Home » বিশেষ নিবন্ধ » বামদের হাতুড়ি ছিনতাই!

বামদের হাতুড়ি ছিনতাই!

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু ::

এক. উৎপাদনের মূল শক্তি কৃষক-শ্রমিকের প্রতীক হিসেবে কাস্তে-হাতুড়ি সারা দুনিয়ার কমিউনিষ্টদের লাল পতাকায় উদ্ভাসিত। সর্বহারা শ্রেনীর রাজনৈতিক দল হিসেবে এ নিয়ে তাদের গর্বও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার এবং ডিগবাজীতে কথিত বাম কমিউনিষ্টরা পেটি-বুর্জোয়াদের সাথে মিলে-মিশে ক্ষমতার অংশীদার। ফলে কাস্তে-হাতুড়ির নিয়তি সেভাবেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। হাতুড়ি পরিনত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের সংগঠিত সন্ত্রাস ও মানুষকে পঙ্গু করে দেয়ার হাতিয়ারে।

বহুকাল বাদে হাতুড়ি আবার ফিরে এসেছে।  চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে ও শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করতে ছাত্রলীগ ব্যবহার করছে হাতুড়ি। সেজন্য এখন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বাক্যটি হচ্ছে, “হাতুড়ির নিচে জীবন”। আশির দশকে রফিক আজাদের লেখা কবিতার শিরোনাম বছর-যুগ পেরিয়ে বারবার ফিরে আসছে নিপীড়নের হিংস্রতায়। আন্দোলন দমন করতে হাতুড়িপেটা করে শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করে দিতে চাইছে ছাত্র নামধারী রাজনীতিকরা।

এরশাদের রক্তাক্ত সামরিক নিপীড়নকালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্র-জনতার ওপর নেমে এসেছিল হাতুড়ির আঘাত। সব ধুয়ে মুছে এরশাদ এখন ক্ষমতার অংশীদার এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তিনি নিজেই সম্ভবত: হাতুড়ি মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হচ্ছেন! কারন সেকালেই সম্প্রতি প্রয়াত: কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন তার গনগনে কবিতা “হাতুড়ির নিচে জীবন”। মাত্র তিন শব্দবন্ধের এই বাক্য বুঝিয়ে দিয়েছিল স্বৈরাচার কিভাবে হাতুড়ির আঘাতে মানুষের অধিকার ছিন্ন-ভিন্ন করছে।

২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচনের পরে মানুষের ওপর মধ্যযুগীয় নির্যাতনে ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে হাতুড়ির। সে সময়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট অন্যান্য অস্ত্রের পাশাপাশি হাতুড়ি ব্যবহার করে হত্যা করেছে মানুষ, পঙ্গু করে দিয়েছে চিরতরে। ওই নির্বাচনের পরপর বাগেরহাটে সংবাদ সম্মেলনে হামলা করে হাতুড়ি পেটা ও ক্ষুরাঘাতে জখম করেছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকদের।

দুই. যে সকল শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন কেমন? বিষয়টি নিয়ে আলাদা পরিসরে বলার ইচ্ছে আছে। খানিকটা প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক, সব মিলিয়ে অনেকের জানা অনেক ঘটনার একটি মনে করিয়ে দিচ্ছি। ২০১৬ সালের ফরিদপুরের শ্যামপুর গ্রামের অটোরিক্সা চালকের ছেলে হাফিজুর মোল্ল্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল মার্কেটিং বিভাগে। অনেকের মত ঢাকায় আবাসন ছিল না তার। হলেই উঠতে হয়েছিল। জায়গা মেলে এসএম হলে দক্ষিণের বারান্দায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে হলগুলির সিট, তা যেখানেই হোক, বরাদ্দের মালিক ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন। এলাকায় পরিচিত বড় ভাই হল শাখার সাধারন সম্পাদক। তার সুবাদেই হাফিজুর বারান্দায় শীতের মধ্যে খোলা জায়গায়। এর সাথে জোটে নেতাদের ‘গেষ্ট রুম ডিউটি’। ফলাফল নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পথে ফেরীতে মৃত্যু। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ক্ষমতাসীন ছাত্র নেতারা এই মৃত্যুর দায় নিতে চায়নি। শুধু হাফিজুরের পিতা বুঝতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর স্বপ্নের কি মর্মান্তিক পরিনতি!

হাফিজুরের করুণ মৃত্যু মধ্য দিয়ে মানুষ জানতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয় গেষ্টরুম ডিউটি সম্পর্কে। ২০০১ সালে বিএনপি জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রতিটি হলেই চালু হয় গেষ্টরুম। এটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের আইন-কানুন শেখানোর জন্য নির্ধারিত স্থান। এখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। রাত ৯টার পরে সাধারনত: শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ’সহবত’ থেকে শুরু করে আচরনবিধি সম্পর্কে নেতারা নসিহত করে থাকেন।

তিন. সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন পড়েছে ষড়যন্ত্র তত্তে¡র ঘূর্ণিপাকে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এই আন্দোলনের যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। এরই মাঝে ১৪ দলের বৈঠকে সরকার কোটা আন্দোলন সঠিকভাবে সামাল দিতে পারছে না উল্লেখ করে এই আন্দোলনকে “নির্বাচনী বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দাবি করা হয়েছে। যদিও এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সরকার বা সরকার সমর্থকদের কাছ থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন প্রমান এখনও হাজির করা হয়নি।

“কোটা সংস্কার দাবিতে যে সব শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন তারা বিএনপি-জামায়াত। তারা সরকার ও উন্নয়ন বিরোধী। তারা রাজাকারের বাচ্চা। তারা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীলতা সৃস্টি করতে চায়”। এটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতিক্রিয়া। সাম্প্রতিককালে এটিকে ‘লন্ডন ষড়যন্ত্র’র অংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার মনোনীত উপাচার্য এতটাই এগিয়ে যে তিনি এই আন্দোলনে ‘জঙ্গীবাদের বিশ্বায়ন’ দেখতে পাচ্ছেন। তার এই অত্যুতসাহে ক্ষমতাসীন দলও অস্বস্তি বোধ করছে।

গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা গত তিনমাস অনুসন্ধান করে কোটা আন্দোলনে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দের কারো সাথে বিএনপি বা জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাননি। সুতরাং সরকারের ঢালাও বক্তব্য যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বিষয়টি সন্দেহাতীত। যে কোন দাবি জনগন বা ছাত্রদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তোলা হবে এটিকে স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সরকার যে কোন ন্যায্য দাবির ক্ষেত্রেও সরকার বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালান এবং ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান।

এখানে একটি মজার বিষয় রয়েছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেন। সেটি ছিল ‘মেঘ না চাইতেই জল’ পেয়ে যাওয়ার মতো। কারণ আন্দোলনটি ছিল কোটা সংস্কার নিয়ে। সম্ভবত: প্রধানমন্ত্রী খানিকটা বিরক্ত হয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু কোটা বাতিল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠি সঙ্কাটাপন্ন হবে সেজন্য বাতিলের পক্ষে খোদ আন্দোলনকারীদের মধ্যেও দ্বিধা রয়েছে।

চার. পুলিশ সবসময় নিস্ত্রিয় থাকে না। সরকার পক্ষ হিসেবে তারা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে। কোটা আন্দোলনকারীদের হামলা এবং শিক্ষক লাঞ্চণার বিষয়ে তাদের আগ্রহ ছিল না। তবে উদ্বিগ্ন ও নাগরিকদের সমাবেশ প্রতিহত করতে তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত। সমাবেশস্থল ছিল তাদের দখলে। প্রতিবাদকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সবকিছুই তারা করেছে। সেক্ষেত্রে কোটা সংস্কারপন্থীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পুলিশ ও ছাত্রলীগ অনেকটা সমান্তরাল ভ’মিকা পালন করেছে।

কর্পোরেটাশ্রয়ী সংবাদ মাধ্যম কোটা সংস্কারপন্থীদের ওপর নিপীড়নের বিষয় পাশ কাটিয়েছে অবিমৃষ্যকারীতায়। বিশ্বকাপ নিয়ে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দায়সারা গোছের কিছু খবর দিয়েছেন বটে, কিন্তু তথ্য ট্যুইষ্টিং করে। ছাত্রদের ওপরে দিবালোকে হামলার বিষয়টি অভিযোগের বরাতে রিপোর্ট করা হয়েছে। আন্দোলনরত ছাত্রদের গ্রেফতার ও রিমান্ড বিষয়ও নির্লিপ্ততা ছিল চোখে পড়ার মত। সংবাদ মাধ্যমের কোন অনুসন্ধানী রিপোর্ট বা বিশেষ প্রতিবেদন না থাকার মূল কারন হচ্ছে, এর নেপথ্যে নিয়ন্ত্রন এবং মালিকপক্ষ।

যুদ্ধের সময়ও আশা করা হয় আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা পাবে। আহত ব্যক্তির পক্ষ-বিপক্ষ চিকিৎসকের কাছে বিবেচ্য হবে না-এটিও মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে কোটা আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে। সরকারী হাসপাতাল, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাইভেট ক্লিনিক থেকেও আহত ছাত্রদের বের করে দেয়া হয়েছে। এসব ছাত্ররা ছাত্রলীগের হামলায় গুরতর জখম ছিলেন এবং পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততা অব্যাহত রেখেছেন।

পাঁচ. ছাত্রলীগের ১৪ নেতা-কর্মীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ। লাঞ্চণার শিকার শিক্ষকরা ছাত্রলীগকে দায়ী করে নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাদের সংহতি সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৩ জুলাই তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে এবং রাষ্ট্রপতি বরাবরে স্মারকলিপি দেবেন।

কোটা সংস্কার পদ্ধতির পক্ষে দৃশ্যত: “কোথাও কেউ নেই”। গুটিকয়েক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি এবং নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ অসীম সাহসিকতায় প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সামষ্টিক কোন উদ্যোগ নেই। বরাবরই এই আন্দোলন ষড়যন্ত্র অভিধায়ে আখ্যায়িত হওয়ায়ই কি প্রতিরোধের চিহ্ন নেই? নাকি প্রতিবাদের সীমানা সংকৃচিত করে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে খেলা করছেন সকলে মিলে?