Home » বিশেষ নিবন্ধ » উদার গণতন্ত্রের তিন সঙ্কট

উদার গণতন্ত্রের তিন সঙ্কট

গনেশ সীতারামন

গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : আসিফ হাসান

গত কয়েক বছর ধরেই আমি ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের ২০০৫ সালে কেনিয়ন কলেজে দেওয়া উদ্বোধনী বক্তৃতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ওয়ালেস দুটি মাছের সাঁতার কাটার গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন। পাশ দিয়ে আরেকটি বড় মাছ সাঁতরে যাওয়ার সময় বলল, ‘সুপ্রভাত বাছারা, পানি কেমন?’ বড় মাছটা দূরে চলে যাওয়ার পর একটি অপরটিকে বলল, ‘আজব কথা, পানি আবার কেমন হবে?’

কোন জিনিসটা ট্রাম্পের আর বেক্সিটের ভোটারদের নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে অনেক আলোচনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে পড়ছে দেখে উদ্বেগেরও সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক লোক টুইটার-ঝড় থেকে টুইটার-ঝড়ে দৌড়ঝাঁপ করতে থাকায় পানিতে কী হচ্ছে- অর্থাৎ বৈশ্বিক  গণতন্ত্রের সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার মূল কারণের প্রতি নজর পড়ছে তুলনামূলকভাবে কম।

ইয়াসচা মনকের অনন্য গ্রন্থ ‘দ্য পিপল ভার্সেস ডেমোক্র্যাসি’তে উদার গণতন্ত্র কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টির স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত, বোধগম্য ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং ওই পরিবেশ নস্যাতই কেনো বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রের বর্তমান সঙ্কটের উৎস তা জানিয়েছেন। উদার গণতন্ত্র যে পানিতে সাঁতার কাটে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অচিন্তনীয় বলে তিনি মতপ্রকাশ করেছেন।

মনক দেখিয়েছেন, উদার গণতন্ত্রের সফলতা ও স্থিতিশীলতা সমাজজীবন-সম্পর্কিত তিনটি ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রথমত, নাগরিকেরা তুলনামূলকভাবে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিল। কারণ, সম্প্রচার করা খবর, সংবাদপত্র, রেডিও ইত্যাদি সবই ছিল এককেন্দ্রিক অনেক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে দ্বাররক্ষকেরা খবর ও তথ্যকে মূলধারার মধ্যে থাকা নিশ্চিত করত। এর অর্থ হলো, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ও অভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অভিন্ন কথাবার্তা বলত।

দ্বিতীয় ধারণাটি ছিল ব্যাপক-বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও তুলনামূলক অর্থনৈতিক সাম্যতা। বিশ^ ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়ই মূলত কোনোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল না। কেবল শিল্প বিপ্লব সূচনায় প্রবৃদ্ধি আকাশচুম্বি হওয়ার পরই লোকজন উচ্চতর জীবনযাত্রার আকক্সক্ষা প্রকাশ করতে পেরেছিল। আর সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক দশকের মধ্যে প্রবৃদ্ধির সাথে নিম্ন পর্যায়ের অর্থনৈতিক বৈষম্যের অর্থ ছিল এই যে, উচ্ছসিত জোয়ারে সত্যিকার অর্থেই সব নৌকাকেই উপরে ওঠেছিল।

আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।

আর চূড়ান্ত ধারণা ছিল সামাজিক সমরূপতা। মনক যুক্তি দিচ্ছেন, বিশ্ব জুড়ে স্থিতিশীল উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে চোখে পড়ার মতো তুলনামূলক সমরূপ জনসংখ্যা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপে গণতন্ত্রের উত্থান ও বহুভাষিক অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্প্রাজ্যের মতো সাম্রাজ্যগুলোর ভাঙন ছিল ওতপ্রোতভাবে জাতীয়তাবাদের সাথে সম্পর্কিত।

মনক বলছেন, গত প্রজন্মে এবং বিশেষ করে গত বছর ১৫ সময়কালে ওই তিনটি ধারণাই মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়েছে। সামাজিক মিডিয়া যেকোনো ব্যক্তিকে সম্প্রচারকারীতে পরিণত করেছে, লোকজন যে খবর, তথ্য ও মতামত শুনতে চায়, তাদেরকে কেবল তা-ই শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে এটি চরমপন্থী ও প্রান্তিক আদর্শ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ সম্প্রসারিত করেছে। এক প্রজন্ম ধরে গড়পড়তা শ্রমিকের প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে রয়েছে, লোকজন আশঙ্কা করছে যে তাদের সন্তানের প্রজন্ম আর্থিকভাবে স্থবির হয়ে পড়বে। পরিশেষে বলা যায়, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে অভিবাসন বাড়তে থাকায় বিশেষভাবে যেসব এলাকায় দ্রুত বৈচিত্র্য বাড়ছে, সেসব স্থানে চরমপন্থা ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগ দ্রুত ছড়াচ্ছে।

মনকের মতে, এর পরিণতিতে উদার গণতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। আমরা ‘অনুদার গণতন্ত্রের’ উত্থান দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ সরকারগুলো জাতির ‘সত্যিকারের’ লোকজনের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও ব্যক্তিগত অধিকার বা সাংবিধানিক রীতিনীতির তোয়াক্কা করছে সামান্যই। অনেকে এসব আন্দোলনকে লোকরঞ্জক হিসেবে অভিহিত করছে। একইসাথে অন্যরা মনকের ভাষায় ‘অগণতান্ত্রিক উদারবাদের’ সাথে দহরম-মহরম করছে। এই ধরনের সরকারব্যবস্থায় অধিকার সংরক্ষিত থাকলেও তা হয় গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার মূল্যে। এটি অনেকটা এলিট টেকনোক্র্যাটদের পরিচালিত সরকারের মতো, সাধারণ মানুষের ওপর এদের আস্থা আছে সামান্যই।

আরো ঝামেলাপূর্ণ বিষয় হলো, এই দুটি ব্যবস্থা একে অপরের শক্তি বাড়াচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের লেকচারার মনক এ নিয়ে খুব বেশি কথা না বললেও এই সময়ের জন্য এখানেই বিরাম নেওয়া ভালো। লোকরঞ্জকবাদীদের শক্তি সংগ্রহের সময়টিতে তাদের প্রতিপক্ষরা সম্ভবত অগণতান্ত্রিক উদারবাদের গুণাগুণ দেখছে। অগণতান্ত্রিক উদারবাদ শক্তিসঞ্চয় করলে অনেক সাধারণ মানুষের মনে খাচাবদ্ধ হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, সরকারি নীতি সাধারণ মানুষের দাবির প্রতি সাড়া দেয় না। ফলে তাদের মনে এলিটদের উৎখাত করার বাসনা জাগে। এমন অনিবার্য পরিস্থিতিতে যার পরাজয় অবধারিত হয়ে যায় তা হলো উদার গণতন্ত্র।

মনকের বইটির সবচেয়ে বড় একটি শক্তি হলো এই যে তিনি সহজ, একক ব্যাখ্যার ওপর অবস্থান করেছেন। এর ফলে সমাধান পাওয়া গেছে সহজেই। উদার গণতন্ত্রকে তার শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য মনক তিনটি নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অসম বণ্টন দূর করা ও প্রযুক্তিগত এবং বিশ্বায়ণের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা প্রশমিত করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডাই হবে সবচেয়ে বড় সমাধান। ন্যূনতম কার্যকর সমাধান- সম্ভবত এটিই সবচেয়ে কঠিন- হবে এমন এজেন্ডা তৈরি যা ‘নাগরিক বিশ্বাস,’ তথ্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা, নাগরিক সৌজন্যতাবিষয়ক আমাদের অনুভূতি ফিরিয়ে আনবে। এই বিষয়ে আরো নজর দেওয়া উচিত। কারণ যে প্রান্তিক সমাজে খুব কম লোকই বাস্তবতা অনুসরণ করে এবং যেখানে নাগরিক শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে, সেখানে নীতিগত পরিবর্তন সাধন কিভাবে সম্ভব তা অস্পষ্ট।

অবশ্য সবচেয়ে আগ্রহ সৃষ্টিকারী পরামর্শ সম্ভবত নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদের কল্পনা করা। মনক একে অভিহিত করেছেন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ।’ প্রান্তিকতাপূর্ণ জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রতি সাড়া দেওয়ার বদলে স্বপ্নিল বহুজাতিকতার এগিয়ে যেতে হবে। মনক বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন ‘পরিশীলিত জাতীয়তাবাদের’। তিনি সমন্বিত সমাজের একটি স্বপ্নদর্শনও প্রস্তাব করেছেন। এখানে জাতীয়তাবাদ লোকজনকে বিভক্ত না করে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

যারা গড্ডালিকা প্রবাহ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা পোষণ করে, তাদের কাজে এই এজেন্ডার তিনটি অংশই অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। অর্থনৈতিক সংস্কার সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী লোকজন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। নাগরিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার অর্থ হলে সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গোত্রবাদ ভেঙে ফেলা। অন্তর্ভুক্তমূলক জাতীয়তাবাদ ডান ও বাম উভয় ধরনের বাগাড়ম্বড়তাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।