Home » বিশেষ নিবন্ধ » শিষ্টাচার মিথ্যাচার অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা

শিষ্টাচার মিথ্যাচার অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু:

এক. মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিনে সাড়ে ছয়টা মিথ্যা কথা বলেন! অবাক হচ্ছেন তো? তথ্যটি ওয়াশিংটন পোষ্টের একটি জরীপের। তাদের হিসেব অনুযায়ী ক্ষমতারোহনের ৪৬৬ দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৩ হাজার ১টি মিথ্যা বলেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিনের গড় ৬ দশমিক ৪। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১’শ দিনে তার মিথ্যা বলার হার ৪ দশমিক ৯। কিন্তু গত এপ্রিল-মে মাসে এই হার বেড়েছে দ্বিগুন। অর্থাৎ দিনে ৯টি মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প।

ওয়াশিংটনের পোষ্টের পরিসংখ্যান আরো জানাচ্ছে, অনেক মিথ্যা আছে যা তিনি বারবার বলছেন। এরকম ১১৩ টি মিথ্যা রয়েছে – যা ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন। উপসংহারে বলা হয়, শাসনকাল যত পুরানো হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের মিথ্যা বলা তত বাড়ছে। সিএনএন ভাষ্যকার ক্রিস সিলিজার জানাচ্ছেন, ডাইনে-বাঁয়ে মিথ্যা বলেন এমন কোন প্রেসিডেন্ট আমেরিকায় আগে কখনও ছিলেন না। জর্জ বুশ বা বারাক ওবামা দিনে কতবার মিথ্যা বলেছেন তার হিসেব কেউ রাখেনি। কারন ট্রাম্পের মত তারা কেউ মিথ্যা বলতে এবং সেই মিথ্যা বারবার আওড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন না।

ট্রাম্প যা বলেছেন তার মধ্যে মিথ্যা আবিস্কৃত হচ্ছে এবং গণমাধ্যম তা জানিয়ে দিচ্ছে। কারন সে দেশে রয়েছে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের দায়। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি প্রেসিডেন্টের মিথ্যাকেও সনাক্ত করার সক্ষমতা  পেয়েছে। গণতন্ত্র চর্চার ফল হিসেবে গণমাধ্যম সত্য সংবাদ পরিবেশনে কাউকে পরোয়া করছে না। বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটা। এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের মধ্যে প্রতিষ্ঠানসমুহ দুর্বলতর হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। বিপরীতে কর্তৃত্ববাদ প্রধান হয়ে উঠেছে।

এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র যেহেতু সবসময় ব্যক্তিমুখীন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলিও ব্যক্তির মুখের দিকে চেয়ে  বলতে ও চলতে অভ্যস্থ। শক্তিমান নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনস্বার্থের বদলে এখন ব্যক্তি ও দলকে সন্তষ্ট করার সাংবাদিকতা সবকিছু ছাপিয়ে উঠছে। ফলে শীর্ষ ব্যক্তিদের কথিত সত্যভাষণ জনমানুষকে খুশি করছে না ব্যথিত করছে-এই প্রশ্ন গণমাধ্যম তুলতে সক্ষম নয়। বরং তারা সামিল হয়েছেন, ক্ষমতার সাথে ইদুর-বেড়াল খেলায়। রাজনীতিতে গণতন্ত্রহীনতা ও স্থিতিশীলতার অভাবই কী এইসব রাজনৈতিক-সামাজিক মনোবৈকল্যের কারন?

দুই. প্রাচীন কবিরা বলে গেছেন, “যে কহে বিস্তর, মিথ্যা কহে বিস্তর”। আবার চালু প্রবাদটি হচ্ছে, “কথায় কথা বাড়ে”। সেসব কথার কতটুকু সত্য-কতটুকু মিথ্যা তাও বিবেচনা ও প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের রাজনৈতিক নেতারা কথা বলতে ভালবাসেন। এমনকি সেসব কথা দল বা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও পরোয়া নেই। কথা বলতেই হবে। জনগনও কথা শুনতে ভালবাসে। শীর্ষে যারা থাকেন তাদের কথা মানুষ শোনে আগ্রহভরে। কারন কথামালার রাজনীতি এখানে জনপ্রিয়। নেতা কম কথা বলবেন এটি প্রত্যাশিত নয়। আর সরকার প্রধান বা দলপ্রধান হলে তো কথাই নেই!

রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক বিষয়ে মনোভাব বোঝা যায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য থেকে। প্রধানমন্ত্রী সবশেষ সংবাদ সম্মেলন করেছেন গত ২ মে ২০১৮ তারিখে। সেখানে তিনি কথা বলেছেন, সাম্প্রতিককালের বেশকিছু স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে, বেশ খোলামেলাভাবে। তিনি কথা বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, সড়ক দুর্ঘটনা, আগত জাতীয় নির্বাচন এবং স্বভাবতই প্রধান প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার কারাদন্ড নিয়ে। বলেছেন আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা নিয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার বলেছেন,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেলো তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)।

তিন. প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি  চুড়ান্ত সত্য ! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কি রাজীবের হাত হারানো এবং অন্তিমে মৃত্যু কিংবা গৃহকর্মীর পা হারানোর মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হয়েছে রাজীবকে। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

দেরী করেননি নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেলেন “সড়ক পথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, আবার কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলো: ৫ মে ২০১৮)।

অতিসম্প্রতি ঢাকায় একজন সংসদ সদস্যের গাড়ি চাপায় একজন নিহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে সংসদ সদস্যের পুত্র গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সেটি অস্বীকার করতে গিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ঐ সংসদ সদস্যের স্ত্রী, যিনি একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, যা বলেছেন তা প্রধানমন্ত্রীর কথারই প্রতিধ্বনি মাত্র। তিনি দাবি করেছেন, পথচারী সতর্ক না হলে ড্রাইভারের কি করার থাকতে পারে!

চার. গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

‘ন্যাশনাল কমিটি টু প্রোটেক্ট শিপিং, রোডস এ্যন্ড রেলওয়ে’ নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপোরোয়া গাড়ি চালনা। ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ক্রুটিপূর্ণ  যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

এবারের ঈদযাত্রায় ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় অপ্রতিরোধ্য গতি পেয়েছে দুর্ঘটনার মৃত্যু। শুধু সড়কে নয়, রেলপথ-নৌপথ, কল-কারখানা সর্বত্রই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর। দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায় না, কারন তারা সংগঠিত। এসব সংগঠনের সাথে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ ব্যক্তিরা যুক্ত থাকে, সমর্থনও থাকে। কোন ব্যবস্থার সূচনা ঘটলেই ধর্মঘট, অবরোধসহ দেশকে তারা জিম্মি করে ফেলে।

সরকারপক্ষ, যখনই যারা ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক-ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে পরিবহন সেক্টর এবং শ্রমিক সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করছে। সরকার থেকে দায়িত্বশীল কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফল হয়েছে ব্যক্তিখাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা সঙ্গী করে। রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক নেতারা শ্রমিকদের নিয়ে মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তুলছে, মালিক হচ্ছে বিপুল অর্থ-বিত্তের।

এই বিশৃঙ্খল অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে সড়কে মানুষ মরছে। পৃথিবীতে দুর্ঘটনা বন্ধের কথা না ভাবা হলেও কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। কিন্তু এই দেশে সেটি তো দুরে থাক, বিশৃঙ্খল ও মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত করে একটি সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও কি আছে?