Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্দ্বতত্ত্ব !

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্দ্বতত্ত্ব !

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্ধ কি? অনেকগুলো সরল উত্তর আছে। এক বাক্যে বলা যায়, আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপি’র দ্বন্ধ। অনেকে আর একটু স্থূল করে বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কারারূদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। কৈশোর উত্তর রাজনীতির যে শিক্ষা পেয়েছিলাম, সেখানে মুলদ্বন্ধ হচ্ছে, যে দ্বন্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরী হয়। আর গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধের অধীন। অর্থাৎ গৌণ দ্বন্ধ রাজনীতির পরিবর্তন ধারায় কখনো মূল ঘটক নয়। তবে অনেক সময় গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধ রূপে নিয়ে পরিবর্তনের লাইম লাইটে আসে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধ কতকটা আদর্শের কারণে, কতকটা ক্ষমতার কারণে সে প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী। তবে আদর্শকে আর একটু প্রায়োগিকভাবে রাজনৈতিক মত ও পথ বলতে পারি। রাজনৈতিক মত ও পথ এর কারণে একই আদর্শের অনুসারীদের মাঝেও দ্বন্ধের সূচনা হতে পারে। এখানে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন- একই আদর্শের অনুসারীদের মধ্যে প্রথম যে দ্বন্ধ থাকে সেটা অবৈরী অর্থাৎ শক্রতা মূলক হয়না, পরে সেটা বৈরী বা শক্রতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতার কারণে রাজনৈতিক দ্বন্ধ ও প্রতিযোগিতা অন্ততঃ আধুুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতায় হিসেবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক ক্ষমতার চুড়ান্ত রূপ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তার বহুমাত্রিক, যে কোন সংগঠনের পদ অর্জন রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে। কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা দ্ব›দ্ব শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের ভোট, নিরস্ত্র বা সশস্ত্র অভ্যুথানের মধ্যে সীমিত নয়। আমাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর প্রবেশ ঘটে। রাজনৈতিক দ্বন্ধের হিংসা ও অহিংসা শুধু আদর্শগত কারণে নয়- লক্ষ্য অর্জনের কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অহিংসা রাজনীতিতে বিশ্বাসীরা ও হিংসাআশ্রিত কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। এ পর্যন্ত আমি যা বলছি তা বাংলাদেশের রাজনীতির মূল দ্বন্ধ ও গৌণ দ্ব›দ্ব নিয়ে আলোচনার ভনিতা মাত্র। আমরা যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্ধকে প্রধাণ দ্বন্ধ হিসেবে মেনে নেই, তবে এ দ্বন্ধের গতি প্রকৃতি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা। অন্য দিকে এ মূল দ্বন্ধের আশে পাশে যেসব গৌণ দ্বন্ধ নিয়ে আলোকপাত করা। এ গৌণ দ্বন্ধ এর মধ্য থেকে কোন একটি সামনে এসে মূল দ্বন্ধে পরিণত হতে পারে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহুপাক্ষিক। যদিও বাহ্যিকভাবে মূলদ্বন্ধ ঘিরে এ দুই পক্ষ থাকে- তবে এই দু পক্ষের কাঠামোর বাইরে; ভিতরে-বাইরে আরো অনেকগুলো পক্ষ থাকে। এর সাথে আরো একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, রাজনৈতিক মূল দ্বন্ধে নিরব ভোটারদের ভূমিকা কি? বা নাগরিকরা কিভাবে দ্বন্ধকে প্রভাবিত করেন বা নিজেরা প্রভাবিত হোন। বাংলাদেশে ১৯৯১ এর পর আওয়ামী লীগ বিএনপির দ্বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ভিত্তিতে দেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে। এই মুল দ্বন্ধের সরল বৈশিষ্ট্যের ভিতরে অনেক জটিল উপাদান রয়েছে। মূল দ্বন্ধের জটিল উপাদানগুলি দু’পক্ষের অভ্যন্তর থেকে আসে। দুই পক্ষের প্রান্ত অর্থাৎ ঢাকার বাইরে থেকে তৈরী জটিল উপাদান শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয় দুই ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে যেমন- প্রধানমন্ত্রী ও তার পছন্দের বলয়, অন্যদিকে খালেদা জিয়া ও তার পছন্দের বলয়, এটাই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের বিশেষ দিক। বাইরের বিষয়গুলি কোনটি গৌণ নয়, যেমন বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের সমর্থনের মাত্রা; দ্বিতীয়তঃ ভারতের বাইরেও অন্য বিদেশী শক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। তৃতীয়তঃ সশস্ত্র বাহিনীর দেশের রাজনৈতিক সংকটের সংবেদনশীলতা ও সাড়া দেবার প্রবণতা। চতুর্থতঃ রাজনৈতিক মেরুকরণের ধারা। পঞ্চমতঃ সরকারের ক্রাইসিস ম্যানেজম্যাণ্ট কৌশলের সফলতা।

উপরোক্ত পাচটি ধারা থেকে আসা রাজনৈতিক পরিবর্তনকামী উপাদানগুলি চিহ্নিত করতে পারলে, বর্তমান  রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের পরিনতির আভাস পাওয়া যেতে পারে।