আমরা রোগী হিসেবে ডাক্তারের পরার্মশ মত চলার জন্য মনস্থরি করে রেখেছি। এই অবস্থায় আমরা কোথায় যাব তা আসলেই যথেষ্ট ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পরমাণু প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল। র্দীঘ ৩০ বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে র্কমজীবন শেষে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেনে। তিনি বলেছেন, একটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তিনটি জিনিস সমানভাবে গুরুত্বর্পূণ। এর প্রথমটিই হলো জনবল। র্অথাৎ প্রস্তুতি ও নির্মাণ পর্যায়ের কাজর্কম তদারক করার মত জনবল আপনার আছে কি না। যদি না থাকে, আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। অন্যপথও একটা আছে, সেটা হল বিখ্যাৎ কোনো পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে পরার্মশক নিয়োগ করা। বাংলাদেশে এর কোনোটাই না করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণ শুরু করেছে।

জনবল : পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জনবল মানে শুধু ‘রিঅ্যাক্টর অপারেটর’ নয়। অনেকে বলেন যে, আমরা তো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনবল তৈরি করছি। কিন্তু এটাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জনবল নয়। জনবলের কয়েকটি গ্রুপ আছে। সরকার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে করবো, তখন সরকারকে উপদেশ দেওয়ার মত জনবল থাকতে হবে- যারা সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা ও দরকষাকষি করবে। সেই জনবল কি আমাদের ছিল বা আছে?

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে-সংক্রান্ত নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বিশেষায়িত জনবল থাকতে হবে। যারা এই সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁদের মধ্যে এমন জনবল থাকতে হবে, যাদের পরমাণু প্রযুক্তি সর্ম্পকে জ্ঞান সরবরাহকারীদের সমপর্যায়ের। যদি তেমন জনবল না থাকে, তাহলে সরবরাহকারীরা যা বলবে তাই শুনতে হবে (রোগী হিসেবে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করার মত)। এ রকম ক্ষেত্রে অনেক খেসারত দেওয়ার আশংকা থাকে।

সমীক্ষা থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতির মান, নির্মাণকাজ প্রভৃতি সরবরাহকারীদের সব কাজ তত্ত¡াবধান করার জন্য জনবল থাকতে হবে। প্রযুক্তি নির্বাচনের জন্যও জনবল থাকা দরকার। এর কোনো কিছু ছাড়াই বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু করেছে।

প্রযুক্তি : রূপপুর প্রকল্পে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে তা ‘থ্রি প্লাস প্রজন্মের প্রযুক্তি’ হিসেবে পরিচিত। এটিই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। তাই সবচেয়ে নিরাপদ বলেও ধারণা করা হয়। রূপপুরে এই প্রযুক্তির ‘ভিভিইআর-১২০০’ নামের যে রিঅ্যাক্টর (পরমাণু চুল্লি) বসানো হবে, এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র রাশিয়ায় তেমন একটি রিঅ্যাক্টর চালু হয়েছে, সেখানকার নেভোভরোনেঝ বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

এই রিঅ্যাক্টরের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ১. একটি শক্তিশালী আবরণের (কনটেইনার ডোম) মধ্যে রিঅ্যাক্টর ভবনটি আবৃত থাকে, যাকে কোনো দুর্ঘটনা হলেও ওই আবরণের বাইরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে পারে না। শুরু থেকেই আমেরিকার তৈরি রিঅ্যাক্টের এই ব্যবস্থা ছিল। রাশিয়ার রিঅ্যাক্টের ছিল না। এখন করা হয়েছে। ২. রিআ্যাক্টেরর নীচে ‘কেরো ক্যাচার’ নামে একটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে দুর্ঘটনাজনতি কারণে রিঅ্যাক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হলে, এমনকি গেলে গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গলিত ধাতব ওই কোর ক্যাচারের মধ্যে চলে যাবে এবং সেখান থেকেও কোনো তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারবে না।

এই প্রযুক্তি আগের চেয়ে অনেক উন্নত। যে আবরণের কথা বলা হল তার ভেতরের প্রেসার এমন মাত্রায় সীমিত রাখা হয় – যা বাইরের পরিবেশের চেয়ে সব সময় কম থাকে। ফলে আবরণ ফেটে  গেলেও বাইরের বাতাসের চাপে ভেতরের বাতাস বাইরে আসতে পারে না। এই প্রযুক্তি নিয়ে গুরুতর কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি দেশের অভিজ্ঞ মহলে নেই। বরং শুরুতে সরকার যখন অপেক্ষাকৃত পুরানো প্রযুক্তির, তৃতীয় প্রজন্মের ‘ভিভিইআর-১০০০’ মডেলের রিঅ্যাক্ট নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন তাঁদের দাবি কিংবা সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার র্সবাধুনিক প্রযুক্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রচলতি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে পারমাণবিক বিদু্যুৎকেন্দ্রেরে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে বন্ধ করে দিলেই সেখানে তাপ উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্রের তা হয় না। বন্ধ করার পরও র্দীঘদিন ধরে তাপ উৎপন্ন হতে থাকে ‘বি কজ অফ ডিকে হিট’। তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার পরও রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা চালু রাখতে হয়।

জাপানের ফুকুশিমায় দুর্ঘটনার কারণ ছিল এই ডিকে হিট। কেননা সেখানে ছয়টি রিঅ্যাক্টরই বন্ধ হয়ে গেলেও সুনামির কারণে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। এরপর সেখানকার স্পেন্ট ফুয়েল পিটে রক্ষতি স্পেন্ট ফুয়েল অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন ধরে যায়। রূপপুরে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে ঠান্ডা করার দুই ধরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি প্রাকৃতিক, অন্যটি যান্ত্রিক।