Home » অর্থনীতি » রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-৪ : ব্যয় এখনো চূড়ান্ত নয়, পরামর্শকও রাশিয়ার

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-৪ : ব্যয় এখনো চূড়ান্ত নয়, পরামর্শকও রাশিয়ার

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রকল্প। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের ব্যয় বলা হচ্ছে এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ১৩২০ কোটি মার্কিন ডলার)। অর্থাৎ এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় চারটি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। কিন্তু এটাই রূপপুর প্রকল্পের সব ব্যয় নয়। এই প্রকল্পের জন্য আরো অনেক ব্যয়ের হিসাব নিকাশ বাকি আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুস্কাল (অন্তত ৬০ বছর) জুড়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ, স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়া, যে কোনো সময় রাশিয়ার কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া, পরামর্শক নিয়োগসহ এখনও রাশিয়ার সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন বাকি আছে। এর প্রতিটি চুক্তির সঙ্গেই আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে। তবে সেই অর্থের পরিমান কত তা চুক্তিগুলো না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয় বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পে মালামাল সরবরাহের জন্য নতুন কিছু রেল লাইন স্থাপন, নদীপথ খনন এবং সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য উন্নত মানের সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ আনুসঙ্গিক অনেক কাজের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। সব মিলে এখন পর্যন্ত যে হিসাব সংশ্লিষ্টরা করেছেন তাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্রয় হতে পারে ১৮০০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে রাশিয়ারই একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রুশ সরকারের পক্ষে সে দেশের যে কোম্পানিগুলো রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাদের কাজ যথাযথ হচ্ছে কি না, প্রকল্পের যে সব ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি সেগুলো নির্ধারণে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে কথা বলা, রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চুক্তি অনুযায়ী সব যন্ত্রপাতি ও আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র দিচ্ছে কি না, এ সবই দেখবে এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হল—রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাজকর্ম তদারক করে রাশিয়ারই একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে বা করতে পারেব।

ব্যয়: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে মোট ব্যয় কত হওয়া উচিৎ এবং কত হচ্ছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মোট ২৪০০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সই করা চুক্তিতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ১২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যয়কে বলা হচ্ছে ‘ফার্ম অ্যান্ড ফিক্সড’। অর্থাৎ এই ব্যয় আর বাড়বে না।

তবে এর বাইরে সমীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন (৫৫ কোটি) ডলার ব্যয় করা হয়েছে। ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩২০ কোটি ডলার। তাতে প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ব্যয় দাঁড়ায় এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই ১৩২০ কোটি ডলারের ৯০ শতাংশ (১১৮৮ কোটি ডলার) রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ঋণ হিসেবে। ঋণের সুদ হবে লন্ডন আন্ত:ব্যাংক লেনদেনের সুদের হার (লাইবর) ও ১ দশমিক ৭৫ শতাংশের যোগফল। অর্থাৎ লাইবর যখন  এক শতাংশ হবে তখন এই সুদের হার হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সাধারণত: লাইবর ১ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করে। এই ঋণ পরিশোধের জন্য ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। তার পরবর্তী ১৮ বছরে সম্পূর্ণ ঋণ সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার।

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ১৩২০ কোটি ডলার ব্যয় ধরেও যদি প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় (ইন্সটলেশন কস্ট) হিসাব করা হয়, তাহলে রূপপুর কেন্দ্রের জন্য তা দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় আমাদের এই অঞ্চলে রাশিয়ার তৈরি যে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে সেগুলোর। এ রকম একটি হচ্ছে ভারতের তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। এই দুটি ইউনিটে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় হয়েছে ১৩০০ ডলার।

এরপর ওই একই কেন্দ্রে ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য স্থাপন ব্যয় পড়ছে তিন হাজার ডলার। ১৩০০ থেকে বেড়ে যে তিন হাজার ডলার হয়েছে তার একাধিক কারণ আছে। যেমন, গত ১০/১২ বছরে নির্মাণ সামগ্রির দাম বেড়েছে। ফুকুশিমার দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বাড়ানো হয়েছে। সে জন্যই এই ব্যয় বৃদ্ধি।

কুদনকুলমের সঙ্গে রূপপুরের পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। কুদনকুলমের রিঅ্যাক্টর ভিভিইআর-১০০০ মডেলের। আর রূপপুরের রিঅ্যাক্টার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের। শুধু এই কারণে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের স্থাপন ব্যয় আড়াই হাজার ডলার বেশি হওয়া অস্বাভাবিক বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পরামর্শক রাশিয়ার: রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের বাইরে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা ছিল। বলা হচ্ছিল, আমরা অনেক ছোটখাট সাধারণ প্রকল্পের জন্যও পরামর্শক নিয়োগ করি। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত একটি বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের জন্য, দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ব্যয়ের প্রকল্পের জন্য কোনো পরামর্শক নিয়োগ করছি না কেন।

তা ছাড়া, পরমাণু প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের জানাশোনাও যখন খুব কম, তখন পরামর্শক নিয়োগ করা খুবই দরকার ছিল। কিন্তু তখন সরকার এ কথা কানে তোলেনি। তবে এখন, প্রকল্পের মূল নির্মাণপর্বে এসে পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘রোসটেকনাদজর টিএসও জেএসসি ভিবিও সেফটি’ নামের একটি রুশ কোম্পানিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই কোম্পানিকে পরামর্শক নিয়োগ করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে পাঠিয়েছে। এই কোম্পানির পরামর্শক সেবা নেওয়ার জন্য ১২ কোটি (১২০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি হবে।

কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্রের সব কিছুই করবে রাশিয়া, বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তি এমনই। সে ক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ ছিল একটা স্বতন্ত্র পরামর্শক নিয়োগ করা যারা আমাদেরকে আমাদের কাজে সাহায্য করবে এবং আমাদের স্বার্থ সুরক্ষা করবে। কিন্তু তা না করে আমরা নিয়োগ করেছি এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে যেটি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানিরই একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাঁদের আনুগত্য কোথায় থাকবে, আমাদের প্রতি নাকি তার ‘প্যারেন্টস কোম্পানি’র প্রতি? যদি প্যারেন্টস কোম্পানির প্রতি তার আনুগত্য থাকে সে কি আমাদের সঠিক পরামর্শ দেবে? নাকি সেই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে যেটুকু দেওয়া যায় সেটুকু দেবে?

স্বতন্ত্র পরামর্শক থাকলে তাঁরা রাশিয়ানদের বলতো-এই যে তোমরা ১২৬৫ কোটি ডলার দাম নির্ধারণ করেছ এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। আমাদের রাশান কনসালট্যান্ট কি আমাদের সে কথা বলবে যে তোমরা বেশি টাকা দিচ্ছ? এই জিনিসগুলো হলো ‘ম্যাটার অফ এথিকস’ (নৈতিকতার বিষয়)। এই এথিকস কি অমান্য করবে? যদি না করে, তাহলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে কী ধরণের পরামর্শ সেবা পেতে পারি সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।