Home » বিশেষ নিবন্ধ » বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতা : রাষ্ট্রে মানুষে বিরোধ চরমে

বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতা : রাষ্ট্রে মানুষে বিরোধ চরমে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

বিচ্ছিন্নতা মঙ্গলময় নয়। অনিশ্চিত ভয়ের জগৎ, বড় বিপদের। গনতান্ত্রিক রাজনীতি এবং বহুত্ববাদী সমাজ রাষ্ট্র এজন্যই যে, মানুষে মানুষে মেলবন্ধ তৈরী করে ন্যায্য রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে। কিন্ত রাষ্ট্রের শাসকদের মূল লক্ষ্যই হয় ক্ষমতা এবং অধিকতর ক্ষমতা, আর  শাসকরাই বিচ্ছিন্নতা উস্কে দেয়। কারণ জনগণ বিচ্ছিন্ন থাকলে কর্তৃত্ববাদ জারি রাখা সহজ হয়। এটাই বিপদের মূল কথা। এটা শুধু রাষ্ট্রের  নয়, সমাজ ও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, সংযোগ কমছে। রাষ্ট্রের সাথে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানের সাথে মানুষের, সমাজের সাথে ব্যক্তির, এমনকি পরিবারের ভেতরেও বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। গণতান্ত্রিক সমাজ ভাঙছে, কর্তৃত্ববাদ, একনায়কতান্ত্রিকতা স্থান করে নিচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমুহের নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে মাফিয়া ডনদের হাতে। একটি ‘ঠিকাদারী’ সমাজ তৈরী হয়েছে-বিচ্ছিন্নতার ষোলকলা পূর্ণ করে।

ছোট-বড় নগরীর দিকে তাকান! খাল-বিল-জলাধার ভরাট ও দখলের মচ্ছব চলছে। মানুষ ক্রমাগত বিপদাপন্ন হচ্ছে। রাষ্ট্র-সমাজে মুক্তচর্চার জায়গাগুলি বদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে। চর্চা চলছে অন্ধত্বের-চরম ভাবাপন্নতায়। মানুষের মধ্যে বাড়ছে অসহনশীলতা। রাষ্ট্র-সরকার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে গণতন্ত্র-সুশাসন থেকে। কর্তৃত্ববাদের নিয়ন্ত্রণে বেড়ে ওঠা  বিচ্ছিন্নতায় অসহনশীলতার মাঝে সমাজ ক্রমশ: সহনশীলতা সম্প্রীতির জায়গা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে।

প্রযুক্তির বিকাশে ডিজিটালাইজেশনের ছাপ সর্বত্র। সংযুক্ত হবার পথ অনেক। বিকাশের সাথে সাথে বিকৃতিও ভর করছে। সংযোগের পথগুলি খুলে গেলেও ‘ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড’ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত করছে ‘ছোট মন’ নিয়ে, সমস্যার মূল সেখানেই। ‘ছোট মন’ নিয়ে বড় জাতি হয়ে ওঠা যায় না। বড় জাতি হয়ে উঠতে হলে সকল জনগনের জন্য বিস্তৃত ক্ষেত্র নির্মান করা প্রয়োজন। বড় এবং বহুমাত্রিকতায় ফিরে যাওয় এখন এই দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে।

গত কয়েক দশকে আলো ফেললেই অন্ধকার যাত্রার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে। গণতন্ত্রের নামে নানা বিধি-নিষেধ আর নিয়ম বেধে প্রতিষ্ঠানগুলিতে জনগনের সুযোগ ও অভিগম্যতা সীমিত করা হয়েছে। সর্বত্র ‘সংরক্ষণের নামে বহুজনের অবাধ সুযোগকে প্রতিহত করে জনগণকে ‘প্রান্তিক’ করে দেয়া হয়েছে। প্রভাব পড়েছে অবকাঠামোগুলিতে। মানুষ বিচ্ছিন্ন বোধ করছে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে। সরকারের মদতে দখল এবং সংরক্ষণ চেষ্টার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতা উস্কে ফল হয়েছে দু’রকম; এক. বহুজনের সুযোগ ও অভিগম্যতাকে প্রতিহত করায় সুযোগ তৈরী হয়েছে কতিপয়ের। দুই. এই কতিপয়ের হাতে পূঞ্জীভূত  রাষ্ট্রের সকল সম্পদ, ক্ষমতার অনুষঙ্গ হিসেবে তৈরী হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা, অন্তিমে হত্যা-গুম- রক্তপাত। এই ‘কতিপয়’রা হচ্ছেন, ক্ষমতাসীন অথবা ক্ষমতা কাঠামোয় যুক্ত সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক, আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, কথিত সুশীল সমাজ ইত্যাদি; এবং যথানিয়মে জনগন এদের থেকে যোজন যোজন দুরত্বে।

বিচ্ছিন্নতা অবশ্যই বিপদজনক, অন্তত: জনগনের জন্য তো বটেই। কারন বিচ্ছিন্নতা সমাবেশহীন, জনমানবহীন ধূ-ধূ মরুপ্রান্তর। তাতে উৎসাহী হয়ে ওঠে অপরাধীরা। মানুষ যত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে, ততই প্রতিষ্ঠানগুলিতে জাঁকিয়ে বসে অপরাধীরা। ক্ষমতাবানরা অবৈধ দখলে নিয়ে নেয় জনগনের প্রতিষ্ঠানসমূহ। গণতত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিতা না থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় অপরাধীদের ভাগারে।

ব্যক্তির সাথে সমাজের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। আধুনিকতার নামে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পরিবারগুলি ভাঙছে-বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে; এমনকি স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যেও। প্রাইভেসির নামে মানুষ ক্ষুদ্র হতে হতে খোপের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যৌথ পরিবারে বড় হওয়া সুযোগবঞ্চিত শিশু-কিশোর ঢুকে পড়ছে ফেসবুক-ট্যুইটার-ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগতে। বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কল্পজগতের আত্মহননে সাড়া দিচ্ছে।

বিচ্ছিন্নতা শুধু বিভাজন তৈরী করে না, ভয়ঙ্কর বিক্ষুব্ধতার জন্ম দেয়, পাল্টে দেয় মনোজমিন। গণতন্ত্রের জন্য খুব বড় বিপদের নাম বিচ্ছিন্নতা। মানুষকে বহু ধারার চিন্তা- ভাবনা, মত প্রকাশ- সব কিছু থেকে সরিয়ে দেয়। ভয়-আতঙ্কের অদৃশ্য জগৎ সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়।  যার সবচেয়ে বড় দৃশ্যমানতা হচ্ছে, উগ্রবাদী সহিংসতা, যা কেবল মৃত্যুময় অন্ধকার এক জগত। তাতেও কি স্বস্তি মিলছে! এভাবেই হনন ও আত্মহনন হয়ে দাঁড়াচ্ছে অমোঘ নিয়তি।

সংযোগ খুবই জরুরী। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, পরিবার থেকে সমাজে, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠানে-সংযোগ খুবই প্রয়োজন। সংযোগ গড়তে হলে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার এবং নির্বিঘ্ন, গ্রহনযোগ্য ভোটের বিধান থাকতে হবে। সংযোগহীনতা অপরাধ এবং দুর্বত্তায়নের পথ করে দেয়। অপরাধী, সন্ত্রাসীদের জন্য বড় স্পেস তৈরী করে দেয়। অপরাধী মনোজমিন রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান, পরিবার-সব জায়গা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে কতিপয় মানুষ হয়ে ওঠে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ও সর্বেসর্বা।

রাজনীতির সংযোগ হচ্ছে আম-জনতা। রাজনৈতিক দলগুলো সংযোগ করতে মানুষের কাছে যায়। এই সংযোগের মূল হচ্ছে দলীয় আদর্শ ও কর্মসূচি। সেগুলি নিয়েই জনগনের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করে। ভোটপ্রাপ্তির মাধ্যমে দলটি বুঝিয়ে দেয়, জনগন তার আদর্শ-কর্মসূচির সাথে কতটা যুক্ত কিংবা কতটা বিচ্ছিন্ন। এই সুযোগে বাইরের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় রাষ্ট্রের রাজনীতি, বানিজ্য এবং তথ্য প্রবাহ পর্যন্ত। সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই সুযোগ করে দেয় শক্তিধর দেশগুলিকে।

বিচ্ছিন্নতা বড় বিপদ। গণতন্ত্র, সুশাসন এবং অধিকারের ক্ষেত্রে। জনগনের ইচ্ছার সাথে, অপ্রাপ্তির সাথে শাসনের কর্মকান্ড বিপরীত হলে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। শাসক এতটাই অসহনশীল হয়ে পড়ে যে, জনগনের যে কোন দাবি হামলা-মামলা অথবা অস্ত্রের ভাষায় দমন করে। জনগন ও সরকারের মাঝে সৃষ্ট যোজনব্যাপী দুরত্ব অবদমিত জনরোষে পরিনত হয়।

এই রোষ এবং ইচ্ছা প্রকাশের নিয়মতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ হলে জনগন, বিশেষ তরুণ যুব জনগোষ্ঠি ধ্বসাংত্মক পথ বেছে নেয়। আর সেটিই হচ্ছে চরমপন্থার পথ। বিচ্ছিন্নতা তাকে নিয়ে চরমপন্থার সহিংসতা বা কোন মতাদর্শিক সহিংসতার পথে। বিচ্ছিন্নতার নেতিবাচক পরিনতি এদেশের মানুষ দেখেছে হলি অর্টিজানের নৃশংস হত্যাকান্ডে; শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠে বোমা হামলায়।

একদিকে বিচ্ছিন্নতার ব্যাপ্তি ঘটছে, বিভাজন বাড়ছে। কতোটা, সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসহিষ্ণু গা হিম করা সব মন্তব্য দেখলে তরুণ-যুবদের মনোজমিন আঁচ করা যায়। গনতন্ত্র ভাঙ্গা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদ জায়গা নিচ্ছে, আবার উন্নয়ন দিয়ে সব মানুষকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করছি। এই স্ববিরোধিতা কাজে আসছে না। মানুষের আয় বাড়ছে, তারচেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে বৈষম্য। দারিদ্য কমার কথা বলা হচ্ছে, কিন্ত সব সম্পদ কুক্ষীগত হচ্ছে মুষ্টিমেয়’র হাতে।

সেজন্যই বিচ্ছিন্নতা পরিহার করা এখন খুব বড় কাজ। সরকার, ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দলসমূহের সাথে জনগনের নিয়মিত সংযোগ গড়ে বিভাজন কমিয়ে আনা খুব দরকার। বিচ্ছিন্নতার বিভেদ এই দেশ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সংযোগ মানুষকে উদার করে, পরার্থপর করে তোলে। বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনে মৃত্যু, সংযোগ ফিরিয়ে আনে স্বস্তি-শান্তির সুবাসিত জীবন।

বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে এই দেশ অবধারিতভাবেই এগোচ্ছে নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার দিকে। মানুষ নি:সঙ্গ হয়ে পড়ছে, অপরাধের মনোজমিন জায়গা পাচ্ছে, নিষ্ঠুরতার আবেগকে ন্যায্যতা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বিপদের মূল জায়গা এটি। রাষ্ট্র-সমাজ, ব্যক্তি সব ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। এখান থেকে ফিরে আসতে হলে বিচ্ছিন্নতার চাষাবাদ বন্ধ করে সংযোগের নয়া আবাদ গড়ে তোলা জরুরী।