Home » আন্তর্জাতিক » বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে গণতন্ত্র : বাড়ছে বৈষম্য দমনপীড়ন, কমছে স্বাধীনতা

বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে গণতন্ত্র : বাড়ছে বৈষম্য দমনপীড়ন, কমছে স্বাধীনতা

আসিফ হাসান ::

ক্ষমতার জন্য স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন ও লোকরঞ্জক ক্ষুধার প্রয়োগ অর্থাৎ দমনপীড়ন আরো কঠোর করার জন্য স্বৈরশাসকেরা সব হাতিয়ারই ব্যবহার করছে। এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকারও ক্রমবর্ধমান হারে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর সামাজিক বিভাজন অনেক অনেক আগে যতটুকু ছিল, তার চেয়েও গভীর হয়েছে। জার্মানভিত্তিক গবেষনা সংস্থা  বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’ এসব ঘটনার নেপথ্য কারণ এবং কোন কোন দেশ বিশেষভাবে এসবে আক্রান্ত, তা-ই তুলে ধরেছে।

গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও শাসনকাজের মান গত ১২ বছরে বৈশ্বিক গড়ে সর্বনিম্ন স্থানে নেমে গেছে। জার্মানীর গবেষনা সংস্থা বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’-এর প্রধান তথ্য হিসেবে এটিই ওঠে এসেছে। ২০০৬ সাল থেকে সংস্থাটি  ১২৯টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে। তাদের সিদ্ধান্ত হলো : অধিকতর উন্নত গণতান্ত্রিক কয়েকটি দেশসহ ৪০টি সরকার গত দুই বছরে আইনের শাসন খর্ব করেছে, ৫০টি দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ দেখা গেছে। অনেক দেশের শাসকই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি অথর্বতার পরিচয় দিয়ে গরিব ও প্রান্তিক লোকজনের ওপরই পুরো দায় চাপিয়ে দিয়েছে। অনেক সরকার ক্রমবর্ধমান সামাজিক, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতে যথাযথভাবে সাড়া দিতে পারেনি কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই এমনকি এসব উত্তেজনায় ইন্ধনও দিয়েছে।

বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এই তালিকায় থাকা অনেক সরকারের নিম্নমানের বা বাজে দক্ষতার প্রধান কারণ হলো- তারা সংলাপ ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক সংঘাতে সাড়া দিতে আগ্রহী নয় কিংবা সক্ষম নয়। সূচক অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ৫৮টি দেশের চেপে থাকা সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। নির্বাচিত হওয়ামাত্র অনেক শাসকই নিজেদের রাজনেতিক ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব করেছে। এ ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক লোকরঞ্জকদের মধ্যে রয়েছে হাঙ্গেরি ও তুরস্ক। অথচ এসব দেশের সরকার তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের আর্ট ডি গস গবেষণার তথ্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, অনেক শাসকই দমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে নেতৃত্বে তাদের অবস্থান পোক্ত করেছে। অবশ্য দীর্ঘ মেয়াদে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানো ও সংলাপে না বসার পরিণতি হয় খারাপ।’

বাড়ছে বৈষম্য, কমছে স্বাধীনতা :

গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের দিকে উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা হলো অসন্তোষজনক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭২টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশে ব্যাপক দারিদ্র্য ও উচ্চ মাত্রার সামাজিক বৈষম্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২২টি দেশে- এদের মধ্যে রয়েছে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভেনেজুয়েলা- আর এইসব দেশগুলোর গত ১০ বছরে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাত্রার অবনতি ঘটেছে। একই মেয়াদে দেশগুলোর মাঝারি থেকে ভালো মানের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশে নেমে গেছে।

আগের চেয়ে অনেক বেশি লোক কেবল কম বৈষম্যের মধ্যেই দিন গুজরান করছে না, তারা আরো বেশি দমনমূলক পরিবেশেও বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ৩শ ৩০ কোটি লোক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে রয়েছে (৪শ ২০ কোাটি  লোক রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনে)। সমীক্ষা শুরুর পর থেকে এত বেশি লোক কোনোকালেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে থাকতে দেখা যায়নি। যে ১২৯টি দেশে সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তার মধ্যে বিটিআই ৫৮টিকে স্বৈরতান্ত্রিক  এবং ৭১টিকে গণতান্ত্রিক  হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগের কিছু নেই – এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যার বিষয় হলো নাগরিক অধিকার খর্ব ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পর্যন্ত আইনের শাসনের অবনতির বিষয়টি। ব্রাজিল, পোল্যান্ড ও তুরস্কের মতো সাবেক গণতান্ত্রিক বাতিঘর বিবেচিত দেশগুলোই এখন রূপান্তরশীল সূচকে পড়েছে সবচেয়ে বেশি করে।

আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে কেবল বারকিনা ফাসো ও শ্রীলঙ্কাই গণতন্ত্রের পথে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হাসিল করেছে। বিপরীতে মোজাম্বিক, তুরস্ক ও ইয়েমেনসহ মোট ১৩টি দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। এসব দেশের পাঁচটি এখন আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদÐও পূরণ করতে পারছে না। এই পাঁচটি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা। স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর অধীনে বছরের পর বছর ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারসাম্য বজায় রাখার যে ব্যবস্থা নির্বাচন, সেটির মানে ঘাটতির কারণেই অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে।

স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে গণতান্ত্রিক শাসন অনেক ভালো :

এসব ঘটনা অনেক দেশের নাগরিকের জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ দুর্নীতি, সামাজিক বর্জন ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা স্বৈরতান্ত্রিক সময়ে অনেক বেশি আধিপত্য বিস্তার করে। বিটিআইয়ের মতে, ১২টি গণতান্ত্রিক দেশ সফলভাবে দুর্নীতি দমন করতে সক্ষম হয়েছে, আর স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে পেরেছে মাত্র একটি। মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ সমান সুযোগ যথাযথভাবে অর্জন করতে পেরেছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে এই সফলতা পেয়েছে ১১টি। ২৭টি গণতান্ত্রিক ও মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ বাজার ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা ভালোভাবে সক্রিয় রাখতে পেরেছে। বিটিআই সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে গণতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থাগুলো কোনোভাবেই অধিকতর স্থিতিশীল ও কার্যকরব্যবস্থা নয়।

অবশ্য চীনের ক্ষেত্রে সত্যি যে – গত ১০ বছরেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেশটি সবচেয়ে বিকশিত হয়েছে – অনেকের ধারণা স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি অর্জনের প্রধান উদাহরণ। অবশ্য যারা চীনের অর্থনৈতিক সফলতার অবদান এর রাজনৈতিকব্যবস্থার ওপর আরোপ করতে চান, তারা সার্বিকভাবে স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর বাজে অর্থনৈতিক ফলাফলের বিষয়টি বুঝতে অক্ষম। রাশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভেনেজুয়েলার মতো অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিকব্যবস্থায় বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্সের’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক – উভয়টির বিকাশই বছরের পর বছর স্থবির হয়ে আছে।

(প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২২ মার্চ, ২০১৮)