Home » বিশেষ নিবন্ধ » নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন : তাহলে প্রবল হবে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তা

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন : তাহলে প্রবল হবে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তা

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধুমাত্র শাসকদলই করে তা নয়, বিরোধী দল যখন পোলারাইজেশনের রাজনীতি করে- তখন সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবার সমান সুযোগ বিনষ্ট হয়, সেটাও প্রকৃতার্থে অবাধ নিরপেক্ষ হয়না।  অবাধ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু ধরনের মত ও পথ তৈরী হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে নির্বাচনের মাধ্যমে ন্যায্য ও নির্ভেজালভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রতিফলন ঘটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, জন্ম নিচ্ছে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হচ্ছে, ভোটের আগেই জয়লাভ নিশ্চিত ও ফলাফল অদৃশ্যভাবে নির্ধারণ করে রাখা। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুক্ষ্ম, স্থুল বহু ধরণের উপাদানে সমৃদ্ধ হতে পারে; কেন্দ্র ও বুথ দখল, জাল ভোট দেয়া, বুথ বা কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়া নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের কয়েকটি পদ্ধতির উদাহরন । আধুনিক গণতন্ত্রের এই যুগে ক্ষমতাশালীদের কেউ কেউ ও কোন কোন রাজনৈতিক  দল এ পদ্ধতি অনুসরন করে । ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল সুক্ষ্ম পদ্ধতিতে বিরোধী রাজনীতিকে ধ্বংস করে এবং কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলে, নির্বাচনকালে গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনসহ সকল এ্যক্টর কোনভাবেই যেনো শাসকদলের নির্বাচনী নকশা বাস্তবায়নে শক্ত বাধা তৈরী না করে; বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধু স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অগ্রসর দেশেও ঘটছে। কিন্তু এসব অগ্রসর প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকালীণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমূহ অধ:পতিত ভূমিকা পালন করেছেনা, কর্পোরেট বিনিয়োগ ও আনুকল্যে ওই নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ক্ল্যাসিক ‘কেইসে’ পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের শাসকদলের নক্সার এবং পদ্ধতির উত্তোরোত্তর বিকাশ ঘটছে। এই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, সেটা আমরা তুলে ধরবো।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের রাজনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের লক্ষ্য হচ্ছে- পূর্ব নির্ধারিত জয় ও ক্ষমতাকে রক্ষা করা। এটাকে কোনভাবে আমজনতার ভোটের উপর ছেড়ে না দেয়া। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে শুধু নিজের জয় নয়, জয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিদন্ধীকে দমন ও অবরুদ্ধ করা। এমনকি তার রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা। এর সাথে রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর কর্তৃত্ববাদী অহং। এই কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক অহংয়ের কারণে স্বাধীনতা উত্তর প্রথমদিকে ডাকসু নির্বাচনে পরাজয় ও প্রয়াত আলীম রাজী, মেজর (অব:) জলিল সহ কয়েকজনের বিজয় মেনে নেবার গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায়নি। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ধারাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকায়ন ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

এই অবক্ষয় ‘৯০ এর যে অলিখিত দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্ট্রি হয়েছে। এখানে দু’দলই সমানতালে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের  উপাদানগুলিকে বেপরোয়া ব্যবহার করেছে। আজকের শাসকদলই শুধু নয়, দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অন্য দলটিও সেই অবক্ষয়ের জন্য সমান দায়ী। নির্বাচনকালীণ কেয়ারটেকার সরকারকে ম্যানিপুলেট করতে গিয়েই ওই দলটি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়। তারপরের ইতিহাস সকলের জানা- বিএনপিকে তাদের নিয়ন্ত্রন মুক্ত নির্বাচনে ক্ষমতায় হারতে হয়েছিল এবং নির্বাচনের ফলাফলকেও মেনে নিতে হয়েছিল। তারপর ২০১৪ নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে সংঘাত ও দ্বন্ধের নতুন অধ্যায় তৈরী হল। রাস্তার আন্দোলন ব্যবহার করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বিএনপি নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, আর শাসকদল রাষ্ট্রশক্তিতে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের কর্তত্ব প্রতিষ্ট্রায় সফল হয়। এ সফলতা একদিকে যেমন আওয়ামীলিগকে কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত করে, অন্যদিকে, বিএনপিকে পরিণত করে দিশাহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট দলে ।

এখন প্রশ্ন শাসকদল  আওয়ামী লীগের এই আপাত সফলতার রাজনৈতিক ফ্যাক্টর গুলি কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারত ফ্যাক্টরকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এটা ইতিহাসের আয়রণি, দু’তিন দশক আগেও ভারত বিরোধীতাই ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতা আরোহণের মুখ্য উপায়। এখন ভারতের আস্থা ও সহযোগিতায় ক্ষমতায় টিকে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে পড়েছে। কেন এমন হলো? বাংলাদেশের ক্ষমতা পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো অনেকটা নির্বাক ভূমিকা পালন করেছে কার্যত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার জন্যে। এছাড়া ভারতের আরো শক্তি অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ভারতের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমান শাসকদল এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করতে দক্ষতা দেখিয়েছে। আভ্যন্তরীণভাবে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনা শক্তিশালী শাসক হিসেবে সাহসের সঙ্গে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। যুদ্ধপরাধীদের বিচার এর মধ্যে অন্যতম। দ্বিতীয়ত: পরপর দু’টার্ম ক্ষমতায় থাকার কারনে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। কিন্তু সংকটকালে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী কতোটা আনুগত্য বজায় রাখবে, সহায়ক ভূমিকা নেবে তাতে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি ভোটের বাক্সে তারা আওয়ামীলীগ প্রদত্ত সুবিধার কতটা প্রতিদান দেবে তাতেও সংশয় রয়েছে। হামজা আলাভী নামে একজন মার্ক্সবাদী বিশ্লেষক বাংলাদেশকে পাকিস্তান রাষ্ট্রক্ষমতার উত্তর ঔপনেবেশিক আখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র ঔপনেবেশিক লিগ্যাসি থেকে বের হতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের হাতে নাগরিকদের নিপীড়নের যন্ত্র। গত দশ বছর আওয়ামীলীগ ঔপনেবেশিক লিগ্যাসিকে শক্তিশালী করে রাষ্ট্রশক্তিতে নাগরিকের বিরূদ্ধে আরো নিপীড়নমুলক করেছে। এর পটভূমিতে ২০১৯ সনের ৪ঠা জানুয়ারীর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোথায় আছি? কিন্তু সন্দেহ নেই এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল ও বিচিত্র উপাদানে সমৃদ্ধ। বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ বা ২০১৯ এর মধ্যে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান এর দিকে এগুচ্ছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন কালীন সরকার গঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্ধী বিএনপি ঘোষণা করেছে তারা খালেদা জিয়া ব্যতীত নির্বাচন করবে না। আওয়ামীলীগ মনে করেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নেবে। অগোছালো বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে, তাকে কিছু কিছু সিট ছেড়ে দিয়ে বিএনপিকে বিরোধী দলে আসনে বসিয়ে আওয়ামী লীগ তৃতীয় বার সরকার গঠন করতে চায়। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও শাসকদল একটা যেনো  -তেনো নির্বাচন করে ফেলতে পারবে বলেই তাদের ধারনা। কাজেই বিএনপি’র এ উভয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আপাতত: ম্যাজিক সমাধান নেই। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাঝে ভোটের বাক্সের নীরব বিপ্লব কি সম্ভব হবে? এ প্রশ্নের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। এরপর ২০১৮ আগষ্ট হয়ে পড়ল ঘটনা বহুল। এই ঘটনাগুলি এক. ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে  ঐক্যফ্রন্ট, দুই. ২১ শে আগষ্টের হত্যাকান্ডের রায়, তারেক জিয়ার যাবজ্জ্বীবন কারাদন্ড, তিন. নির্বাচন কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদারের ভিন্নমত ও বিরোধ। এই তিনটি ঘটনার কোনটিই আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কোন গুণগত পরিবর্তন  আনতে পারেনি। কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রণ্টের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রতিযোগিতায় নির্বাচন নিয়ন্ত্রনের আবহাওয়াকে চ্যালেঞ্জের একটা জানালা খুলে যেতে পারে। তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন বিএনপি নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব ও নিষ্ঠুরতাকে সামনে এনেছে। মাহবুব তালুকদারের বিরোধীতা এই নির্বাচন কমিশনের নৈতিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের অর্থনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের একটি অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হারাবার পর নেতৃবৃন্দ সহজ শিকার হন অর্থনৈতিক দূর্নীতির মামলায়। কাজেই নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে এ ধরনের হয়রানির আশংকা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক সুবিধা বন্টন করে যার প্রতিদান তারা ভোটের বাক্সে পেতে চায়। সুবিধা বন্টন শুধু ভোটারদেরকে নয়, যারা ভোটকে নিয়ন্ত্রন করে তাদের কাছেও পৌছানো হয়, তার পরেও নির্বাচনে বিনিয়োগের ক্ষমতা সবসময় শাসকদলের অনেক অনেকগুনে বেশী থাকে। বর্তমান শাসকদলের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অর্থনৈতিক সুশাসনের ঘাটতি থেকে উৎসারিত হয়েছে বললে, তা বেশী বলা হবে না। বিদ্যুৎ রেন্টাল, নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মানসহ সকল সরকারী ব্যয়ই গুণগতভাবে প্রশ্ন সাপেক্ষ। কাজেই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন একমাত্র সমাধান বলে সব শাসকদলই মনে করে।

অনিশ্চিত রাজনৈতিক সুশাসন : অবাধ, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর রাজনৈতিক সুশাসনের সুচনা হতে পারে। আর বিকাশ ঘটতে পারে রাজনৈতিক সুশাসনই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুশাসনের । মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুশাসন নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথকেই সুগম করে। কিন্তু সামনের নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবার সম্ভাবনা যেমন এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়, তেমনি আস্থা তৈরী করতে পারেনি সবার মনেও। কাজেই রাজনৈতিক সুশাসনের অনিশ্চয়তা থাকবে কি থাকবেনা –তা বলার সময় এখনও আসেনি।