Home » প্রচ্ছদ কথা » ‘রাষ্ট্র আমাদেরও’- এই বোধ পুন:প্রতিষ্ঠার স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন

‘রাষ্ট্র আমাদেরও’- এই বোধ পুন:প্রতিষ্ঠার স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন

সি আর আবরার ::

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের কিশোরেরা দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় রচনা করেছে। বাংলাদেশের পরিবহন খাতের সব নোংরামি সমাধান করার তাদের অধিকারের বিষয়টি ঘোষণা করেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার লোক প্রাণ হারায়, লাখ লাখ লোক আহত হয়। তাদের অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। এসব ঘটে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহন নিবন্ধন করার বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নাগরিক সমাজ দশকের পর দশক করে আহ্বান জানাতে থাকলেও তা  এই খাতের সংশ্লিষ্টদের কানে ঢোকেনি। রাজনীতিবিদ, ভাড়ায় খাটা স্বঘোষিত ইউনিয়নকর্মী ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি লোকজনের সমন্বয়ে কায়েমি স্বার্থেন্বেষী মহল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক পুলিশ) বজ্রমুষ্টি প্রতিষ্ঠা করেছে, আইন-শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ ভন্ডুল করে দিয়েছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দায়মুক্তি ভোগ করে এই মহলটি আদালতের আদেশ বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ও রুখে দিতেও সফল হয়।

সাধারণ মানুষের এ ধরনের অসহায় অবস্থার প্রেক্ষাপটে জুলাই মাসের শেষদিকে একটি বাসের চাপায় দুই কলেজছাত্র নিহত হলে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ছাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির, তিনি জাহাজ চলাচল মন্ত্রীও, অনুভূতিশূন্য ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য বিক্ষোভকারীদের বিচার পাওয়া ও সমস্যার সুরাহার ব্যাপারে প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে গিয়ে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়। অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য শহর ও নগরীতে দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে শত শত, হাজারে হাজারে রাস্তায় নেমে এসে বিচার ও রাস্তায় মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাতে থাকে। তারা নিবন্ধিত ও চলাচলযোগ্য যানবাহন কেবলমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই যাতে চালাতে পারে, এ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনটির বাস্তবায়নের দাবি জানাতে থাকে।

ট্রাফিক পুলিশের অদক্ষতা ও দুর্নীতি এবং পরিবহন সিন্ডিকেট ও তাদের গডফাদারদের সাথে তাদের যোগসাজসে হতাশ হয়ে ছাত্ররা ঢাকা নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধু হয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ছাত্ররা, মূলত কিশোর, স্কুলের পোশাক পরে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে, রোদ-বৃষ্টিতে প্রচন্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিয়েও সফলভাবে এমন এক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে যা অতীতে কোনো সময়ই এই মেট্রোপলিটান নগরী দেখতে পায়নি।

নিবন্ধিত ও চলাচল উপযোগী গাড়ি কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিয়ে চালানো নিশ্চিত করার কাজটি করে  তরুণ তুর্কিরা। তারা গাড়ির যাত্রীদের সিট বেল্ট বাঁধতে পরামর্শ দিয়েছে, মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরতে, পথচারীদের ফুটপাথ, জেব্রা ক্রসিং, ফুট ব্রিজ ব্যবহার করতে অনুরোধ করেছে। মোড়ে রিকশাগুলো যাতে এলোমেলোভাবে না চলে, তাতেও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো প্রধান প্রধান রাস্তায় এক লেনের খালি রাখা হয় জরুরি যানবাহন চলাচলের জন্য।

স্ব-নিয়োজিত কিশোর আইনপ্রয়োগকারীরা ভদ্র, তবে দৃঢ়। যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই এক সিনিয়র মন্ত্রীকে তার পথ পরিবর্তন করে সঠিক পথে চলতে বলে। যথাযথ নিবন্ধন কাগজপত্র সাথে না থাকায় আরেক মন্ত্রীকে তারা গাড়িটি ছেড়ে দিতে বলে। আইন সমুন্নত রাখার চেতনায় যথাযথ নথিপত্র না রাখায় তারা ডিআইজি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও নৌবাহিনীর গাড়ি থামিয়ে দেয়।

তবে গাড়িচালকেরা যখন তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস কাগজপত্র প্রদর্শন করতে চায়নি, তখন কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি ভাংচুর করেছে। কোনো কোনো মোড়ে বিক্ষোভকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যান চলাচলে বিরূপ প্রভাব পড়ে, পথচারীদের বেশ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও ছাত্র বিক্ষোভকারীরা মোটামুটিভাবে নগরবাসীর কাছ থেকে উষ্ণ সাড়া পায়। সামাজিক মাধ্যমে তাদের প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। জনসাধারণ তাদেরকে আশ^স্ত করে, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কিছু সমস্যা ও জটিলতা তারা মেনে নিতে প্রস্তুত। অনেকে তো এমনও বলে, যানজটের প্রচন্ড কষ্ট এবং তাদের স্বার্থের সাথে বলতে গেলে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন মিছিল-সমাবেশের কারণে তাদের যে ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তার তুলনায় এই সাময়িক দুর্ভোগ অনেক ভালো।

কিশোরদের বিক্ষোভ কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাদের জন্য মায়েরা স্নাকস ও বোতলের পানি নিয়ে আসে। এক ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শিশু বিক্ষোভকারীদের খিচুরি খাওয়াচ্ছেন। এটি কিশোরদের প্রতি সমর্থনের গভীরতা প্রকাশ করে। বিক্ষোভের চতুর্থ দিনে অভিভাবক, মা-বাবাসহ সাধারণ মানুষ র‌্যালিতে যোগ দেয়। যথেষ্ট হয়েছে আর নয়- এই ছিল তাদের কথা। তারা সবাই সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করার দাবি জানায়। বিক্ষোভকারীদের ন্যায়সঙ্গত বক্তব্য সেলিব্রেটিদেরও উদ্দীপ্ত করে। ছাত্রদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পীরাও এগিয়ে আসে। তারা একসাথে জাতীয় কবির উদ্দীপনাময় রণসঙ্গীত ‘চল চল চল’ গায়।

অনেক দিক থেকেই এই বিক্ষোভ অনন্য। কিশোরেরা আবেদনময়ী শ্লোগান, কবিতা ও গান রচনা করে, গায়। এটি আইনের শাসনে প্রতি কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং আইন কিভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে, তারই একটি প্রদর্শনী। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কর্মসূচি নয় এটি, বরং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি যে কত জরুরি, তার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যবস্থা। এটি রাজনৈতি ক্ষমতা দাবি করার ব্যাপার নয়, বরং এর মাধ্যমে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিভাবে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো দক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিক্ষোভকারীরা প্রমাণ করেছে, দায়িত্ব পালনের সদেচ্ছা ও দায়বদ্ধতা থাকলে রাষ্ট্রীয় অর্থপুষ্ট পেশাদার বাহিনীগুলো দশকের পর দশক ধরে যে কাজ করতে পারছে না, তা-ও করা সম্ভব।

ছাত্ররা সরকারের কাছে তাদের ৯ দফা দাবি পেশ করে। ছাত্রদের ব্যাপক তৎপরতা ও জনগণের কাছ থেকে প্রবল সমর্থন পাওয়ায় সরকার এসব দাবির কিছু অবশ্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এসব দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে মন্ত্রীদের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পরও তা রক্ষা করা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হওয়ায় তারা রাজপথ ছেড়ে দিতে অনীহা প্রকাশ করে। কোটা আন্দোলনের প্রতি প্রধানমন্ত্ররি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ধীরে চলো কৌশল এখনো তাদের মনে গেঁথে রয়েছে।

একইভাবে নতুন পরিবহন আইনের প্রতিশ্রুতির প্রতিও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে অতি সামান্য। অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই তারা মনে করছে, নতুন আইনের ব্যাপারে কথার ফানুশ নয়, বরং প্রয়োজন বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া ও সিনিয়র মন্ত্রীদের আন্দোলনটিকে বিএনপি-জামায়াতের ছলাকলা হিসেবে অভিহিত করার ফলে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে আরো সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক দিনে প্রাণঘাতী অস্ত্র হাতে মুখোশধারী লোকদের, তারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও শ্রমিক শাখার কর্মী বলে অভিযোগ রয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ পলকা বিশ্বাস আরো কিছুটা ক্ষয়ে দিয়েছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই বৈধ ও জনপ্রিয় নাগরিক আন্দোলন একটি খোলা প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যাবে। এই ইস্যুর ন্যায়সঙ্গত, যৌক্তিক ও আশু সমাধানের দায়িত্ব পুরোপুরি সরকারের কাঁধে। এই ঘটনার প্রধান উস্কানিদাতা মন্ত্রীর পদ থেকে কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির পদ থেকে শাজাহান খানের অপসারণ উত্তপ্ত পরিবেশ অনেকাংশেই প্রশমিত করতো। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার সত্যিকার ব্যবস্থা ও  ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নই সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করবে। ছাত্রদের ওপর যেকোনো ধরনের ভীতি প্রদর্শন, বিদ্রুপ করা ও শক্তিপ্রয়োগ করা হলে (কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এ ধরনের পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে) পরিস্থিতির আরো ভয়াবহ অবনতি ঘটবে।

বিক্ষোভকারীদের দখলে থাকা রাস্তায় একটি পোস্টারে লেখা ছিল : ‘রাষ্ট্রের মেরামত কাজ চলছে : সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ আমরা আশা করতে পারি, কর্তৃপক্ষ তাদের আহ্বানে কর্ণপাত করবে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সত্যি সত্যিই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

(সি আর আবরারঅধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)