Home » আন্তর্জাতিক » দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি : চীন-ভারত দ্বন্দ্ব চরমে

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি : চীন-ভারত দ্বন্দ্ব চরমে

আসিফ হাসান

আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতির বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশগুলোর অন্যতম চীন আর ভারত।  চীনের তুলনায় ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে থাকলেও  উদীয়মান শক্তির মর্যাদা  পেয়ে গেছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে উভয়েরই।  আবার দেশ দুটির প্রতিবেশীরা তাদের তুলনায় ‘লিলিপুট’। গালিভাররের কাছে এই লিলিপুটরাই আবার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে। দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির উভয়ের কাছ থেকে তারা যেমন কখনও কখনও সহায়তা পাচ্ছে, আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলোমেলোও হয়ে পড়ছে।  বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তা বড় ধরনের পরিবর্তনই যেন অবধারিত করে তুলেছে।

বর্তমানে সময়টা এমনই যে অন্য কিছু ভাবার মতো অবস্থাও নেই।  চীন-ভারতের উত্থানের কারণেই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ভারত মহাসাগর। চীন প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে। তাকে ভারত মহাসাগরের বাইরে কিছুই যেতে দেবে না মার্কিন নেতৃত্বাধীন  শক্তি।  আর এ কারণেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হোক যুক্তরাষ্ট্র  তা চায়। কিন্তু চীনও হার মানার পাত্র নয়। দীর্ঘ দিন ভারতের আধিপত্যের এলাকা হিসেবে পরিচিত অঞ্চলে সে হানা দিচ্ছে জোরালোভাবে।

শ্রীলঙ্কায় সম্প্রতি সরকার পরিবর্তন যেভাবে ঘটেছে, তাতে করে মনে হচ্ছে, ওহানে নরেন্দ্র মোদি আর শি জিনপিঙের অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকের রেশ ধরে উপমহাদেশে শান্তির বাতাসের চেয়ে অশান্তির ঝড়ই দেখা যাচ্ছে অনেক বেশি।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঘরোয়া ইস্যুগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিও ওঠে আসছে বড়ভাবে।  রনিল বিক্রমাসিঙ্গের সাথে মহিন্দা রাজাপাকসের দ্বন্দ্বে পেছন থেকে ভারত আর চীনের কলকাঠি নাড়ার বিষয়টি অবধারিতভাবেই অনুভব করা যাচ্ছে। বিক্রমাসিঙ্গে ভারতপন্থী আর রাজাপাকসে চীনপন্থী। প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার বিক্রমাসিঙ্গের বদলে রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করাটা দেশীয় পরিসরেই বিবেচিত হচ্ছে না।

কলম্বোতে এই পরিবর্তনের ফলে শ্রীলঙ্কায় প্রস্তাবিত ভারতীয় বিনিয়োগ, বিশেষ করে মাত্তালা বিমানবন্দর, কলম্বোর ইস্ট কন্টেইনার টার্মিনাল, কেরাওয়ালাপিতিয়ায় এলএনজি প্লান্ট, জাফনার পালালে বিমানবন্দরে ভারতীয় বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়বে। আর ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কেও প্রভাব পড়বে। এই পরিবর্তন নিয়ে চীন যে খুশি, তা বেশ নিশ্চিত। গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্রবন্দরসহ চীনা প্রকল্পগুলোও প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ছিল। ঘরোয়া অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চীনা ঋণের দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব নিয়ে সরকার উদ্বেগে পড়েছিল। কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে সহিংসতা ও বিরোধিতাও সৃষ্টি হয়েছিল। এখন রাজাপাকসাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ফলে এই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেবে, বেইজিং সুবিধা পাবে। এতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নতুন গতি পাবে, চীনা বিনিয়োগ বাড়বে।

প্রেসিডেন্ট থাকার সময় চীনের প্রতি রাজাপাকসে ঝুঁকেছিলেন বেশ ভালোভাবেই। অভিযোগ রয়েছে, তাকে বিদায় করতে কোমর বেঁধেই নেমেছিল দিল্লি। সফলও হয়েছিল। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে দান উল্টে গেল। বিক্রমাসিঙ্গে আউট, রাজাপাকসে ইন। ্রপরেও যে সবকিছু ঠিকঠাক তা বলা যাবেনা।

তাহলে কি মালদ্বীপেও একই ঘটনা ঘটবে? মালদ্বীপে যে অবস্থা ছিল তাতে আবদুল্লাহ ইয়ামিন হেরে যাবেন, তা কেউ ভাবেনি। যেমন ২০১৫ সালে ভাবেননি রাজাপাকসে। কিন্তু নির্বাচনী সমীকরণ মেলাতে পারেননি রাজাপাকসে। ইয়ামিনও পারেননি। চীনের দিকে দেশকে বেশ ভালোভাবে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সম্ভব সবভাবে ভারতকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন। তার জের ধরে ক্ষিপ্ত হচ্ছিল পাশ্চাত্য বিশ্বও। তারা সবাই জোট বেঁধেছিল মালদ্বীপকে আবার নিজেদের বলয়ে ফিরিয়ে আনার জন্য।

মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কার মধ্যে সবচেয়ে বড় মিলটি হলো উভয়েই দ্বীপ দেশ। আর তাদের অবস্থান ভারত মহাসাগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের একেবারে কাছে। এই রুটের নিয়ন্ত্রণ লাভ খুবই জরুরি। ফলে দেশ দুটির দিকে নজর একটু বেশিই।

মালদ্বীপে চীনাপন্থী প্রেসিডেন্টের পতনের কিছু দিনের মধ্যেই শ্রীলঙ্কায় পট পরিবর্তন কি বদলা নেয়া? এত দিন মনে হতো, চীন কেবল তার সফট পাওয়াই ব্যবহার করে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ঘটনায় কি মনে হয়, তারা ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছে? এমন আশঙ্কা কিন্তু আরো আগে থেকেই করা হচ্ছিল। মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কায় চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। আর প্রেসিডেন্ট শি’র ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য উভয় দেশই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  এই দুটি দেশ অন্য দিকে গেলে চীনা উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি আঁতুর ঘরেই মরে যেতে পারে। ফলে নিজের দিক থেকে দেখতে গেলে মনে হবে, চীনের পিছু হটার সুযোগই ছিল না।

কিন্তু ভারত কি ছেড়ে দেবে? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশ? এখানে ছাড় দেয়া মানে চীনের লাগাম ধরার পুরো পরিকল্পনাই ভণ্ডুল হয়ে যাওয়া।

একই কথা প্রযোজ্য নেপাল, ভুটানের ক্ষেত্রেও। এ দেশ দুটি আরো প্রবলভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল । ভুটান নিজ সিদ্ধান্ত কতোটা স্বাধীনভাবে নিতে পারে  সে প্রশ্নও ওঠে মাঝে মাঝে। নেপালও কাছাকাছি অবস্থায়। ভূবেষ্টিত দেশ দুটিকে ভারতের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়।  কয়েক বছর আগেও ভারতকে এই দেশ দুটি নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু এখন তার ঘুম হারাম হবার উপক্রম।

যদি বলা হয়, নেপাল এখন প্রায় ভারতের হাতছাড়া হয়ে গেছে, তবে বাড়িয়ে বলা হবে না।  কে পি ওলির নেপাল এখন দ্রুত গতিতে চীনের দিকে ঝুঁকছে।

ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিংয়ের অর্থনৈতিক এজেন্ডা হিমালয় অঞ্চলের এ দেশটির সাথে ভারতের সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির পর্যবেক্ষকরা  মন্তব্য করেছেন। সাবেক কূটনীতিক ও দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এসডি মুনি বলেন, তারা যদি তাদের অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয় এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাইরে তাদের অর্থনীতিকে আরো সম্প্রসারণ করে, তাহলে ভারতের উপর নিশ্চিতভাবে এর প্রভাব পড়বে।

আবার গত বছরের দোকালাম-এ সামরিক অচলাবস্থার পর থেকে ভুটানে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণের দাবি উঠেছে। তাদের অভিযোগ ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের দ্বারা খুব বেশি  নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত । ফলে চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিস্পত্তি করা যাচ্ছে না বলে অনেকে মনে করছে। তাদের মতে, ভারতই বাধা দিচ্ছে, নিষ্পত্তির দিকে না যেতে।

চীন ও ভুটান দু’দেশই দোকলামের উপর মালিকানা দাবি করছে। স্থানটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। ওই এলাকায় চীনা সৈন্যরা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারতীয় সেনারা গিয়ে বাধা দেয়। ভারতের কৌশলগত গুরত্বপূর্ণ ”চিকেন নেক” – শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে দোকলামের অবস্থান। এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো সংযুক্ত। ফলে এখানে ভারত ও চীনের ব্যাপক স্বার্থ রয়েছে।

এদিকে, শেরিং যে অর্থনৈতিক রূপরেখা উত্থাপন করেছেন, তাতে করে অবধারিতভাবেই তাকে ছুটতে হবে চীনের দিকে।  ভুটানের তরুণরাও চাচ্ছে, তাদের দেশ যাতে কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত হতে চাইছে। আর তাতেই ভারতের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।

এক দশকের বেশি সময় আগে রাজা জিগমে সিঙ্ঘে ওয়াংচক ভুটানে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালু করার পর থেকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার দেশটি ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত ও চীনের মাঝে থাকা ভুটানের অবস্থান কি হবে তা নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ভারত যেহেতু এই অঞ্চলে তার ন্যায্য নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিসরনে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ভুটানে তার উপস্থিতি অতিমাত্রায় অনুভুত না হয়। ভুটানের জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থটিকেই মনে রাখতে হবে।

এমন প্রেক্ষাপটেই সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রাথমিক রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক ক্ষমতাসীন দল  পিপলস ডেমক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)। জয়ী হন কিছুটা স্বাধীনচেতা ড. লোটে শেরিংয়ের দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি)।

এদিকে, চীনের সাথে সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে নেপালের। কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।  নেপালিরা যেন পণ করেছে, তারা ভারতের নাগপাশ ছিন্ন করবেই।  বিশেষ করে ২০১৫ সালের অঘোষিত অবরোধের পর নেপালি জনমত এখন প্রবল ভারতবিরোধী। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে চীন। তারা নানাভাবে নেপালে তাদের অবস্থান জোরদার করছে।

নেপাল ও ভুটানের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে তাদের পক্ষে কোনোভাবেই ভারতের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা হলো একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। তাতেই ভারতের ক্ষতি, চীনের লাভ।

এই লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে গিয়েই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নির্মমতার শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। ভূ-রাজনীতির যে খেলা চলছে মিয়ানমারে তাতে একটি বড় রণাঙ্গন হচ্ছে আরাকান রাজ্য। চীন সেখানে ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক জোন, তেলের ডিপো নির্মাণ করতছ ও আরো করতে চায়। কিন্তু পাশ্চাত্য কাজটি সহজে হতে দিতে চায় না। আর পরিণামে সেখানকার রোহিঙ্গারা দাবার ঘুঁটির মতো মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাতে গণহত্যার শিকার হলো।

রোহিঙ্গাদের ওপর এমন অত্যাচার সত্ত্বেও  চীন ও ভারত  কিন্তু মিয়ানমারকে কাছে টানতে হেন কাজ নেই যা করছে না।  ভারতেরও অ্যাক্ট ইস্ট নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য মিয়ানমারকে প্রয়োজন।