Home » প্রচ্ছদ কথা » শিশু-কিশোররাই ফিরিয়ে এনেছে সাহস-দ্রোহ আর জীবনের জয়গান

শিশু-কিশোররাই ফিরিয়ে এনেছে সাহস-দ্রোহ আর জীবনের জয়গান

শাহাদত হোসেন বাচ্চু:

রাজধানীসহ সারাদেশ এখন শিশু-কিশোরারণ্য। কিছু প্লাকার্ড চোখে পড়ছে। অসামান্য, অনবদ্য। “উই ওয়ান্ট সেইফ বাংলাদেশ…উই ওয়ান্ট জাস্টিস”- দাবি নিয়ে শিশু-কিশোররা রাস্তায়। এ দাবি আপামর জনগনের; কিন্তু তারা সাহস হারিয়ে ফেলেছে, দ্রোহ অবশিষ্ট নেই। রাস্তায় নেমে আমাদের শিশুরা সেই সাহস-দ্রোহ ফিরিয়ে এনেছে। জীবন থেমে নেই। জীবনের জয়গান ফিরিয়ে আনতে সারা বাংলাদেশ এখন রাস্তায়। প্রতিপক্ষ পুলিশ এবং পরিবহন শ্রমিকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সড়কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। মন্ত্রী, বিচারপতি, সরকারী কর্তাদের ড্রাইভারদের লাইসেন্স নেই ! শিশুরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে  দিচ্ছে, এক অরাজক বাংলাদেশে কতটা অনিরাপদ আমরা !

এক. লিখতে বসে ভয় হচ্ছে। ভয় পেয়েছেন কর্তারাও। শিক্ষামন্ত্রী স্কুল বন্ধ করে দিয়ে ভয়-তড়াস ঠেকাতে চাইছেন। শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। পিটিয়ে, কাঁদানে গ্যাস-রাবার বুলেট ছুঁড়েও ঘরে ফেরানো যাচ্ছে না অদম্যদের। তারা বিচার চায়। নিরাপদ সড়ক চায়। সরকার বিচার দিতে পারে না, নিরাপত্তা দিতে পারে না। বদলে পিটিয়ে, জখম করে বিচারপ্রার্থীদের দমাতে চায়। আর দাবি মেনে নেয়ার প্রহসন করে !

ভয় হচ্ছে! কতরকম ভয়ে এখানে মানুষ মরছে। প্রকৃতির হাতে মরছে। শক্তির হাতে মরছে। গুম হয়ে, ‘বন্দুকযুদ্ধে মরছে’। অস্বাভাবিকতার হাতে মরছে। দায়িত্ব জ্ঞানহীনতায় মরছে। দেখার কেউ নেই বলে মরছে। চলছে মৃত্যুর মিছিল। আরো মরছে সুশাসনের অভাবে। কি বলবো, “এই মৃত্যুর উপত্যকা আমার দেশ নয়”-বল্লেই কি দেশ বদল হয়ে যাবে? কিংবা আমাদের সন্তানেরা ফিরে পাবে এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড”র মত দেশ?

কোন বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের নীতি-কুশলীরা ভাবছেন? এই দেশ নিয়ে তারা গর্ব করেন উন্নয়নে ভাসিয়ে দেয়ার। স্বপ্ন দেখান মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার। কৌশল নির্ধারন করেন, পরিকল্পনাও গ্রহন করেন। কিন্তু তারা জানেন না এর বাইরেও একটি সমাজ অবয়ব পাচ্ছে। মূলধারার কুশীলবরা সে খবর কতটুকু রাখেন, জানি না। এজন্যই শিশু শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দেখে তারা চমকে উঠছেন। কারণ নব্বইয়ের পরে এই বাংলাদেশকে তারা ভুলেই গিয়েছিলেন।

দুই. রাষ্ট্র-সরকারের সবস্তরে একধরনের ‘অপরাধীকরণ’ (Criminalization)  দৃশ্যমান। আইনের শাসন এবং বিচারহীনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অসহনশীলতা এবং বৈষম্য এক দেশকে অনেক দেশে রূপান্তরিত করছে। এর বিপরীতে জন অসন্তোষ এবং মানুষের অধিকারগুলিকে কর্তৃত্ব ও শক্তি দিয়ে দলিত করা হচ্ছে। সরকারের ভেতরের সরকার এই পন্থাকে উস্কে দিচ্ছে, মদত দিচ্ছে আবার চরমপন্থায় দমনও করছে। বিচারহীনতার বিপরীতে ‘অপরাধী মনোজমিন’ স্থায়িত্ব লাভ করছে।

‘অপরাধী মনোজমিন’র একটি বড় উদাহরন পরিবহন সেক্টর। এখানে একটি মাফিয়া চক্র বাংলাদেশে সবকালে সক্রিয়। তারা সর্বকালে সরকারের অংশ হয়ে ভেতরের সরকার। এখানে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বেসরকারী খাতে পরিবহন কোম্পানীগুলির মালিক। আবার তারাই শ্রমিক নেতা। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী শাহজাহান খান এবং মশিউর রহমান রাঙ্গা পরিবহন শ্রমিকদের দুই শীর্ষ নেতা। এরা চাইলে সারাদেশে জনদুর্ভোগ নামিয়ে আনতে পারে। নামিয়ে আনতে পারে ভয়াবহ নৈরাজ্য।

যাত্রীসেবায় সরকার কোন আইনী উদ্যোগ নিতে গেলেই ভেতরকার সরকার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য যাত্রীদের পক্ষে প্রণীত কোন আইনই জনগনের পক্ষে যায়না। পরিবহন মালিক পক্ষ, শ্রমিক পক্ষ এবং মন্ত্রী-আমলা সবাই একাট্টা হয়ে যায়। এর মূল কারণ হচ্ছে, পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির হয়, পরিমান বছরে হাজার কোটি টাকা। এজন্য এই সেক্টর সবসময় ক্ষমতাসীনদের দখলে  ধারাবাহিক নৈরােজ্যর কবলে থাকে। সঙ্কটে পড়লে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অংশ হয়ে পড়ে।

পরিবহন সেক্টরে মালিকদের লাভালাভই প্রধান বিষয়। শ্রমিকদের কাজটি অমানবিক এবং অমর্যাদার। জীবনমানের উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়নি কখনও। সেজন্য তারাও পথে পথে নানা সুযোগ নেয় বাড়তি আয়ের আশায়। শ্রমিকদের পেশাগত জীবনে বেতন-মর্যাদা প্রদানে এই সেক্টরে কোন সিষ্টেম গড়ে তোলেনি। মালিকদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর জীবন-জীবিকা নির্ভর। ফলে একটি প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে এই সেক্টরে আকৃষ্ট করা যায়নি, কাজে লাগানোও হয়নি।

অন্যদিকে সরকার পক্ষ, যখন যারাই ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে শ্রমিকদের ব্যবহার করেছেন। সরকার থেকে কোন দায়িত্বশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অথরিটি তৈরী হলেও তারাও ‘মাফিয়া চক্র’ ভাঙ্গতে পারেণি। ফল হয়েছে, ব্যক্তি খাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলাকে সঙ্গী করে। শ্রমিকদের নিয়ে কিছু রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা ‘মাফিয়াতন্ত্র’ গড়ে তুলে সর্বকালে সরকারের অংশ হয়েছে।

তিন. সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুঘর্টনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেল তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিক বার্তা ৩ মে ’১৮)।

তাঁর কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় পরের দিনই। দেরী করেননি মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেন, “সড়কপথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলোঃ ৫ মে ’১৮)।

প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি চূড়ান্ত সত্য! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কী মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হচ্ছে সম্ভামনাময় আগামীর। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

চার. আপনি কি এমন কোন দেশ খুঁজে পাবেন, যেখানে সুনির্দিষ্ট হত্যাকান্ডের দায়ে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ধর্মঘট, অবরোধ চালিয়ে যেতে পারে কোন সংগঠন? হ্যা পারে, বাংলাদেশে। মন্ত্রী শাহজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা’র নেতৃত্বে শ্রমিকরা আদালতের বিপক্ষে জনজীবনে নৈরাজ্য নামিয়ে আনতে পারে! আর নির্বিকার পুলিশ পরিবহন শ্রমিকদের বিপক্ষে কোন এ্যাকশনে যায় না। কিন্তু এই পুলিশই নির্বিচার লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়ে, পিপার স্প্রে করে, জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনস্বার্থ নিয়ে যেকোন সমাবেশ-আন্দোলনে। শিশু-কিশোররাও বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পায় না।

সরকারের নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান সারাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির শীর্ষ ফোরাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশানের কার্যকরী সভাপতি। বাস ও ট্রাক শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা। বিষ্ময়ের বিষয় হচ্ছে এই দুই মন্ত্রী সরকারী বাসভবনে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে যে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আদালত বা সরকার কোন ব্যবস্থা তো দুরের কথা , প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত দেখাননি।

গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

National Committee to Protect Shipping, Roads & Railways  নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপরোয়া গাড়ি চালনা।  ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

পাঁচ. এক বিশৃঙ্খল, অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে প্রতিনিয়ত সড়ক দুঘটনায় মৃত্যুর হারকে বাড়াচ্ছে। পৃথিবীতে সড়ক, নৌ, রেলপথ ও আকাশ পথে দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। বাংলাদেশে এরকম কোন দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ আছে বলে জানা নেই। থাকলে অনেকদিন আগেই চরম বিশৃঙ্খল এবং মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত হয়ে সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারতো। তাহলে এই অযাচিত মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে হ্রাস পেত।

সড়ক নিরাপত্তায় আরেকটি আইনের খসড়া প্রণীত হয়েছে। তাদের নিয়েই যারা কিনা, পরিবহন সেক্টরের ‘মাফিয়াচক্র’। এই আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের প্রায় কাউকে যুক্ত করা হয়নি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, এটিও আরেকটি প্রহসন হবে। প্রমান হচ্ছে, সড়কমন্ত্রী জানিয়েছেন দেশে ৩৬ লাখ গণপরিবহনের মধ্যে ১৮ লাখই অবৈধ। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করলে, ১৮ লাখ অবৈধ যানবাহনের মালিক, ড্রাইভার ও অন্যান্যদের আটক করতে হবে। ধরেই নেয়া যায়, বরাবরের মত আন্দোলন-বিক্ষোভ সামাল দিতে সরকার কিছু চটকদার বক্তব্য দিচ্ছে, দাবি মানার ভান করছে থাকবে। অন্তিমে জনগনের সাথে প্রহসন অব্যাহত থাকবে কারন তারা কতিপয়ের, সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়!