Home » আন্তর্জাতিক » ভারত-রুশ সামরিক চুক্তি : দিল্লির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র

ভারত-রুশ সামরিক চুক্তি : দিল্লির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র

আসিফ হাসান ::

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরোপের হুমকিকে তোয়াক্কা না করে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে ভারত।  কেবল এই ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরকালে দুই দেশ আরো কয়েকটি চুক্তিতে সই করেছে।  এতে করে ভারতের মনোভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে ; আর তা প্রকাশ করতে রাখঢাকও করছে না ওয়াশিংটন।

বিশেষ করে মার্কিন সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরাই এখন ভারত-রুশ সামরিক চুক্তি নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। এই চুক্তির ফলে রুশ ও চীনা অস্ত্রের বিপরীতে মার্কিন অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে ধারণা যুক্তরাষ্ট্র দিয়ে আসছিল, তাতেও চিড় ধরেছে।  মার্কিন অস্ত্র বাদ দিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অস্ত্র কেনার এই উদাহরণটি অন্যান্য দেশও ব্যবহার করতে পারে। তাতে আরো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র- এমনটাই এখন আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের।

সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড ওয়াশিংটন এক্সামিনারকে বলেন, রুশ-ভারত চুক্তিটি ভারত-মার্কিন সমঝোতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা যখন রুশ অস্ত্র কেনা নিয়ে কথা বলে, তখন এর কী অর্থ হতে পারে, তা খুবই পরিষ্কার।

রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যে এস-৪০০ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তির ফলে ভারতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে বড় ধরনের অস্ত্র কিনলে তাদের ওপরও অবরোধ আরোপ করা হবে।

তাছাড়া রুশ-ভারত ওই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতামূলক চুক্তি ‌”সিওএমসিএএস”-এর কার্যকারিত হ্রাস হতে পারে বলেও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান বব কোরকার বলেন, ভারতের সাথে সিওএমসিএএসএ চুক্তি সই করা ছিল বিরাট এক অগ্রগতি। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছিল। ভারতের উচিত হবে না মার্কিন অবরোধ আরোপ হয় এমন কিছু করে এই অগ্রগতি হ্রাস করা।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইক পম্পেইও এবং ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে সই হওয়া ওই চুক্তি অনুযায়ী ভারতের কাছে স্পর্শকাতর সামরিক সরঞ্জাম হস্তান্তর ও গোয়েন্দা তথ্য তাৎক্ষণিক সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

বেশকিছুদিন ধরে   ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতের মোদি সরকার যেমন অতি-আগ্রহী ছিল, যুক্তরাষ্ট্রও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিল ব্যবসার সাথেসাথে আঞ্চলিক ও ভারত মহাসাগরকেন্দ্রীক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকা আর হিন্দু ভারতের মিলন বেশ সহজ মনে হতব বলে মনে করা হচ্ছিল।

এর মধ্যেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের মধ্য নয়াদিল্লীতে যে ২+২ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের অংশীদারিত্বের সম্পর্ক অনেকখানি এগিয়ে যায়।

যেকোনো দিক থেকেই ওয়াশিংটনের জন্য এটা ছিল বিজয়। বহু বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ব্যবসার চুক্তির দুয়ার এখন খুলে যাবে-এটাই ছিল প্রত্যাশা। একই সাথে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্রশান্ত জোটের দিকেও ভারতকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। এভাবেই ২+২ সংলাপ থেকে একক বৃহৎ যে অর্জনটা হয়েছে সেটা হলো কমিউনিকেশান্স কমপ্যাটিবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট (সিওএমসিএএসএ) চুক্তি স্বাক্ষর। এই চুক্তির অধীনে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়বে, আমেরিকা ভারতের কাছে স্পর্শকাতর প্রযুক্তি রফতানি করতে পারবে এবং মার্কিন গোপন তথ্যভাণ্ডারের সুবিধা পাবে ভারত।

২+২ সংলাপের পর যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছে, সেখানে দুই বাহিনীর পারস্পরিক বিনিময়ের মাত্রার দিকটিতে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘অন্যতম প্রতিরক্ষা সহযোগি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এছাড়া এতে রয়েছে – ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক রফতানি (১৬ বিলিয়ন ডলার); ভারতের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রফতানির উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেয়া; লাইসেন্স-মুক্তভাবে মার্কিন প্রযুক্তি কেনার জন্য ভারতের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়গুলো।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ২+২ সংলাপকে যেভাবে ‘সবচেয়ে ফলপ্রসু, ইতিবাচক ও সুফলদায়ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, সেটাকে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে : আজকের বৈঠক একটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রার সূচনা করল… আমাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বের ব্যাপারে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সবচেয়ে প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে.. । এই অর্জন.. একটা বৃহৎ ইতিবাচক শক্তি সৃষ্টি করেছে, যেটা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে… আমাদের নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছেন যে, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই… আমাদের আলোচনা ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ককের ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। আমাদের অভিন্ন স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা এ অঞ্চল ও এ অঞ্চলের বাইরে শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এক সাথে কাজ করতে পারব।’

এই প্রেক্ষাপটেই সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার মন্তব্য করেছিলেন মোদির ‌‌”মেক ইন ইন্ডিয়া”র সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও বাণিজ্য উদ্যোগের সমন্বয় সাধন ঘটেছে। আর ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ভারসাম্যের পুনঃব্যবস্থার সমন্বয় ঘটে। কার্টার বলেন, ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যবাহী মিত্র জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করেছে।। মার্কিন নেতৃত্বাধীন নেটওয়ার্কের সাথে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াও সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে।

সবই যখন মিলে যাচ্ছিল, তখনই মঞ্চে রাশিয়ার উপস্থিতি ঘটে।  যুক্তরাষ্ট্রের সব হিসাব পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের হুমকিতে পড়ে গেছে ভারত। তবে ভারতের সেনাপ্রধান একে গুরুতর কিছু নয় বলে মনে করছেন।

জেনারেল বিপিন রাওয়াত বলেন, রাশিয়ানরা যখন আমেরিকান অবরোধের কথা জানতে চেয়েছিল, আমার জবাব ছিল ”এই যে হ্যাঁ আমরা জানি যে আমাদের ওপর অবরোধ আরোপ করা হতে পারে। কিন্তু আমরা স্বাধীন নীতি অবলম্বন করব। আমরা আমেরিকান প্রযু্ক্তি গ্রহণ করব। তবে অনুসরণ করব স্বাধীন নীতি ”।

ভারত স্নায়ুযুদ্ধের সময় জোট নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিল। তারা ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে জোট গড়তে চায়নি। তবে ওই সময় সামরিক সম্ভারের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। এর রেশ ধরেই বর্তমানে রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠেছে ভারতের জন্য।

এই অস্ত্র কেনা সত্ত্বেও ভারতের ওপর যাতে অবরোধ আরোপ না করা হয়, সে চেষ্টা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিস এই লবিটি বেশ জোরালোভাবে করছেন।

কিন্তু সেটি ফলপ্রসূ হবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সাথে রাশিয়ার সুসম্পর্ক রয়েছে। রুশ-ভারত সম্পর্কে সে বিষয়টির দিকেও নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

ল্যাঙ্কফোর্ড বলেন, দিল্লির সাথে সামরিক চুক্তির ফলে ভারতে সরবরাহ করা মার্কিন অস্ত্র সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা পেয়ে যাবে রাশিয়া।

তবে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতে মোতায়েনের আগে পর্যন্ত ভারতের ওপর মার্কিন অবরোধ আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে।