Home » প্রচ্ছদ কথা » সংলাপের ফলাফল : ধারনার বাইরে কিছুই ঘটেনি

সংলাপের ফলাফল : ধারনার বাইরে কিছুই ঘটেনি

আমীর খসরু ::

রাজনীতি নিয়ে সামান্য চিন্তা-ভাবনা করেন, ন্যূনতম খোঁজখবর রাখেন এবং সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনা যাদের আছে- তারা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীনদের সাথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে গঠিত জাতীয় ঐক্যফন্টের ‘সংলাপ’-এর ফলাফল নিয়ে বোধকরি অবাক হননি। সংলাপের পরে ড. কামাল হোসেন যেমনটি বলেছেন, ‘বিশেষ সমাধান পাইনি’ এবং মির্জা ফখরুলের ‘আমরা সন্তুষ্ট নই’ ধরনের মন্তব্যের বিষয়টি আঁচ করা গিয়েছিল আগেই। কারণ ড. কামাল হোসেনের চিঠির জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে রাজি হওয়ার বিষয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন তার একটি কথাই আগাম জানান দিয়েছিল যে, ‘সংবিধান সম্মত’ সব বিষয় নিয়েই তারা আলোচনা করতে রাজি। আর এই ‘সংবিধান সম্মত’ কথাটি উল্লেখ করেই সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, তার একটি  ইঙ্গিত   তাদের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়। ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দিয়েছে তার প্রথম দফাতেই-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে।

এছাড়া অপরাপর যে দাবিগুলো যেমন- নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ইভিএম ব্যবহার না করাসহ অন্যান্য বিষয় কতটা মানা হবে- তা যে কেউই বুঝতে পারবেন। একটি বিষয় বিবেচনা করলেই সংলাপের পুর্বাপর সম্পর্কে সবকিছু পরিষ্কার হবে যে, ক্ষমতাসীন দল ‘সংবিধান’ বলতে বিদ্যমান সংবিধানকেই গণ্য করে। ইতিপূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলসহ যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে- তা তারা বিবেচনায় নেবেন না, এটাই তাদের দিক থেকে স্বাভাবিক।

তাহলে সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, সে বিষয়ে যাবার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়ায় প্রয়োজন যে, বিএনপি যদি আন্দোলন সংগ্রামে যথেষ্ট শক্তিশালী ও সক্ষম হতো, রাজপথে সরব থাকতো, ক্ষমতাসীনদের সমান্তরাল প্রতিদ্বন্দ্বী হতো,  প্রথাপ্রতিষ্ঠানগুলো  কিছুটা হলেও পক্ষপাতমুক্ত  হতো এবং রাজনীনৈতিক পরিস্থিতির ওপরে নূন্যতম নিয়ন্ত্রন থাকতো  তাহলে ঐক্যফ্রন্টের নামে তারা সংলাপে যেতোও না, এমনকি সংলাপ চাইতও না। এসব বিষয়গুলো অনুপস্থিত বলেই সংলাপ চাওয়া হয়েছে সমান্তরাল মাঠ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে।

সংলাপের ফলাফল বিষয়ে আরো দুটো বিষয় উল্লেখ করা জরুরি বলে মনে হয়- ১) সংলাপ সরকারের তরফে ডাকা হয়নি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চিঠি দিয়ে সংলাপের আবদার করেছে। ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ যাতে বিশেষ গুরুত্ব না পায় এবং অন্যান্য দলের সাথে সংলাপের মতোই সমান বলে বিবেচনা করা হয়, সে লক্ষ্যে  এখন সবার সাথে সংলাপ চলবে বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২) নভেম্বরের প্রথমের যেকোনো দিন তফসিল ঘোষণা করার আগে এ ধরনের সংলাপ চালিয়ে যেতে পারলে সরকারই লাভবান হবে, এ কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা- সব পক্ষের সাথে সংলাপ হচ্ছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে এবং এই লক্ষ্যে তারা যে কতোটা আন্তরিক, দেশী-বিদেশী সবাইকে এটা বোঝানো সহজ হবে বলে ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন। মাত্র কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই বলা হচ্ছিল সংলাপের কোনোই প্রয়োজন নেই।

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে সংলাপের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়েছে- এমন নজির নেই বললে চলে। নব্বই পরবর্তী বেসামরিক শাসনের সময়কালেও অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ২০১৩ সালে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেস দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতা এবং সংলাপ প্রচেষ্টাসহ এইবার ধরে এ সময়কালে অন্তত ছয়বার সংলাপ ও মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতের সংলাপে সভা-সমাবেশের অধিকারের যে কথা বলা হয়েছে তা এই প্রথম বলা হলো এমনটি নয়। প্রধানমন্ত্রী এর আগেও প্রকাশ্যে এমন কথা বলেছেন। আর গ্রেফতার-মামলা সম্পর্কে তালিকা চাওয়া হয়েছে। এই তালিকার ভবিষ্যৎ কি হবে সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সঠিক হবে বলে মনে করি না।

তবে বাহবা দিতে হয় এবং সাধুবাদ জানাতে হয় সেই সব মতলববাজ সংবাদমাধ্যম ও কতিপয় কথিত বিশ্লেষককে যারা এই সংলাপকে ঐতিহাসিক, নজিরবিহীন হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে জনমনে উচ্ছাস, উচ্চাশা, সমস্যা সমাধানের আশার-আলো জাগ্রত করার প্রানান্তকর চেষ্টা ও বড় কিছু পাওয়া যেতে পারে বলে ভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন বরাবরের মতোই-তাদেরকে। অবশ্য তারা এখনো যে থেমে থাকবেন, তা নয়।

আর সংলাপ ও নৈশভোজের নিট ফলাফল হচ্ছে- দু পক্ষের এক পক্ষ এখন ‘আন্তরিকভাবে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে; সমস্যার কিছু কিছু সমাধানও হয়েছে’ এবং অপরপক্ষ ‘পাইনি, হতাশ হয়েছি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে’- জাতীয় কথাবার্তা বলে সংলাপকে যে যার মতো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিএনপিসহ যেসব বিরোধী নেতারা টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে থাকেন তারা নেত্রীর বক্তৃতা শুনেছেন সামনাসামনি বসে।

খুব সংক্ষেপে সংলাপের ফলাফল হচ্ছে, রাজনৈতিক বিভেদ, বিদ্বেষ, অনৈক্য ও চরম বৈরিতার ইতিহাসে আরো একটি নজির সৃষ্টি করা হয়েছে – যা জন-আকাঙ্খার সম্পূর্ণ বিপক্ষে, বিপরীতে।