Home » প্রচ্ছদ কথা » সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন কী আদৌ সক্ষম?

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন কী আদৌ সক্ষম?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারন নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এখনকার জেনারেশন ভুলে গেলেও প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামানের “বিপুলা পৃথিবী” গ্রন্থ করতে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গের কথা মনে পড়ে গেল। ড. আনিসুজ্জামান তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। লিখেছেন তিনি, “…. ৭ মার্চ ১৯৭৩ দেশের প্রথম সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আমাদের ভোটকেন্দ্র ক্যাম্পাসের সন্নিহিত এলাকায়। দুই গাড়ি করে আমরা একসঙ্গে ভোট দিতে গেলাম-উপাচার্য ইন্নাছ আলী, রেজিষ্টার মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, ইংরেজী বিভাগের মোহাম্মদ আলী আর আমি। স্বাধীন দেশে এই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি-মনের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সব উৎসাহ দপ করে নিভে গেলো। জানলাম, আমাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে”।

এক. বলা যায় ক্ষমতাসীন দলগুলি কখনই চায়নি যে, ভোটের মাধ্যমে জনগন তার স্বাধীন ইচ্ছে প্রকাশ করুক। শাসকশ্রেনী সবসময়ই ভুগেছে ভোটাতঙ্কে। ১৯৯১ এর আগে কোন সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন-শক্তিশালী, যোগ্য করে তুলতে চায়নি। সেই থেকে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কিছু ত্রু টি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও এটি গ্রহনযোগ্য মান অর্জিত হয়েছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও  অর্থাৎ ২০০৮ সালে হুদা কমিশন যে সকল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিবাচকতা অর্জন করেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেগুলি ভেস্তে যায় এবং ভোট কালচার বদলাতে থাকে। যার একটি বড় উদাহরন দশম জাতীয় সংসদ  নির্বাচন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? সঠিক সময়ে, সব দলের অংশগ্রহনে মানসম্মত একটি নির্বাচন কি হবে? বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম? সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে অজস্র প্রশ্নবোধক ঝুলিয়ে দিয়েও তারা মনে করছেন, ঐ নির্বাচন সুষ্ঠ এবং অবাধ হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দল ও জোটের আস্থা অর্জনে সক্ষম হলেও অন্যান্য দল ও জোটের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, যা এখন আজ-কালের ব্যাপার। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গত বছর ২৪ আগষ্ট থেকে শুরু করে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করে। আলোচনাকালে দলগুলি নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রায় সাড়ে চার’শ প্রস্তাব উপস্থাপনা করেছিল। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কয়েকটি ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আসছে, এবং আসতেই থাকবে অন্তত: নির্বাচনের আগ পর্যন্ত।

প্রস্তাবগুলো হচ্ছে; ১. নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? ২. নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে? ৩. নির্বাচনী আসনের সীমানা পুন:নির্ধারন করা হবে কিনা? ৪. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার হবে কিনা? নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দেশের প্রধান দুই দল ও তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। সম্প্রতি ড. কামালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্ট, যার বড় অংশীদার বিএনপি এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটও নির্বাকালীন সরকার প্রশ্নে একই মেরুতে।

সরকারী দল ও তার মিত্ররা বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। তারা সবাই এখন এটিকে ‘সাংবিধানিক’ মনে করছেন এবং এর বাইরে চুল পরিমানও নড়বেন না-এই বক্তব্য জোরে-সোরে জানান দিতে ভুল করছেন না। অন্যদিকে, বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি জোরে-সোরে তুলেছেন। এজন্য তারা প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের কথাও বলছেন।

নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি বিএনপির। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য মনে করে নির্বাচনে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে তারা দেশরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে নিয়োগের প্রয়োজন মনে করছেন না। নির্বাচন কমিশন সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় এবং ক্ষমতাসীন দলও তাই চায়। এ ব্যাপারে অন্যান্য দলের অবস্থান অনড়, তারা ইভিএম ব্যবহার চান না। সীমানা পুন:নির্ধারন প্রশ্নেও তাদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে।

দুই. জরুরী প্রশ্নটি হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পরস্পর বিরোধী দাবি মেটানোর ক্ষমতা কমিশনের কতটুকু আছে এবং সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার ‘ইচ্ছাশক্তি’ আদৌ আছে কীনা? যদিও সুপ্রীমকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা আছে, সুষ্ঠ-অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন যে কোন আইন করতে পারবে – কিন্তু কোন কমিশনই এ পর্যবেক্ষণকে আমলে নিয়ে কোন আইন করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং এই নির্বাচন কমিশনও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে এবং নতুন কোন নজির স্থাপন করবে বলে আভাস মেলেনি।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের অতীত বলে, এখানে সবসময় নির্বাচন কমিশন সেই কার্যক্ষমতাই দেখিয়েছে, যেরকমটি নির্বাচনকালীন সরকার চেয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার, রাজনৈতিক দলীয় হলে তাদের বিজয়ই অক্ষুন্ন থেকেছে। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যতবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। সে অর্থে নির্বাচন কমিশন সব সময় দলীয় সরকারের ইচ্ছেকেই প্রধান্য দিয়েছে।

অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলেও তারা যেভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছেন, নির্বাচন কমিশন সেভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। স্বাধীন-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বাংলাদেশে তার কোন প্রমান অতীতে কোন নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। সুতরাং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের অতীত কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে যে কেউ বলতে পারবে, নির্বাচনকালীন সরকারের ইচ্ছেকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়াসী হওয়ার মত সাহস বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেখাবে- আপাতত: এর চেয়ে দুরাশা আর কি হতে পাবে!

সংবিধানমতে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে কমিশনের যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে অন্তত তফসিল ঘোষণার পরে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জনআস্থা অর্জণ করতে পারে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সরকারী কাজে গিয়ে নির্বাচন প্রচারনা চালাচ্ছেন, এটি মেনে নিয়ে কমিশন পূর্বতনদের নজির অব্যাহত রাখছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে যেহেতু ইসি’র কিছু করণীয় নেই, অনুকূল পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টিতে তারা অন্তত: নির্বাহী বিভাগের লাগামটি টেনে ধরতে পারে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে হয় না। ইতিপূর্বে সিইসি আজিজ কমিশন, রকিব কমিশনের সাথে দৃশ্যত: বর্তমানটিও একাকার হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গেলো নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহতা, দুর্বলতা, মেরুদন্ডহীনতা ও পরাধীনতার যে নজির রেখে গিয়েছিল সেটি অব্যাহত থাকছে। ফলে ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটালে, মেরুদন্ড সোজা করে না দাঁড়ালে জনগনের আস্থা-বিশ্বাস সহসাই ফেরানো যাবে না।

তিন. এই দেশে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব লম্বা নয়। দেশটির জন্মের পরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনে কেটেছে ১৭ বছর। ১৯৯০ সালের পরে নির্বাচনমুখী সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ধারা গড়ে উঠতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। এখানে সংসদীয় ধারার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময়ই স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পিষ্ট করেছে জনগনকে। ফলে ক্ষমতাসীন কোন দলের পক্ষেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড নেই। কারণ দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সেটি মোটেই স্বস্তির নয়।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স প্রকাশিত “বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪-১৫” সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল কেউ সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত: এমন ব্যবস্থা নেয়ার কোন নজির নির্বাচন কমিশনের নেই। ফলে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বহুদুরের লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব খাটানো, অনাস্থা ও বর্জন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়।