Home » অর্থনীতি » মধ্যবিত্তের উপরে অর্থমন্ত্রীর কেনো এতো গোস্বা?

মধ্যবিত্তের উপরে অর্থমন্ত্রীর কেনো এতো গোস্বা?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশে বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল খুব একটা নেই। বাজেট কখন উত্থাপিত হয়, কখন পাস হয়, সাধারণ নাগরিকরা তা নিয়ে ভাবেন না; অনেক সময় খোঁজখবরও রাখেন না। তবে সাধারণ মানুষের বাজেট ভাবনা হচ্ছে কোন কোন জিনিষের দাম সরকার বাড়ালো, কিংবা কতো টাকার আর্থিক চপ বেেস পড়লো । এছাড়া তখনই চিন্তাটা দেখা দেয় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আবার একশ্রেণির ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার আগেই বাজারে সংকেত দেওয়া শুরু করে বাজেট আসন, দাম  বাড়বে! ওসব ব্যবসায়ী বাজেট পাসের আগেই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনার পর বাজেট ভাবনাকে আর অগ্রাহ্য করেনা।

সাধারণত মধ্যবিত্ত হিসেবে একটি দেশের জনগোষ্ঠীর সেই অংশকে বিবেচনা করা হয়, যারা সীমিত আয়ের জীবনযাপন করেন। বাংলাদেশে পেশা বিচার করলে এদের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী, গবেষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, ছোট ঠিকাদার, গ্রামীণ উদ্যোক্তা এবং মাঝারি কৃষকেরা পড়েন।

বাজেটের বিশাল আকারের ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এ বাজেটের মূল লক্ষ্যবস্তু যেহেতু প্রবৃদ্ধি সেহেতু এর আকার ওই টার্গেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। প্রবৃদ্ধি ভিন্ন এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এটি পুরোনো কথা। নতুন কথা হলো, প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয় এবং প্রবৃদ্ধি নিজে গিয়ে সব মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটবে না বা  তাদের জন্য উন্নয়ন আসবে না। সেজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও  বণ্টনমূলক ব্যবস্থা।

বাজেটে সাধারণ জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে- স্থানীয় মধ্যবিত্ত যেসব পণ্যের চিহ্নিত গ্রাহক বাজেট বক্তৃতায় সেগুলোর ওপর বাড়তি করারোপের উল্লে¬খ করেছেন অর্থমন্ত্রী। নানা সেবাকেও ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে সরকারের। বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেই এমন উদ্যোগ। এটি অসহায় বাস্তবতা যে, চ‚ড়ান্ত বিচারে সিংহভাগ ভ্যাট মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকেই গুনতে হবে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে এবার। তেমন কোনো প্রস্তাব আসেনি। তার মানে আয়করের প্রধান টার্গেটও ওই মধ্যবিত্তই এবং এক্ষেত্রে আহরণ সুবিধাই প্রধান বিবেচ্য বলে প্রতীয়মান। অথচ প্রয়োজন ছিল আয়করের ক্ষেত্রে আয়ের উচ্চস্তরে জোরটা বেশি দেওয়ার । মধ্যবিত্তকে কর বেশি দিতে হয়, এ নিয়ে কারও আক্ষেপ থাকা উচিত নয়। কেননা গুটিকয়েক দেশ বাদ দিলে সাধারণভাবে মধ্যবিত্তরাই সর্বজনীন বৃহত্তম করদাতা (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর) গোষ্ঠী এবং অর্থনীতির মেরুদন্ড ।

প্রস্তাবিত বাজেটে সিটি করপোরেশন এলাকার কারও যদি আট হাজার বর্গফুট বা এর বেশি আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে, তাহলে ওই বাড়িওয়ালার আয়করের ওপর সারচার্জ বসবে। এই সারচাজের্র পরিমাণ ওই বাড়িওয়ালার আয়ের ১০ শতাংশ বা কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। বাড়িওয়ালা স্বাভাবিকভাবেই নিজের খরচ কমাতে ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন।

মধ্যবিত্তদের যাতায়াতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আনতে শুরু করেছিল রাইড শেয়ারিং উবার, পাঠাওয়ের মতো গাড়ি ও মোটরসাইকেল। উবার, পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বসিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এমনকি এসব রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ওপর ৩ থেকে ৪ শতাংশ উৎসে করও বসানো হয়েছে। এতে এসবের সেবা নেওয়ার খরচ বাড়বে।

কর বসেছে পোশাকেও। দেশি ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ কিনতে এখন থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে। আগে ভ্যাট ছিল ৪ শতাংশ, এখন হয়েছে ৫ শতাংশ। খরচের কথা চিন্তা করে দেশি ব্র্যান্ডের পোশাক বাদ দিলেও রক্ষা নেই। বড় দোকান থেকে জামাকাপড় কিনলেও ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে, যা আগে ছিল না।

বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন সব মধ্যবিত্তেরই থাকে। কিন্তু এই বাজেটের পর ছোট ফ্ল্যাট কিনতে গেলে খরচ বাড়বে। ১১০০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাটে ভ্যাট দেড় থেকে দুই শতাংশ আরোপ করা হয়েছে। এতে ৫০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে অন্তত ২৫ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হবে। আবার নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, রিকন্ডিশন্ড গাড়িতেই ভরসা মধ্যবিত্তের। বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অবচয়ন সুবিধাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাতে গাড়ির দাম বাড়বে। অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি শিগগিরই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাবেন। আবার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগও কমানো হয়েছে।

নৈরাজ্যের ব্যাংকিংখাতের উল্টো নীতিতে চলছে সরকার। পরিবারের পরিচালক সংখ্যা ও মেয়াদ আগেই বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ কোন সুবিধা পাবে না। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারাও কোনো সুবিধা পাবেন না। এই ছাড়ের কারণে বৃহৎ করদাতাদের কাছ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য বন্ধ না করে, ব্যাংক ব্যবসায়ীদের চাপে করপোরেট কর হার কমানোর সিদ্ধান্ত অনিয়মকে আরো উস্কে দেবে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এখন সবচেয়ে দুর্বলতম দিক চলতি হিসাব ঘাটতি। বৈদেশিক বিনিময়ের লেনদেন কাঠামো। বর্তমানে মেগাপ্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যাপক আমদানি করা হচ্ছে। তাছাড়া আমদানির মাধ্যমে বাইরে অর্থ পাচারও হচ্ছে। এসব যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে টাকার মূল্যমানের উপর চাপ সৃষ্টি হবে।

চলতি হিসাবের ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বাজেটে কিছু বলা হয়নি। আমদানি ব্যয় গড়ে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ার ফলে ডলারের দাম বাড়ছে। রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ডলারের বিনিময় মূল্য স্থিতিশীল না থাকলে বাণিজ্য ভারসাম্য নষ্ট হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং অর্থ পাচারের আশঙ্কাও থেকে যায়।

যুগে যুগে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় উন্নয়নে মধ্যবিত্তের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের দেশও এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। কেননা এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজ সুষ্ঠু চিন্তার ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে মধ্যবিত্তের একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রের মৌল-কাঠামো অর্থনীতি কার্যত রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামাজিক উন্নয়নের সূচক বৃদ্ধি করে। তখন মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও যে তিনটি ভিত্তি ছিল অর্থাৎ মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার- তা এখনো পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি যে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি নিরন্তর জীবন-সংগ্রাম করে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল- সেটাও আজ এক ধরনের সংকটে নিপতিত।  একই সঙ্গে সমাজের স্থিতি ও পরিশুদ্ধ সামাজিক সংস্কার যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে হয়, নানা আর্থিক টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আজ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ সামাজিক ঐতিহ্যসম্পন্ন একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, স্বজনরা হচ্ছে অবহেলিত, উপেক্ষিত। রাষ্ট্রে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে আর্থিক শৃংখলা না থাকায় প্রাত্যহিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কতিপয় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। এতে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।  ফলে এই কোঠারিভুক্ত স্বার্থান্বেষী সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে তারা খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে মধ্যবিত্তসহ সাধারন মানুষ।