Home » প্রচ্ছদ কথা » নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন-নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র : রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্দরে-বাহিরে

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন-নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র : রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্দরে-বাহিরে

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির ও ভিতর ব্যাপারটা প্রথমেই পরিষ্কার করে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির বলতে, যা কিছু প্রকাশিত, ঘোষিত এবং প্রতিটি পক্ষই নিজের বক্তব্য মেনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ভিতরের ব্যাপারটা অতটা প্রকাশিত নয়, কেউ বললেও প্রত্যাখান করছেন বা নিরব থাকছেন। আমরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের যা কিছু গণমাধ্যমে পাচ্ছি সেটা বেশিরভাগ বাইরের রূপ। দ্বন্দ্বের বাইরের রূপটা মিথ্যা বা অসত্য বলছি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেতরের বিষয়টা প্রকাশিত ও জানা না গেলে দ্বন্দ্বটা পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবেনা। ভিতরের সত্য ঘিরে সব যুগে রহস্য থাকে। আমরা যাকে রাজনৈতিক গসিপ বলি তা দ্বন্দ্বের ভিতরের উপাদান ঘিরে। কিন্তু এটাও ঠিক চলতি রাজনৈতিক ধারায় ও ভিতরের সত্য জানার ও উদঘাটনের প্রচেষ্টা আছে। স্ট্রিং অপারেশন সেরকম একটি প্রচেষ্টা। স্ট্রিং অপারেশন এর মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যমে ও শাসকদলের মধ্যে অর্থের বিনিময় সহযোগিতার করার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্রিং অপারেশন বাইরেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গবেষণা, সাক্ষাৎকার – রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভিতরে আলো ফেলতে চেষ্টা করা হচ্ছে; সময় ও ইতিহাস ভিতরে সত্যটা তুলে ধরে। ভিতরের সত্য অনুসন্ধানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দর্শণ গুরুত্বপূর্ণ। ভিতরের বিষয় বলতে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ ক্ষেত্রে নয়া উদারনৈতিক, রক্ষণশীল, কর্তৃত্ববাদী দর্শনের পার্থক্যের কারণে ভিতরের বিষয় ব্যাখা বিশে¬ষণে পার্থক্য হয়। বলা হয়ে থাকে কোন চোখ থেকে দেখছি। এ চোখ তৈরী হয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তি ও শ্রেণী স্বার্থে রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিবর্তন হয়, দেখার চোখ এক হয়না। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বর্তমান রাজনীতির বাইরের ও ভেতরের বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। বাইরের বিষয়গুলো অর্থাৎ নিবার্চন ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা; এর ভিতরের বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা ও রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তন আনার বহুমুখী কৌশল।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের পর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহিরের দিকটায় রূপান্তর হয়েছে- এখন জোরেশোরে উন্নয়নের নামে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর শুরু ২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন থেকে। এ নির্বাচনকে প্রতি-নির্বাচনই (Counter Election)  বলবো। নির্বাচনকে নির্বাচন দিয়ে ধ্বংস  না করা হলেও এর ক্ষয় করা হয়েছে। ১৫৪ জন সাংসদ প্রতিযোগিতাহীনভাবে নির্বাচিত হয়েছেন; এধরনের একটি নির্বাচনের বৈধতা অর্জন দেশে বিদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শাসকদলে। কিন্তু শাসকদল গিনেস বুক রেকর্ড তৈরী করে এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সব প্রশ্নকে নিঃশেষ করতে সফল হয়েছেন।

শাসকদল এমন একটা অবস্থা তৈরী করলেন, নির্বাচন কিভাবে হয়েছে সেটা বড় কথা নয়- দেশ কিভাবে চলছে দেখুন, দূর্বল নয়, শক্তিশালী’র শাসন। শক্তিশালী শাসক ও শাসন আপনাকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পৌঁছে দেবে- এভাবে কারো ধারণা থেকে নয়, শাসকদের অন্তর্গত দর্শণ থেকে বেরিয়ে আসে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে সকলে যে যার কাজ করতে পারবেন, তবে কেউই সীমা লংঘন করতে পারবেন না, সীমা লংঘন করলেই শাস্তি ও বিতাড়ন। সীমার মধ্যে থাকলে শান্তি ও পুরষ্কার। মিলিয়ে দেখুন প্রধান বিচারপতি যতদিন সীমার মধ্যে ছিলেন, পুরষ্কার পেয়েছেন, যখনই সীমা লংঘন করেছেন তখনই ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। খালেদা জিয়া যখন আন্দোলন পরিহার করে ব্যক্তিগত দলীয় জীবন যাপন করেছেন, তখন বড় কোন শাস্তি ছিলনা, কিন্তু খালেদা জিয়া উন্নয়নমুখী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের হুমকি হতে পারেন, তখনই ভিন্ন পরিস্থিতি। তাদের মনোবাসনা, নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে ‘‘তাদের নির্বাচন’’ উন্নয়নের অন্তরায় না হয়। কাজেই ৫ই জানুয়ারী-২০১৪ এর মতো অতোটা নয়, ২০১৮/১৯ এর পোষাক পড়িয়ে ভদ্র নির্বাচন করা, যেখানে সকলে অংশগ্রহণ করবে, সাংসদ নির্বাচিত হবেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন বর্তমান শাসক দল ও সরকার গঠন করবেন তারা-এটাই ভাবনা। বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরের চেহারাটা এরকমই দাড়িয়েছে।

ভিতরটা বোঝার মত তথ্য উপাত্ত কম। দ্বন্দ্বের ভিতরটা পরিষ্কার নয়, বিরোধী দলের কাছে তাদের প্রশ্ন হচ্ছে  খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন না আন্দোলন? এর মধ্যে আন্দোলনের কোন ঈঙ্গিত নাই, দানা বাঁধেনি আন্দোলনের বিষয়; আন্দোলনের খতম। এখানে প্রশ্ন দাড়িয়েছে নির্বাচন হবে, না নির্বাচন বয়কট। শ্লোগান কী হবে- খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন হবে না।

দ্বন্দ্বের ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে, কিভাবে শাসকদলে বৈরিতা করছে, করবে? নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় শক্তির সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। সাধারণভাবে সরকারী কর্মচারীদের আগাম পুরস্কৃত করা হচ্ছে, গত দু’আমলে একদল উপকারভোগী তৈরী হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের সফল যাত্রা শুরু হবে কি? রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এখন বর্তমান বাইরের ও ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের একটি কাঠামোগত দূর্বলতা রয়েছে। আপাতত: সকল অনুগত, সকল নিয়ন্ত্রিত নাগরিক কিন্তু সকলের চিন্তা, মনন প্রক্রিয়া, রাগ হিংসা নিয়ন্ত্রন পরিধির বাইরে থেকে যায়, এখানেই ভয়। এই ভীতি  শুধু যে শাসকদলের তাই নয়, জনগণেরও। কারণ চাপা রাগ-হিংসা বিষ্ফোরণ খুবই বিপজ্জনক হয় সকলের জন্যই।