Home » অর্থনীতি » রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ- ৩ :: প্রকল্পে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহন !

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ- ৩ :: প্রকল্পে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহন !

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে কিছু সহায়তা নিচ্ছে। এর একটা বড় অংশ জাতীয় পরমাণু কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি। পাশাপাশি রূপপুর প্রকল্পের জন্যও জনবল প্রশিক্ষণসহ কিছু সহায়তার বিষয় আছে। এর বাইরে রাশিয়াও রূপপুর প্রকল্পের মৌলিক কাজে রাশিয়াকে যুক্ত করেছে। ফলে ভারতের অংশগ্রহণ হয়ে উঠছে সার্বিক।

এ ধরণের একটি পরিকল্পনা ভারতের ছিল। রাশিয়ার ছিল আগ্রহ। গত ১ মার্চ (২০১৮) মস্কোতে বাংলাদেশ, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) সই হয়েছে তা এই দুয়েরই ফল। এর মাধ্যমে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার সহযোগিতার সম্পর্ক যেমন নুতন মাত্রা পেল তেমনি ভূ-রাজনীতির মঞ্চে ও আন্তর্জাতিক পরমাণু ক্লাবে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হলো। এর মাধ্যমে ভারত চীনকেও বাগে রাখতে রাশিয়াকে পাশে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে এই সমঝোতার অংশ হয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে বা করতে চাচ্ছে সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো প্রকাশ্যে কিছু বলা হয়নি।

ওই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ভারত শুধু যে তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং প্রকল্পের জন্য পরামর্শ সেবা দিয়ে সহায়তা করবে তা নয়। প্রকল্পের স্বার্থে ভারতীয় কোম্পানিগুলো প্রকল্পের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন, এমনকি ভারতে উৎপাদিত কিছু সামগ্রী (ম্যাটেরিয়াল) এবং কিছু কিছু যন্ত্রপাতিও (নন-ক্রিটিক্যাল ক্যাটাগরি) সরবরাহ করবে।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর রোসাতোমের উপ মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) নিকোলাই স্পাস্কি এক বিবৃতিতে এ সব কথা বলেছেন। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ এবং ভারতের কিছু কিছু গণমাধ্যম এই খবর প্রকাশ করেছে। ওই সমঝোতা স্মারকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন মস্কোতে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সাইফুল হক, মস্কোতে ভারতের রাষ্ট্রদূত পংকজ শরণ এবং রোসাতোম তথা রাশিয়ার পক্ষে নিকোলাই স্পাস্কি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) কাজ করেছেন এধরনের কয়েকজন পেশাজীবী  বলেছেন, ভারত পৃথিবীর পরমাণু বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ (এনএসজি)-এর সদস্য নয়। এই গ্রুপের সদস্য ছাড়া কোনো দেশ পরমাণু চুল্লি (রিঅ্যাক্টর) নির্মাণে সরাসরি অংশ নিতে পারে না।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) অনুযায়ী, প্রকল্পের পূর্ণ (এ টু জেড) বাস্তবায়নের দায়িত্ব রোসাতোম তথা রাশিয়ার। অর্থাৎ এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতির নকশা প্রণয়ন, উৎপাদন, সরবরাহ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ তাঁদেরই করার কথা। তাই এ সব কাজে অন্য কোনো দেশ বা তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করা বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ কিনা এনিয়ে আইনগত প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া, তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা সামগ্রীর মান ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী নিশ্চিত হবে কিনা, এ সব সামগ্রির দাম ওই চুক্তিতে ধরা দামের সমান হবে কিনা- এ সব প্রশ্নও সংশ্লিষ্ট মহলে দেখা দিয়েছে।

তবে ত্রিদেশীয় সমঝোতা স্মারক হওয়ায় বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ হয়েছে কি না জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী, কোম্পানি ও চুক্তি আইনে অভিজ্ঞ তানজীব-উল আলম এই প্রতিবেদককে বলেন, ক্রেতার (বাংলাদেশ) যদি কোনো আপত্তি না থাকে, প্রকল্পের ক্রেতা যদি তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ মেনে নেয়, সে ক্ষেত্রে চুক্তির বরখেলাপ বা আইনের ব্যত্যয় হবে না।

আর তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা জিনিসপত্রের মান ও দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পরমাণু প্রকৌশলী, যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৩০ বছর কর্মকাল শেষে অবসর নেওয়া মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকটি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের ‘এ টু জেড’ করার কথা রাশিয়ার। ভারতের সরবরাহ করা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতির কারণে, তা যতই মাইনর হোক না কেন, যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তার দায় কে নেবে? বাংলাদেশ, রাশিয়া নাকি ভারত?’

মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও এর কিছু সামগ্রি তৈরিতে ভারত অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রয়োজন হলে আমরা আলাদাভাবে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে সে সব বিষয়ে সহায়তা নিতে পারি। জনবল প্রশিক্ষনসহ কিছু কিছু বিষয়ে তা নেওয়াও হবে বলে দুই দেশের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সমঝোতা হয়ে আছে। এর বাইরে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কোনো চুক্তির আওতায় আমরা ভারতের সহায়তা নেব কেন? তাহলে তো রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের চুক্তি সংশোধন করে নেওয়া উচিৎ।’

রূপপুর প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে বলেন রোসাতোমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেক্সি লিখাচেভ। গত বছর জুন মাসে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে রূপপুর সংক্রান্ত এক আলোচনায় লিখাচেভ বলেন, ২০১৬ সালে ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ব্রিকস’ শীর্ষ সম্মেলনের সময় ভারতের পক্ষ থেকে তাঁদের দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের ধারণাটি উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি করেনি।

এরপর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আইএইএর সাধারণ সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণকারী উর্ধতন কর্মকর্তারা রূপপুর প্রকল্পের জন্য ভারত থেকে কিছু যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ সামগ্রি (ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস) সরবরাহের প্রস্তাব দেন। ‘রোসাতোম নিউজলেটার বাংলাদেশ’-এর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের সংখ্যায় (ইস্যু ০০৮) এই খবর প্রকাশিতও হয়েছে।

ওই সময় ভারতের ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর এক খবরে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কিভাবে একটি অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে রাশিয়া ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে ভারত। বিদেশের মাটিতে রূপপুরই হবে ভারতের প্রথম কোনো পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশগ্রহন।

২০১৪ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার ‘স্ট্রাটেজিক ভিশন ফর স্ট্রেনদেনিং কো-অপারেশন ইন পিসফুল ইউসেজ অফ অ্যাটমিক এনার্জি’-তে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশে রাশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সেখানে ভারতের নির্মাণ সামগ্রি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সেবা প্রদান করা যায় কিনা দুই দেশ তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবে। গত ১ মর্চের এমওইউ এই স্ট্রাটেজি (কৌশল) বাস্তবায়নের মাধ্যম হতে যাচ্ছে।

গত বছর (২০১৭) এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও উন্নয়নে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে তার আওতায় ভারতের কাছ থেকে রূপপুর প্রকল্পের জন্য পরামর্শক সেবা নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণে ভারতের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশী পেশাজীবীরা তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিতে শুরুও করেছেন।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পের জন্য সরকার ভারতের ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপ (জিসিএনইপি)’-এর কাছ থেকে পরামর্শক সেবাও নিতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে জিসিএনইপির সঙ্গে শিগগিরই চুক্তি সই হওয়ার কথা। এগুলো সবই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে রাশিয়া রূপপুর প্রকল্পে তাঁদের কাজের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করার জন্য ১ মার্চের এমওইউ করেছে যার অংশ হয়েছে বাংলাদেশ।

রূপপুর প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ‘ইউরেশিয়ারিভিউ ডট কম’ নামের একটি ইন্টারনেটভিত্তিক পত্রিকায় বলা হয়েছে, ভারতের জন্য এই সমঝোতা স্মারক অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, রূপপুর প্রকল্পে অংশগ্রহণের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ভারত এক্সপোজার পাবে। রুশ বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে প্রকল্পের সকল পর্যায়ের নির্মাণকাজে অংশ নিতে পারবে যা ভবিষ্যতে ভারতকে রুশ প্রকৌশলী ও বাংলাদেশের পেশাজীবীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য সম্পর্কে জানা এবং সে সব তথ্য ব্যবহারের সামর্থ্য অর্জিত হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। এই অভিজ্ঞতা তাঁরা অন্য দেশেও কাজে লাগাতে পারবে। মোট কথা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘নলেজ পার্টনার’ হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অঙ্গনে ভারত একটি দায়িত্ব সম্পন্ন দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। এখানকার অভিজ্ঞতা নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের সদস্যপদ পেতে সহায়ক হবে। সব জেনে-বুঝেই ভারত সুপরিকল্পিতভাবে রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার সঙ্গী হয়েছে।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ১২৬৮ কোটি ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে বাংলাদেশ-রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তিতে। এই ব্যয়ের ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। তবে এর বাইরেও, এই প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের জন্য আরও প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা।