Home » আন্তর্জাতিক » বিশ্বকাপের রাজনীতি আর অর্থনীতি

বিশ্বকাপের রাজনীতি আর অর্থনীতি

আসিফ হাসান ::

খেলা কেবল খেলাই নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি। ক্রীড়া প্রতিযোগিতাটি যত বড় হবে, তাকে ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মারপ্যাচ ততো বেশি থাকে। রাশিয়ায় যে বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে, সেটিও এর বাইরে নয়। মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য বিশ্ব যখন বিভিন্ন ইস্যুতে রাশিয়াকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে; আবার রাশিয়া যখন তার হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে- ওই সন্ধিক্ষণেই ওই দেশটিতেই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় একক বৃহত্তম ক্রীড়ানুষ্ঠানটি। অলিম্পিক গেমসে এর চেয়ে বেশি দেশ অংশ নেয়, কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয়, তা অন্য কোনো ইভেন্টে দেখা যায় না।বিশ্বকাপে শিরোপার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে যেমন ৩২টি দলকে বিপুল প্রয়াস চালাতে দেখা যায়, তেমন এই আসর আয়োজন করার দাবিদার হতেও কম কাঠখড় পোড়াতে হয় না। বরং বিশ্ব-রাজনীতির কলকাঠিগুলো তীব্র বেগে নড়াচড়া করতে থাকে আয়োজক দেশ হওয়ার লড়াইয়ে। নানা সমীকরণ কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সবচেয়ে জনপ্রিয় আসরটির আয়োজক হওয়ার দৌড়ে জয়ী হওয়া সম্ভব হয়।বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে এটিও কম সম্মানের ব্যাপার নয়। এখানে লড়াইটি কম জমজমাট নয়।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক হতে চেয়েছিল রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্ধী অনেক দেশই। খোদ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়াও ছিল। কিন্তু তারা বাদ পড়েছে কিংবা রুশ সমীকরণের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই কিন্তু রাশিয়া একদফা জিতে আছে।  রাশিয়া যে আবার সোভিয়েত আমলের  প্রভাব সৃষ্টি করতে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে, বিশ্বকাপ আয়োজনের কৃতিত্ব লাভ তারই একটি আলামত। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপে তারা যে এখনো মার্কিন প্রভাবিত বিশ্বের সাথে লড়াই করতে পারে, সেটিই তারা দেখিয়েছে এই আসর আয়োজনের মাধ্যমে। আর ভ্লাদিমির পুতিন এর মাধ্যমে দেশে ও সেইসাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে ও তার দেশকে তুলে ধরার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন।

কয়েক মাস ধরেই পুরো বিশ্বের নজর রাশিয়ার দিকে। আর বিশ্বকাপ চলাকালে রাশিয়াই থাকছে বিশ্বের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের প্রধান খবর। দুনিয়াজুড়ে এই মাতামাতির প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন আছে, তেমনি আছে পরোক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব। একে পুঁজি করে অনেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। রাশিয়া তাই হিসাব কষেই এই পথে নেমেছিল।

অনেক সময়ই দেখা গেছে, নিজেরা না পারলেও প্রতিদ্বন্দ্ধী কোনো দেশ যাতে এই সম্মান লাভ করতে না পারে, সেই চেষ্টা দেখা যায়। রাশিয়ার ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। রাশিয়ায় যাতে বিশ্বকাপ না হতে পারে, সেই চেষ্টা একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত ছিল। কিন্তু রাশিয়া শেষ পর্যন্ত তার অবস্থানে টিকে থাকতে পেরেছে। যে দেশটিকে বয়কট করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইন করেছে, এমনকি তৃতীয় দেশ বড় ধরনের ব্যবসা করলে তাদেরও অবরোধের মুখে পড়তে হবে বলে হুমকি দিচ্ছে, সেই দেশের দিকেই সবার নজর পড়াটা কম কৃতিত্বের বিষয় নয়।

রাশিয়া অবশ্য কেবল রাজনীতিতেই লাভ খুঁজছে না, অর্থনীতিতেও এর মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বকাপ আয়োজন করতে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ লাগে। নতুন নতুন স্টেডিয়াম বানাতে হয়, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে দেদারসে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু তারপরও আয়োজক দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিপুল লাভবান হয়। সংগঠকরা আশা করছেন, বিশ্বকাপের মাধ্যমে রুশ অর্থনীতিতে ৩১ বিলিয়ন ডলারের প্রভাব ফেলবে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে দেশটির জিডিপি ১.৬২ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ১.৯২ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই রুশ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ আয়োজনে মোট ব্যয় হচ্ছে ১১ বিলিয়ন ডলার (৬৮৩ বিলিয়ন রুবল)। এতে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার চাকরি সৃষ্টি হয়েছে।

জাঁকজমক আয়োজন করে লাভবান হওয়ার ইতিহাস রাশিয়ার সাম্প্রতিক অতীতেও আছে। এই ২০১৪ সালের সোচিতে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিক গেমসে রাশিয়া ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে চমক দেখিয়েছিল। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শীতকালীন গেমসে পরিণত হয়েছিল।

বিপুল ব্যয়ের পরিণামে সোচি এখন সারা বছর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ওঠে এসেছে। বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে এর চেয়েও বেশি লাভবান হবে বলে অনেকে মনে করছে।

তবে চূড়ান্ত লাভ-লোকসানের হিসাব মেলে অনেক পরে। সেই হিসাব মেলানোর কাজটির জন্য আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।