Home » অর্থনীতি » রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-২ : তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও দুর্ঘটনার দায় নিয়ে দুশ্চিন্তা

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-২ : তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও দুর্ঘটনার দায় নিয়ে দুশ্চিন্তা

অরুন কর্মকার ::

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দুটি বিষয় হলো এর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং দুর্ঘটনা। তেজস্ক্রিয় বর্জের ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত বিষয়। এ জন্য প্রযুক্তি যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন উন্নতমানের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল। এর কোনোটাই বাংলাদেশের নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই আলোচনা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই বলা হচ্ছে যে, রূপপুর প্রকল্পের জ্বালানি যেমন রাশিয়া সরবরাহ করবে, তেমনি এখানকার স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত জ্বালানির অবশিষ্টাংশ) রাশিয়া ফেরত নেবে। কিন্তু স্পেন্ট ফুয়েল আর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কি এক? এই প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার।

অন্যদিকে, পারমাণবিক দুর্ঘটনার দায় (নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি) গ্রহন এবং কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মত সামর্থ্য এরও কোনোটা বাংলাদেশের নেই। অথচ রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে যে চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) সই করেছে তাতে বাংলাদেশকেই এই দুর্ঘটনার দায় নিতে হবে। সরকার অবশ্য এই ভেবে নিশ্চিন্ত আছে যে, দুর্ঘটনা ঘটবে না। উন্নততর প্রযুক্তি দুর্ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়া (কনসিকোয়েন্সেস) ঠেকাবে। কিন্তু বাস্তবে কী হবে তা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পারমাণবিক বর্জে্যর ভয়বহতা সম্পর্কে সবাই অবহিত ও সচেতন। অনেকের ধারণা স্পেন্ট ফুয়েলই হল পারমাণবিক বর্জ্য। আসলে তা নয়। স্পেন্ট ফুয়েল হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি‌র (ইউরেনিয়াম ২৩২) অবশিষ্টাংশ। একটি নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ৬ মাস) পর পর এই স্পেন্ট ফুয়েল বের করে নিয়ে রিঅ্যাক্টরে নতুন জ্বালানি ভরা রড স্থাপন করা হয়।

বের করা স্পেন্ট ফুয়েল রিসাইকেল করে তিনটি জিনিস পাওয়া যায়—কিছুটা ইউরেনিয়াম -যা পুনরায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা যায়, প্লুটোনিয়াম -যা পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য এবং তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বর্জ্য যার পরিমান খুব কম, কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ। এই বর্জ্য সিলিকার সঙ্গে মিশিয়ে গলিত কাঁচের মত একটা পদার্থ বানিয়ে তা স্টেইনলেস স্টিলের কনটেইনারে ভরে কংক্রিট দিয়ে শিল্ডিং করে কোনো নির্জন ও শুকনা স্থানে শত শত বছর সংরক্ষণ করতে হয়।

এই স্থানটা হতে হয় এমন যেখানে কোনোদিন পানি আসেনি। এটা মূলত রাখা হয় পরিত্যাক্ত লবন খনিতে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের এটাই মূল পদ্ধতি। কিন্তু এই ধরণের কোনো স্থান বাংলাদেশে নেই। এ ছাড়া, একটা হেভি কংক্রিটের স্ট্রাকচার তৈরি করে একটা জনমানবশুন্য স্থানেও সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটাও ঝুকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।

রূপপুরের প্রসঙ্গে বলা হয়, রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে রিসাইকেল করে প্রকৃত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তাঁরা রেখে দেবে, না কি আমাদের ফেরত দেবে। এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেবে বলে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি এখনো হয়নি। চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্পেন্ট ফুয়েল ছাড়াও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আরও দুই ধরণের বর্জ্য হয়। একটি কঠিন (বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রপাতিসহ ধাতব বস্ত্ত) এবং অন্যটি তরল বর্জ্য। কঠিন বর্জ্যটা খুব বেশি বিপজ্জনক নয়। কারণ সেগুলো ধুয়ে-মুছে পরিস্কার করা যায়। কিন্তু ওই ধোয়া-মোছার পানিসহ তরল বর্জ্য মারাত্মক। সেগুলো বিশেষ ধরণের ট্যাংকে সংরক্ষণ করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩০ বছরের কর্মজীবন শেষে অবসর নেওয়া প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের হ্যানফোর্ড রিজার্ভেশনে রাখা তরল পারমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে তরল বর্জ্য রাখা ১৫৯টি ট্যাংক আছে। একেকটি ট্যাংকের ধারণ ক্ষমতা ২০ হাজার থেকে ১০ লাখ গ্যালন। তিনি বলেন, প্রথমে তাঁরা বানিয়েছিল সিঙ্গেলশেল ট্যাংক, কোকাকোলার ক্যানের মত। তাঁদের ধারণা ছিল ২০ বছরের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে। কিন্তু সেটা পারেনি। ইতিমধ্যে ট্যাংকগুলো ছিদ্র হতে শুরু করে। তখন তাঁরা ডাবলশেল ট্যাংক তৈরি করে। একটা কোকের ক্যান আরেকটা ক্যানের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখার মত ব্যবস্থা আর কি। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। এখন ডাবলশেল ট্যাংকও ছিদ্র হতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে হ্যানফোর্ডে পাঁচ কোটি ৪০ লাখ (৫৪ মিলিয়ন) গ্যালন তরল পারমাণবিক বর্জ্য আছে। এই বর্জের ‘হাফ লাইফ (তেজস্ক্রিয়তা সহনীয় মাত্রায় নেমে আসা)’ হলো ১০ হাজার বছর। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নেভাদায় ভূপৃষ্টের আধা মাইল নীচে একটা ডিপজিটরি তৈরি করেছে। সেখানে বর্জ্যগুলো রাখা হয়েছে ডাবলশেল স্টেইনলেস স্টিলের কনটেইনারে। এরপর কি হবে, এগুলো নিয়ে কি করা যাবে তা কেউ জানে না। সবার আশা হলো একটা বড় ভূমিকম্প হলে ওগুলো চিরদিনের মত মাটির তলায় চাপা পড়বে।

হ্যানফোর্ডে যে ৫৪ মিলিয়ন গ্যালন তরল পারমাণবিক বর্জ্য আছে এর ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ করার জন্য যে প্লান্ট তৈরি করা হচ্ছে তার সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫০ কোটি ডলার। প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা এখন ২০ শতাংশ করতে চাচ্ছে। তাতে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে ২৫০০ থেকে ৩০০০ কোটি ডলার। এটা বলা হচ্ছে মাত্র একটি কেন্দ্রে সংরক্ষিত বর্জের ২০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ করার কথা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কেন্দ্রে তো আরও অনেক বর্জ্য সংরক্ষিত আছে।

‘নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি’: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে (জেনারেল কন্ট্রাক্ট), তাতে এই শিরোনামে একটি ক্লজ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের কাজে দেশে এবং দেশের বাইরে যে কোনো ধরণের দুর্ঘটনা কিংবা ড্যামেজ হলে তার দায় এককভাবে বাংলাদেশের।

অর্থাৎ রাশিয়ায় যন্ত্রপাতি তৈরির সময়ও যদি কোনো ড্যামেজ হয় সে দায়ও বাংলাদেশকে নিতে হবে। অথচ প্রকল্পের ‘এ টু জেড’ করছে রাশিয়া। এই যে তাঁরা করছে, কি করছে, কীভাবে করছে সেটা আমরা তত্ত্বাবধানও করছি না বা করার সামর্থ্যও আমাদের নেই। সুতরাং এই দায় আমরা কেনো নেব এবং কিভাবেই বা নেবো এগুলো গুরুত্বপ্রশ্ন প্রশ্ন যার সমাধান হওয়া দরকার।

আন্তর্জাতিক আইন ও প্রটোকল অনুযায়ী যে দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে অর্থাৎ যে দেশ এই কেন্দ্রের স্বত্ত্বাধিকারী, দুর্ঘটনার দায় তাদের। বিদ্যুৎকন্দ্রের নির্মাণকারী, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কিংবা অন্য কোনো ঠিকাদারের ভুল-ত্রুটির দায়ও স্বত্ত্বাধিকারীকেই নিতে হবে। এই আইন করা হয়েছে এ জন্য যে, কোনো দেশ যখন এ ধরণের বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে তখন তারা যেন সবকিছু বুঝে-শুনে করার মত সামর্থ্য অর্জন করার পর করে। কিন্তু বাংলাদেশ তো তা করেনি।

এ ক্ষেত্রে ভারত একটা কাজ করেছে। যদিও তাঁদের বুঝে-শুনে করার মত সামর্থ্য আছে, তারপরও ২০১০ সালে তাঁরা একটা আইন করে পারমাণবিক দুর্ঘটনার দায় সরবরাহকারী অর্থাৎ রাশিয়ার ওপরও চাপিয়েছে। ওই আইনে বলা হয়েছে, যদি সরবরাহকারীর সরবরাহ করা কোনো যন্ত্রপাতির নিম্নমান বা অন্য কোনো ত্রুটি দুর্ঘটনার কারণ হয় তাহলে তার দায় সরবরাহকারীকেও নিতে হবে।

এই আইন পাস হওয়ার পর রাশিয়া অনেক দিন কুদনকুলম ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের জন্য চুক্তি করা থেকে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই আইন মেনেই তাঁরা চুক্তি সই করতে রাজি হয়। অবশ্য এ কারণে তাঁরা ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে। কেননা দুর্ঘটনার দায় যদি তাঁদের নিতে হয় তাহলে বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই বীমার প্রিমিয়ামের জন্য বাড়তি খরচ হবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশেরও উচিৎ ভারতের ওই আইনের আলোকে একটি আইন করার কথা ভেবে দেখা। কারণ মানুষ যে জিনিস তৈরি করে তা যে শতভাগ নিরাপদ সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। ‘মারফিস ল’ বলে একটা তত্ত্ব আছে। তত্ত্বটি হচ্ছে—‘ইফ দেয়ার ইজ নাথিং গোজ রং, সামথিং উইল’। যে কোনো যন্ত্রপাতি যে কেনো সময় বিগরাতে পারে। যখনই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখনই বলা হয়, এইটা যে হতে পারে তা তো জানা ছিল না। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সেটার কারণটুকুই শুধু শুধরানো হয়। চেরনোবিলের ভুল শুধরানো হয়েছে। ফুকুশিমার ভুল শুধরানো হয়েছে। কিন্তু অন্য কোনো রকম ভুল হচ্ছে কিনা তা কি কেউ বলতে পারে?